, , ।
নুরুজ্জামান, বাঘা:
এ বছর সারাদেশে পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ঘগোয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গত বছর এস.এস.সি ও সমমানের পরীক্ষায় ১৪ শিক্ষার্থী অংশ নিলেও অকৃতকার্য হয়েছিল সকল পরীক্ষার্থী। অথচ এই বিদ্যালয়ে ১৩ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। একই অবস্থা সম্প্রতি প্রকাশিত এইস.এস.সি পরীক্ষার ফল প্রকাশে। এবার এইস.এস.সি’র ফল প্রকাশে ৫১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য (ফেল) করেছে।
যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৫৭৪টি কলেজের মধ্যে এবার ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাশ করেছে। একই সঙ্গে ৭ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাশ করতে পারেনি। এ নিয়ে চলছে বিস্তর সমালোচনা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর পক্ষ থেকে ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য বাল্য বিয়ে, চরাঞ্চলের কমমেধাবী শিক্ষার্থী ও দারিদ্রতা-সহ প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতাকে দায়ী করা হয়েছে।
তবে এই অকৃতকার্য ও ফলাফল বিপর্যয়ের জন্য সমাজের অভিজ্ঞমহল ভিন্ন-ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদের চলাফেরা ও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি থাকায় বিব্রত বোধ করছেন রাস্তায় চলাচলরত অভিভাবক ও অন্যান্যরা। আধুনিকতার নামে পিতা-মাতারাও অনেক সময় সন্তানদের সকলের সাথে মিশতে দিচ্ছেন। তবে অনেক অভিভাবক খোঁজ নেইনা স্কুল কলেজ চলাকালীন ও ছুটির পর কোথায় থেকে সন্তানরা ঘরে ফিরছে।
বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে পরিবারের সাথে সময় দেয়ার চেয়ে বন্ধুদের সাথে সময় দিতে মোবাইলে সময় পার করছে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা। ফলে ক্লাস সেভেনের পরেই অনেক শিক্ষার্থীদের হাতে দেখা মিলছে স্মার্ট মোবাইল ফোন। তারা সেখানেই যোগাযোগ করে, দলবেধে এক সাথে হাফ ডজন বন্ধু-সার্কেল ঘুরে বেড়ানো ছাড়াও অনেক সময় অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে । এর ফলে পড়া-লেখায় তারা ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যার ফল ধরা পড়ছে এ বছর এইচ.এস.সি’র ফল প্রকাশে।
এবারের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ১১টি শিক্ষাবোর্ডে গড় পাশের হার ৭৭.৭৮%। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ জন শিক্ষার্থী। আর পাশ করতে পারেনি ৬৫ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী। আর এসব রেজাল্ট নিয়ে অনেকেই প্রাইভেট বানিজ্য এবং কোচিং সেন্টারকেউ দায়ি করেছেন।
অপর দিকে সমাজের বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষ যদি তার লক্ষ্যে অটুট থাকে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে, তবে একদিন সে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক সফল ব্যক্তির নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। যুগে যুগে, কালে কালে যারা স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে তাদের সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে আছে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষপটে সেটি হচ্ছে না।
ইতোমধ্যে নড়াইলে শিক্ষক লাঞ্ছনা আর সাভারে ছাত্রের মারধরে শিক্ষকের মৃত্যুর ঘটনা-সহ বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক লাঞ্চনার ঘটনা সারাদেশ জুড়ে উদ্বেগ ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে। এর মধ্যেই গত বুধবার শ্রেণিকক্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের একজন অধ্যাপককে হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। কেন শিক্ষাঙ্গনে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটছে ! প্রশ্নটি জোরালো ভাবে আলোচিত হচ্ছে দেশজুড়ে। শিক্ষক লাঞ্ছনার মতো ঘটনার লাগাম টানতে তাগিদও দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। কিন্তু বাস্তব অর্থে এর কোন প্রতিকার হচ্ছে না।
বিশিষ্টজনেরা এসব ঘটনায় সামাজিক অবক্ষয় এবং নৈতিক মূল্যবোধের অভাবকে বিশেষ ভাবে দায়ী করছেন। তাঁরা বলছেন, নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে পুরো সমাজেই অস্থিরতা বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে শিক্ষাঙ্গনে। বিচারে দীর্ঘ সূত্রতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বারবার শিক্ষকদের ওপর এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলেও মনে করছেন তারা।
এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসকরা ও জেলা শিক্ষা অফিসার জানান, প্রধান শিক্ষকদের কাছে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। যদি শিক্ষকদের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে এবার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।