অভিযুক্ত মানেই দোষী নয়: রেলওয়ে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও আইনি প্রক্রিয়ার অপমান: মনিরুজ্জামান মনির

সানশাইন ডেস্ক :

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানের নামে আজকাল এমন এক ধরনের জন-মানসিকতা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে সমাজে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলা হয়—আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার বহু আগেই। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই প্রবণতা এখন গণমাধ্যমেও সংক্রমিত হচ্ছে। এর একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের দুই কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ ও মো. আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার প্রেক্ষাপটে তৈরি হওয়া একতরফা সংবাদ ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া।

 

প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে—একজন ব্যক্তি অভিযুক্ত হলেই তিনি দোষী নন। এটি আমাদের সংবিধান, আইন এবং মানবাধিকারচর্চার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। ‘Presumption of innocence’—অর্থাৎ, “দোষ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ”—এই নীতির ভিত্তিতেই ব্যক্তি স্বাধীনতা, পেশাগত মর্যাদা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

 

অভিযোগপত্রে নাম থাকা মানেই চাকরি হারানো বা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হওয়ার দাবি তোলা আইনগতভাবে যেমন অযৌক্তিক, তেমনি প্রশাসনিক ভারসাম্য বিনষ্ট করার মতো বিপজ্জনকও বটে। ফরিদ আহমেদ ও মো. আনোয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগপত্রে যেসব অপরাধের বিবরণ রয়েছে, সেগুলোর সত্যতা বিচারাধীন। এখনো আদালত তাদের বিরুদ্ধে কোনো দণ্ড ঘোষণা করেনি। ফলে সরকারি বিধি অনুযায়ী, তারা এখনও নির্দোষ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে পূর্ণ অধিকার রাখেন।

 

রেলওয়ের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, ফরিদ আহমেদ পদোন্নতি পাননি; তিনি একই গ্রেডের আরেকটি শাখায় দায়িত্ব পালন করছেন—মহাব্যবস্থাপক (পশ্চিম)। অপরদিকে, আনোয়ারুল ইসলামকে পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমাঞ্চলে সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক হিসেবে বদলি করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক রোটেশনের অংশমাত্র। এ ক্ষেত্রে কোনো অগ্রাধিকার বা ‘পছন্দমতো পদে নিয়োগ’ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

 

এদিকে কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যম একতরফা অভিযোগ তুলে ধরার মাধ্যমে একটি ভ্রান্ত বার্তা দিচ্ছে—যেন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়নি, বা অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের “পুরস্কৃত” করা হয়েছে। এই বার্তা প্রশাসনের প্রতি জনআস্থাকে যেমন খণ্ডিত করছে, তেমনি বিচারব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এমন প্রচারণা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নীতিমালার বিরুদ্ধে জনচাপ সৃষ্টি করে—যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে হয় অকার্যকর প্রশাসন এবং আমলাতান্ত্রিক আতঙ্ক।

 

দুদকের মামলার অভিযোগগুলো স্পর্শকাতর। রেলওয়ের সরঞ্জাম ক্রয়ে দুর্নীতির অভিযোগ নিশ্চয়ই গুরুত্ব সহকারে তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় অভিযুক্তদের সামাজিকভাবে অভিযুক্ত ও অপমানিত করে তোলা কোনোভাবেই ন্যায্যতা লাভ করে না। দুদক এখনো আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করেনি, পাসপোর্ট জব্দ, ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ কিংবা বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞার মতো কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি—কারণ তদন্তের পর্যায়টি এখনো প্রাথমিক স্তরে।

একটি আধুনিক, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অপরাধ ও অভিযোগের মাঝে একটি সুস্পষ্ট সীমারেখা থাকা উচিত। আমরা যদি এই রেখাটি মুছে ফেলি, তবে তা কেবল প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকেই নয়, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামোকেও ভেঙে ফেলে। অতীতে আমরা দেখেছি, অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার ফলেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়—যা শেষপর্যন্ত আদালতে টিকে না।

অন্যদিকে, রেলওয়ের সাম্প্রতিক উন্নয়ন, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, যাত্রীসেবায় আধুনিকীকরণ ও পরিচালন কাঠামোর পুনর্গঠন—সবকিছুই একটি দক্ষ প্রশাসনের হাত ধরে হয়েছে। এসব প্রকল্পে কাজ করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই এখন অভিযোগের মুখোমুখি। যদি শুধুমাত্র মামলা দায়ের হওয়ার কারণে তাদেরকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তবে প্রশাসনিক কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আমরা চাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ, কিন্তু সেই পদক্ষেপ যেন প্রমাণভিত্তিক ও আইনানুগ হয়, ‘অভিযোগ-ভিত্তিক’ নয়। আমরা চাই সাংবাদিকতা হোক সত্যনিষ্ঠ ও দ্বিপাক্ষিক তথ্যভিত্তিক, যেন সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়। একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাকে বিচারিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে সামাজিকভাবে অভিযুক্ত করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য অপমানজনক।

এই মুহূর্তে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো—কারা চায় রেলওয়ের মতো একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ুক? কারা চায় প্রশাসনের মধ্যে অবিশ্বাস ও বিভ্রান্তি ছড়াক? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া গেলে আমরা বুঝতে পারব, প্রকৃত দুর্নীতি কোথায়, এবং কেন নির্দোষ কর্মকর্তাদের টার্গেট বানিয়ে রেলওয়ের ভেতরেই এক ধরনের নীরব ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে।

অবশেষে বলা যায়, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলুক। অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক, বিচার হোক। কিন্তু বিচার শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে প্রশাসনিক পদক্ষেপ চাওয়া, কিংবা পদোন্নতিকে “পুরস্কার” আখ্যা দেওয়া—এটি আইন, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের প্রতি অবিচার। একজন নাগরিক, সাংবাদিক ও পেশাগত দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আমি এই অনিয়ম ও একতরফা প্রচারণার বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকব—কারণ সেটাই একটি সচেতন সমাজ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বার্থে সঠিক অবস্থান।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি


প্রকাশিত: আগস্ট ৫, ২০২৫ | সময়: ৯:৫৭ অপরাহ্ণ | Daily Sunshine

আরও খবর