সর্বশেষ সংবাদ :

ট্রাম্পের ‘শুল্ক বোমা’ ফাটল না বাংলাদেশে

ইবতিদা ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি চালু করেছে নতুন এক ‘রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ কাঠামো, যা অনেক উন্নয়নশীল দেশের জন্য যেন বাজ পড়ার সমান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদরা ট্রাম্পের এ ট্যারিপকে ‘শুল্ক বোমা’ বলে আখ্যায়িত করছেন। তবে শেষ পর্যন্ত এ বোমার বিষ্ফোরন ঘটেনি বাংলাদেশে। এতে খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে বাংলাদেশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য শুল্কহার নির্ধারিত হয়েছে ২০ শতাংশ, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। বাংলাদেশের জন্য প্রথমে ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব থাকলেও তা একদফা হ্রাস পেয়ে ৩৫ শতাংশ; সবশেষ ২০ শতাংশে নেমে এসেছে যা বিশ্লেষকদের মতে, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বড় কূনৈতিক সাফল্যর মধ্যে রয়েছে এই পদক্ষেপ।
এদিকে ভারতে প্রায় ২৫ শতাংশ রিসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করা হয়েছে। ভিয়েতনামে প্রাথমিকভাবে ৪৬ শতাংশ, পরবর্তীতে চূড়ান্তভাবে ৪০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য দেশগুলোর হার বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। যেমন শুল্ক হার কম্বোডিয়াতে ৪৯ শতাংশ, শ্রীলংকাতে ৪৪ শতাংশ, মায়ানমার ও লাওসে ৪৪ থেকে ৪৮ শাতংশ ইন্দোনেশিয়াতে ৩২ শতাংশ।
এই দিক থেকে বাংলাদেশের উপর শুল্কের হার বিশ্লেষণ করলে ইউনুস সরকার বড় একটি কূটনৈতিক সাফল্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং, বাংলাদেশের নতুন শুল্ক হার ২০ শাতংশ হওয়ায় এটি প্রয়োজনীয়ভাবে চেনা প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক কম যার ফলে ক্রেতারা অন্য দেশ দিয়ে সরে যাওয়ার প্রবণতা কমে এসেছে। এই তুলনায় বাংলাদেশের জন্য ২০ শতাংশ হারে শুল্ক ব্যবসা-বাণিজ্যে বিশাল স্বস্তির বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে গার্মেন্টস রপ্তানিকারকদের জন্য এটি একটি বড় জয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর চেয়ারম্যান ড. জাইদি সত্তার উল্লেখ করেছেন, ২০ শতাংশ শুল্ক আদর্শ না হলেও আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় এটি অনেক ভালো অবস্থান। এটি ব্যবসার গতি ধরে রাখতে সহায়ক হবে।
অন্যদিকে, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত ৩৭ শাতংশ শুল্ক কাঠামো একটি ভুল নীতি। তবে এটি আমাদের জন্য একটি ‘জাগরণের ঘণ্টা’। এখনই সময় আমাদের রপ্তানিযোগ্যতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর।
বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই সফলতার পেছনে কাজ করেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ। যার মধ্যে অন্যতম হলো ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরকার পর্যায়ের সময়োপযোগী আলোচনা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বাণিজ্য প্রতিনিধি ও শিল্প নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা, যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম ও বিমান খাতে আমদানির প্রতিশ্রুতি, যা দুই দেশের বাণিজ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করেছে এবং আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের চেয়ে রপ্তানিতে ধারাবাহিক গুণগত মান ও নির্ভরযোগ্যতা।
বাংলাদেশ এই মুহূর্তে একটি প্রতিকূল বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশেও শুল্ক নীতিতে বড় ধরনের ঝুঁকি এড়াতে পেরেছে। ২০ শতাংশ হার হলেও সেটি প্রতিবেশী ও প্রতিযোগী দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানি খাত এখনও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার শক্তি পাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বলেন, এটি অবশ্যই দেশের জন্য অনেক বড় সাফল্য। বর্তমান অন্তবর্তীকালীন সরকারের কূটনৈতিক বিজয় বলতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্যসহ রপ্তানিকৃত পণ্যগুলোতে অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে থাকবে বাংলাদেশ। বাঁচবে দেশের শিল্প ও শ্রমিক।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ খান বলেন, অবশ্যই এটি বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক সাফল্য। তবে ২০ শতাংশও একেবারে কম নয়। আগের অবস্থান অর্থাৎ শুল্কমুক্ত থাকলে ভালো হতো। তবে যা হয়েছে, সেটাই এখন মন্দের ভালো।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর এ. এন. কে. নোমান বলেন, আমরা যেভাবে নতুন শুল্ক কাঠামোর মধ্যে থেকেও কম হার নিশ্চিত করেছি, তা নিঃসন্দেহে সরকারের বিচক্ষণতারই প্রমাণ। একটি বড় কূনৈতিক সফলতা। এখন এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বাড়ানো জরুরি।


প্রকাশিত: August 2, 2025 | সময়: 4:59 am | সুমন শেখ