সর্বশেষ সংবাদ :

মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রাপ্ত বিএনপির ৯ নেতাসহ ৪৭ আসামীর সবাই খালাস

ঈশ্বরদী প্রতিনিধি: ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংসন স্টেশনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ট্রেন বহরে হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রাপ্ত স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী ৯ নেতা সহ ৪৭ আসামীর সবাইকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বুধবার বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলাম ও বিচারপতি হামিদুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতে আসামিপক্ষে আইনজীবীদের পক্ষে ব্যারিষ্টার কায়সার কামাল শুনানি করেন। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মাকসুদ উল্লাহ, এ্যাড. জামিল আক্তার এলাহী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামান মামুন।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান। এর আগে আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে গত ৩০ জানুয়ারি রায়ের জন্য ৫ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন হাইকোর্ট।
ঈশ্বরদীর ইতিহাসে বহুল আলোচিত-সমালোচিত ওই মামলায় ২০১৯ সালের ৩ জুলাই মৃত্যুদন্ড সহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ঘোষণা করে রায় দেন স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-৩ এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক ও পাবনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রুস্তম আলী। রায়ে ৯ জনকে মৃত্যুদন্ড, ২৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং ১৩ জনকে ১০ বছর করে কারাদন্ড দেওয়া হয়। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সবাই বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলের সাবেক ও বর্তমান প্রভাবশালী নেতা-কর্মী।
ওই মামলায় বিচারিক আদালতের রায়সহ যাবতীয় নথিপত্র ২০১৯ সালে হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় পৌঁছায়, যা ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়। ফৌজদারি কোনো মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে কারও মৃত্যুদন্ড হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যেটি ডেথ রেফারেন্স মামলা হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে বিচারিক আদালতের দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আসামিরা জেল আপিল, নিয়মিত আপিল করতে পারেন হাইকোর্টে। সাধারণত ডেথ রেফারেন্স ও এসব আপিলের ওপর একসঙ্গে হাইকোর্টে শুনানি হয়ে থাকে।
মামলার বিষয়ে আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সাংবাদিকদের জানান, মামলায় আইনের অপপ্রয়োগ হয়েছে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও ৯ জনকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়, যা বিদ্বেষপূর্ণ বিচার। তদন্ত ছিল ঔদ্ধত্যপূর্ণ দায়সারা গোছের ও কাল্পনিক। এর বিচারিক আদালত অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা মেটানো ও কাউকে খুশি করার জন্য ওই রায় দেওয়া হয়েছিল। বিচারিক আদালতের রায়ে দন্ডিত ৪৭ জনের মধ্যে এরই মধ্যে দুজন মারা গেছেন। মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত ৯ জন ছাড়া বাকিরা গত ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
সুত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর উত্তরাঞ্চলে দলীয় কর্মসূচিতে যোগ দিতে ট্রেনে খুলনা থেকে সৈয়দপুর যাচ্ছিলেন। ট্রেনটি ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনে ঢোকার সময় ট্রেনবহরকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় ট্রেনে গুলিবর্ষণ ও বোমা হামলার অভিযোগে ঈশ্বরদী জিআরপি (রেলওয়ে পুলিশ) থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। তৎকালীন ছাত্রদল নেতা ও ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুসহ সাতজনকে আসামি করে মামলা করা হয়।
মামলা দায়েরের পরের বছর পুলিশ কোনো সাক্ষী না পেয়ে আদালতে চুড়ান্ত অভিযোগপত্র জমা দেন। তখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু আদালত সে অভিযোগপত্র গ্রহণ না করে অধিক তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডিতে পাঠান। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলাটির পুনঃতদন্ত হয়। ১৯৯৭ সালের ৩ এপ্রিল পুলিশ ঈশ্বরদীর বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী সহ ৫২ জনের নামে আদালতে আবার অভিযোগপত্র জমা দেয়।
সুত্রটি আরও জানায়, ২০১৯ সালের ৩ জুলাই বিচারিক আদালতের দেওয়া রায়ে ৯ জনকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। তারা হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক পৌর মেয়র মকলেছুর রহমান বাবলু, ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু, পাবনা জেলা বিএনপির সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক এ কে এম আখতারুজ্জামান আক্তার, ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম, ঈশ্বরদী উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক ভিপি রেজাউল করিম শাহিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা মাহবুবুর রহমান পলাশ, বিএনপি নেতা শহীদুল ইসলাম অটল, ঈশ্বরদী পৌর যুবদলের সভাপতি মোস্তফা নূরে আলম শ্যামল, ঈশ্বরদী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আজিজুর রহমান শাহীন।
বিচারিক আদালতের রায়ে ২৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। তারা হলেন বিএনপি নেতা আমিনুল ইসলাম, আজাদ হোসেন ওরফে খোকন, ইসমাইল হোসেন ওরফে জুয়েল, আলাউদ্দিন বিশ্বাস, শামসুর রহমান, আনিসুর রহমান, নুরুল ইসলাম আক্কেল, মোহাম্মদ রবি, মোহাম্মদ এনাম, আবুল কাশেম, কালা বাবু, মামুন, মামুন-২, সেলিম আহমেদ, কল্লোল, তুহিন, শাহ আলম লিটন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, লাইজু, আব্দুল জব্বার, পলাশ, আবদুল হাকিম, আলমগীর হোসেন, এ কে এম ফিরোজুল ইসলাম পায়েল ও আবুল কালাম।
১০ বছর করে কারাদন্ড প্রাপ্ত আসামিরা হলেন বিএনপি নেতা নেফাউর রহমান রাজু, আজমল হোসেন ডাবলু, কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন জনি, ছাত্রদলের সাবেক নেতা রনো, বরকত, চাঁদ আলী, এনামুল কবির, মোক্তার, হাফিজুর রহমান মুকুল, হুমায়ন কবির দুলাল, জামরুল, তুহিন বিন সিদ্দিক ও ফজলুর রহমান।
এদিকে ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার পর পর ঈশ্বরদীতে বাঁধভাঙ্গ আনন্দ-উচ্ছাস শুরু করে বিএনপিসহ সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। তারা ঈশ্বরদী শহরের আনন্দ মিছিল, আতশবাজি, রং খেলাসহ শত শত কেজি মিষ্টি বিতরণ করেন।
রায় প্রসঙ্গে ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির আহবায়ক এস এম ফজলুর রহমান বলেন, যে মিথ্যা ঘটনায় একটি পাখি পর্যন্ত আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। সেই ঘটনায় ঈশ্বরদী বিএনপির ৯ জন প্রভাবশালী নেতাকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে অন্য নেতাকর্মীদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে দীর্ঘ সাড়ে ৫ বছর করে কারাগারে বন্দি করেছিল স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। অবশেষে আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে মামলাটি মিথ্যা প্রমানিত হওয়ায় বুধবার মামলা থেকে ৪৭ নেতাকর্মীকে খালাস দেন। কারাবন্দি নেতারা অচিরেই মুক্তি পাবেন বলেও জানান তিনি।


প্রকাশিত: February 6, 2025 | সময়: 6:43 am | সুমন শেখ

আরও খবর