, , ।
মেহেদী হাসান ও আতিকুল আজম: মধু মাসের শ্রেষ্ঠ ফল আম। আর আমের রাজধানী বলে খ্যাত রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজার। রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের ওপর আমের হাট হওয়ায় স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন থেকে আমের হাট বসছে বানেশ্বরÑচারঘাট সড়কে। যানজট এড়াতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজারে প্রতি বছরের ন্যায় চলতি বছরেও আমের বাজার জমে উঠেছে।
জানা গেছে, রাজশাহী জেলার প্রত্যন্ত এলাকার আম চাষীরা যেমন আম বিক্রয়ের জন্য এখানে আসে। তেমনি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতারা এই বাজারে ভিড় জমায়। চলতি বছরে প্রশাসনের নজর দারীর কারণে ব্যবসায়ীরা ফরমালিন মুক্ত আম বিক্রিয় করছে বলে এলাকাবাসী জানায়। গোপালভোগ পরে রাজশাহীর বাজারে পাওয়া গেছে রানীপছন্দ ও লক্ষণভোগ। সুমিষ্ট আম কেনা-বেচায় জমেছে রাজশাহীর হাট বাজারগুলো। সোমবার ২ জুন রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাটে দিনভর আম কেনাবেচায় মুখর ছিল। আম বিক্রিতারা বলছেন জমে উঠেছে রাজশাহীর আমের হাট বাজার। গত ৩০ মে থেকে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে হিমসাগর ও খিরসাপাত জাতের আম।
বানেশ্বর হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিদিন ভালো কেনাবেচা হচ্ছে আম। তবে হাটটি রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে হওয়ায় স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন থেকে আমের হাট বসবে বানেশ্বরের চারঘাট সড়কে। যানজট এড়াতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতা ও আড়ৎ দারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে বিগত বছরের তুলনায় এবারে আমের দাম কিছুটা বেশি।
আম চাষী ও আম ব্যবসায়ীরা জানান, আঁটি আম ৭’শ থেকে ৮’শ টাকা, নেংড়া আম ১৪ ’শ থেকে ১৬’শ টাকা, লোকনা ৬’শ থেকে ৯ শত টাকা, রানী প্রসাদ ১ হাজার’ থেকে ১২’শ টাকা, খেড়সা আম ১৮’শ থেকে ২১’শ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
পুঠিয়া উপজেলার ধলাট এলাকার আম বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন জানান, লোকনা আম বিগত বছরে ৪ শত থেকে ৭শত টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এ বছরে ৭ শত থেকে ৯ শত টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে আমাদের কিছুটা লাভ হচ্ছে। কিন্তু কয়েক দফার ঝড়ে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
আম ও আড়ৎ ব্যবসায়ী আসাদ বলেন, এবার রোজার পরে ফুলদমে আম হওয়ায় দাম অনেকটা বেশি। তবে আরও কয়েকদিন পর আমের দাম কিছুটা বাড়বে বলে তিনি জানান। এবার আম কত কেজিতে মণ জানতে চাইলে তিনি বলেন এই এলাকার প্রচলিত নিয়ম মতে ৪৫-৪৬ কেজিতে এক মণ, এই নিয়মে আম ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে।
হাট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বানেশ্বর হাটে আমের ক্রেতা সারাদেশের। ব্যবসায়ীরা এখানে আম কিনতে আসেন। এই হাটে ব্যবসায়ীরা সরাসরি বাগান থেকে পছন্দমত আম কিনতে পারেন। আম কিনে তারা নিজেদের স্থানীয় হাটে বিক্রি করে থাকেন। রাজশাহীর আমের সুনাম থাকায় সারাদেশে চাহিদাও ব্যাপক। আমের দাম কমে গেছে। ইদের পরে বাড়তে পারে আমের দাম।
ঢাকার আম ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন দাবি করেন, গত বছরের চেয়ে এবার আমের তুলনামূলক দাম কম। তার ধারণা আসন্ন ইদকে কেন্দ্র করে অনেকেই দেশের বাড়িতে ফিরে যাবেন। তাই অনেকেই বেশি করে আম কিনছেন না। মাত্র কয়েকদিন খাওয়ার জন্য কিনছে আম। তবে ইদের ছুটি শেষে মানুষ কর্মময় জীবনে ফিরবে। সেই সময় বাড়তে পারে আমের দাম। এবার আমের আকার ও রঙ ভালো।
এ বিষয়ে বানেশ্বর হাটের ইজারাদার জাকির হোসেন সরকার রাসেল বলেন, আমের বাজার জমেছে। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতায় মুখর হয়ে থাকছে বানেশ্বরের আমের হাট। আমদানি বেশি হওয়ায় আমের বাজার এখন একটু কম।
অপরদিকে, গত ২৯ মে উপজেলার মাসিক ও আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে বানেশ্বর আমের হাট স্থানান্তরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সড়কে যানজট নিরসনে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৩০ মে থেকে বানেশ্বর ট্রাফিক মোড় থেকে দক্ষিণে চারঘাট রোডে বসছে আমের হাট।
জানা গেছে বানেশ্বর আমের হাট বসে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের পাশে। সড়কের উপরে সারি সারি আমের গাড়িতে পসরা সাজিয়ে আম বিক্রি করেন মালিকরা। এতে এক প্রকারের যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে দুর্ভোগে পড়ে যানবাহনের যাত্রীরা। এতে করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সড়কে এমন বিড়ম্বনা এড়াতে আমের হাট হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে উপজেলা প্রশাসন।
আমের হাটের স্থান পরিবর্তনের বিষয়ে বানেশ্বর হাটের ইজারাদার জাকির হোসেন সরকার রাসেল বলেন, আমের হাটের কারণে হাইওয়ে রোডে যানজটের সৃষ্টি হয়। যানজটের কারণে আমের হাটের স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে। গত ৩০ মে থেকে বানেশ্বরের চারঘাট সড়কে বসবে আমের হাট।
এ বিষয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুর হোসেন নির্ঝর বলেন, বানেশ্বরে আমের হাটের কারণে সড়কে যানজোট হচ্ছে। এই যানজটের কারণে দুর্ভোগে পড়ছে মানুষ। সেই কারণে আমের হাটটি রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক থেকে সরিয়ে বানেশ্বর-চারঘাট সড়কে নেওয়া সিদ্ধান্ত হয়। গত ৩০ মে থেকে আমের হাট বসচ্ছে চারঘাট সড়কে। ফলে হাইওয়ে সড়কে কমেছে যানজোট।
অন্যদিকে বিপুল আম উৎপাদন হয় দেশের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এই অঞ্চলের মানুষের আয়ের বিরাট উৎস হলো আম। আম বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসলের মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে চলছে আমের মৌসুম। গোপালভোগ আম দিয়ে শুরু। তারপর একে একে গুটি, লক্ষণভোগ, হিমসাগর, ন্যাংড়া সহ নানান জাতের আমের বিপুল সমাহার দেখা যাচ্ছে। গত ২৫ মে রবিবার থেকে আম কেনাবেচার পথচলা শুরু। উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাকির মুন্সী চলতি বছর এ আম কেনাবেচার উদ্বোধন করেন। এখন আমের ভরা মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সব কয়টি উপজেলার আম চাষী ও আম ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। রহনপুর আম বাজার হচ্ছে দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আম বাজার। ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগমে জমে উঠেছে এ আম বাজার। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত অবধি আমের কেনা-বেচা থেকে শুরু করে প্যাকেট জাত করার কাজ চলে রহনপুর আম বাজারে। নানান প্রতিকূলতার মধ্যেও এবার আমের দাম ভাল হওয়ায় ব্যবসায়ী ও চাষীরা অনেকটাই সন্তুষ্ট।
আমের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল আম চাষি, আম ব্যবসায়ী, ফরিয়া, শ্রমিক, ট্রাক মালিক ও চালক, কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী সহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ব্যস্ত সময় পার করছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্তমান সময়ে আম উৎপাদন হলেও দীর্ঘ সময় ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আম উৎপাদনে শীর্ষ স্থানটি বরাবরই ধরে রেখেছে। কৃত্রিমতার যুগে এখনো কেমিক্যাল মুক্ত আম মিলে এই জেলায়। উৎপাদন ও বিপণনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আম বাজারের মধ্যে রহনপুর অন্যতম। বর্তমানে রহনপুর আম বাজারে বিভিন্ন জাতের আমের দেখা মিলছে। আমের মধ্যে সেরা জাত গোপালভোগ দিয়ে আমের কেনাবেচা শুরু হয়।
এখন বাজারে গোপালভোগ জাতের আম পাওয়া যাচ্ছে। যা বাজারে বিক্রি হচ্ছে মণ প্রতি ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে। এছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন জাতের গুটি আম যা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে, গিরিয়াদাগি আম বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে, খিরসাপাত (হিমসাগর) বিক্রি হচ্ছে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে।
এছাড়াও অনেক প্রজাতির আম পাওয়া যাচ্ছে রহনপুর আম বাজারে। প্রতিদিন রহনপুর আম বাজার থেকে প্রায় ছোট বড় বেশ কিছু ট্রাক দেশের বিভিন্ন স্থানে আম পরিবহন করছে। এছাড়াও রয়েছে কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়িযোগে আম পরিবহনের সু-ব্যবস্থা।
আম ফল এমনিতেই লোভনীয়। তাইতো দেশের রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী সহ সকল পেশার মানুষের কাছে আমের কদর অনেকটাই বেশী। আম সিজন আসলেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষের কাছে ফোন চলে আসে, ভাই আম খাওয়াবেন না। এভাবেই সবার প্রিয় খাবারে পরিণত হয়েছে এ আম ফল। মূলত মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হয় আমের বাজারজাত করনের প্রক্রিয়া।
তবে নিয়মকানুন মেনে পুরোপুরিভাবে বাজারে আসে জুন মাসের প্রথম থেকে। লক্ষণভোগ, বিভিন্ন জাতের গুঠি, কালিভোগ, গোপালভোগ দিয়ে শুরু হয়ে খিরসাপাত (হিমসাগর), ল্যাংড়া, ফজলী, আমরুপালী, সুরমা ফজলি, কাটিমন, আশ্বিনা সহ নানান জাতের আম ফল বাজারে পাওয়া যায় একেবারে আগষ্টের শেষ অবধি। এরমধ্যে কয়েক জাত যেমন কাটিমন, বারী-৪, বারী-১১ ইত্যাদি আম প্রায় সারা বছর পাওয়া যায়।
আমের সিজন আসলেই এলাকার যুবক, ছাত্র ও তরুণরা ঝুকে পড়ে অনলাইনে আম বেচাকেনা ব্যাবসায়। যারা অনলাইনে আম ক্রয় করতে চান তারা অনলাইনে আম বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে নির্দিষ্ট অংকের টাকা পাঠিয়ে দেন।
অনলাইন আম ব্যবসায়ীরা গ্রাহকের জন্য নির্দিষ্ট আম প্যাকেটজাত করে নিজ উদ্যোগে কুরিয়ার করে দেন। এবার প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন অনলাইনে আম বিক্রয় করার জন্য নির্দিষ্ট পেজ খুলেছেন। একেক জন একেক নাম দিয়ে পেজ খুলে গ্রাহকের সাথে কথা বলে নিচ্ছেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় আম তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিচ্ছেন।
রহনপুরের বিশিষ্ট আম আড়তদার ও আম ব্যবসায়ী আশিকুল ইসলাম বলেন, মহান আল্লাহর রহমতে এবার আমের ফলন ভালো। গতবারের চেয়ে এবার বেশী আম উৎপাদন হবে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, রহনপুর আম বাজারে প্রতিদিন অনেক আম ক্রয় বিক্রয় হচ্ছে। পবিত্র ঈদুল আজহার পূর্ব দিন পর্যন্ত আম বেচাকেনা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন জাতের গুটি আম, ল্যাংড়া, হিমসাগর (খিরসাপাত), গোপালভোগ, লক্ষনভোগ ইত্যাদি আম পাওয়া যাচ্ছে। আমের মূল্য ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে বলে তিনি জানান।
আম বিক্রেতা আব্দুল বারী জানান, চলতি বছর কীটনাশকের মূল্য বৃদ্ধি ও তীব্র খরার কারণে আমের উৎপাদন কম হলেও শুরু থেকেই দাম ভাল হওয়ার ফলে সকল খরচ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব ও লাভের পরিমাণও ভালো হবে বলে তিনি জানান। তবে আমের ওজনের ক্ষেত্রে ৫২/৫৪ কেজিতে মন হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বাজার মনিটরিং এর ব্যবস্থা জোরদার করার দাবিও জানান এ ব্যবসায়ী।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তানভীর আহমেদ সরকার বলেন, এবার উপজেলায় ৪ হাজার ২’শ ৪০ হেক্টর জমিতে আম উৎপাদন হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় ১০ হেক্টর বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন বাজারে গোপালভোগ ও ক্ষিরসাপাত আম পাওয়া যাচ্ছে। এবারও কোন নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ না থাকায় পরিপক্বতার সাথে কৃষকরা আম সংগ্রহ শুরু করেছে। আমার জানা মতে, রহনপুরের ঐতিহ্যবাহী আম বাজার বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম আম বাজার। এখানে সাধারণত ক্যামিকেলমুক্ত আম পাওয়া যায় এবং স্বাদে গুণে অনন্য এসব আম।
আমরা কৃষি বিভাগ প্রতি বছরের ন্যায় জিএপি বাস্তবায়নের মাধ্যমে আম রপ্তানিযোগ্য করার জন্য আম চাষীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেছি, প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করছি এবং কৃষক সচেতনতা বৃদ্ধি করছি। এবার আম রপ্তানি যেন গতবারের থেকে বাড়ানো যায় সেই প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হচ্ছে।