সর্বশেষ সংবাদ :

হাদির অবস্থা আশঙ্কাজনক, মস্তিষ্ক মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত, ফুসফুসেও আঘাত: মেডিকেল বোর্ড ‎

সানশাইন ডেস্ক: গুলিবিদ্ধ হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির অবস্থা আশঙ্কাজনক। গুলিতে তাঁর মস্তিষ্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাঁর ফুসফুসেও আঘাত রয়েছে। তাঁকে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে অর্থাৎ অস্ত্রোপচার ছাড়া নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ড।
১৪ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে এভারকেয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হাদির জন্য যে মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছে, তাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন হাসপাতালটির আইসিইউ ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মো. জাফর ইকবাল। এভারকেয়ার হাসপাতালের পরিচালক (মেডিকেল সার্ভিসেস) ডা. আরিফ মাহমুদ আজ শনিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘হাদির অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। এই মুহূর্তে মিডিয়া ব্রিফের চেয়ে তার চিকিৎসার দিকেই আমাদের মনোযোগ বেশি। তার ভাই তাকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব। হাদির বর্তমান অবস্থা তার পরিবারকে আমরা ব্রিফ করেছি।’
মেডিকেল বোর্ডের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত তুলে ধরে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, রোগীর মস্তিষ্ক ‘মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়েছে। তাকে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে রাখা হয়েছে। ব্রেন প্রোটেকশন প্রটোকল (স্ট্রোক বা মস্তিষ্কের আঘাতের পর মস্তিষ্ককে আরও ক্ষতি থেকে বাঁচাতে বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি ও যত্ন) অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা চালু থাকবে। শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলে আবার ব্রেনের সিটি স্ক্যান করা হতে পারে। হাদির ফুসফুসেও আঘাত রয়েছে। চেস্ট ড্রেইন টিউব (বুকের ভেতর থেকে বাতাস, রক্ত বা অন্যান্য তরল বের করতে ব্যবহৃত নমনীয় নল) দিয়ে অল্প পরিমাণ রক্ত নির্গত হওয়ায় তা চালু রাখা হয়েছে। ফুসফুসে সংক্রমণ ও এআরডিএস (তীব্র শ্বাসকষ্ট সিন্ড্রোম ফুসফুসের একটি গুরুতর অবস্থা) প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট অব্যাহত রাখা হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হাদির কিডনির কার্যক্ষমতা ফিরে এসেছে। এটি বজায় রাখতে পূর্বনির্ধারিত ফ্লুইড ব্যালেন্স (শরীরে প্রবেশ করা তরল এবং শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া তরলের মধ্যকার ভারসাম্য) যথাযথভাবে চালিয়ে যাওয়া হবে। পূর্বে শরীরে রক্ত জমাট বাঁধা ও রক্তক্ষরণের মধ্যে অসামঞ্জস্যতা (ডিআইসি) দেখা দিলেও তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এ অবস্থা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত ও রক্তজাত উপাদান সঞ্চালন অব্যাহত থাকবে।
মেডিকেল বোর্ড জানিয়েছে, হাদির মস্তিষ্কের নিচের অংশ বা গুরুমস্তিষ্কে আঘাতের (ব্রেন স্টেম ইনজুরি) কারণে রোগীর অবস্থা অত্যন্ত সংবেদনশীল; রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দনের ওঠানামা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে যে সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে, তা চলমান থাকবে। যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে। তাই রোগীকে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে রাখা হয়েছে। হৃৎস্পন্দন বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে তাৎক্ষণিকভাবে টেম্পোরারি পেসমেকার (হৃদপিণ্ডের স্পন্দনের ধীরগতি বা অনিয়মিত গতি ঠিক রাখতে অস্থায়ী চিকিৎসা যন্ত্র) স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট টিম সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
মেডিকেল বোর্ডের বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, গুলিবিদ্ধ ওসমান হাদির শরীরে আপাতত নতুন কোনো অস্ত্রোপচার বা হস্তক্ষেপ করা হবে না, পর্যবেক্ষণভিত্তিক চিকিৎসাই চলবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, রেডিওলজি, আইসিইউ, অ্যানেস্থেশিয়া, নিউরোসার্জারি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসক ও সাপোর্টিভ স্টাফদের অসাধারণ ও মানবিক অবদানের জন্য মেডিকেল বোর্ড তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
হাসপাতালে ভিড় না করতে; কোনো ধরনের অনুমানভিত্তিক বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করে মেডিকেল বোর্ডের প্রতি আস্থা রাখতে এবং রোগীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়েছে মেডিকেল বোর্ড। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরে ওসমান হাদিকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে সন্ধ্যার পর তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে সেখানেই তিনি চিকিৎসাধীন।
হাদির শারীরিক অবস্থার বিষয়ে শুক্রবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, বাম কানের ওপর দিয়ে ঢুকে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া বুলেট হাদির মস্তিষ্কের কাণ্ড বা ব্রেন স্টেম পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ম্যাসিভ ব্রেন ইনজুরি’ হিসেবে বিবেচিত। তিনি জানান, আগামী ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং এ অবস্থায় কোনো ধরনের নতুন ইন্টারভেনশন করা হবে না। হাদি বর্তমানে ‘খুবই ক্রিটিক্যাল’ অবস্থায় রয়েছেন এবং তাকে আপাতত কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসে রাখা হয়েছে। তবে চিকিৎসকেরা এখনও আশার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না।
হাদির আততায়ীকে ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা: ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির আততায়ীকে ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি এও বলেছেন, জুলাই সম্মুখসারির যোদ্ধাদের বিশেষ নিরাপত্তায় একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার।
শনিবার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির জরুরি বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেন। জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সার্বিক নিরাপত্তা প্রস্তুতি, জুলাই যোদ্ধা ওসমান হাদিসহ জুলাইয়ের সম্মুখসারি যোদ্ধাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং লুট হওয়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
“স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সম্মুখসারির যোদ্ধা ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছে। এই বিষয়টিকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। অনতিবিলম্বে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।” শুক্রবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থাতেই মোটরসাইকেলের পেছনে বসা আততায়ী তাকে লক্ষ্য করে একটি গুলি ছোড়ে, যেটি তার মাথায় লাগে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে মস্তিস্কে একটি অস্ত্রপচার শেষে খুলি খুলে রেখে তাকে পাঠানো হয় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এভারকেয়ার হাসপাতালে। বর্তমানে সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার চিকিৎসা চলছে। হাদির জীবন সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আশা করছি, অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে আমরা দুষ্কৃতিকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে পারব। এই হামলায় জড়িত কাউকে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। এই বিষয়ে আমরা জনগণের সার্বিক বিশ্বাস করি।” তিনি বলেন, “ওসমান হাদির ওপর আক্রমণের ঘটনা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস বলে আমরা মনে করি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত বা বানচাল করার যেকোনো ধরনের অপচেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর হস্তে দমন করবে।
“বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারি যোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বদ্ধপরিকর। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।” লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলমান রয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “এটিকে আরও জোরদার ও বেগবান করার জন্য ফ্যাসিস্ট-সন্ত্রাসীদের দমনের উদ্দেশ্যে কমিটি অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেইজ টু অবিলম্বে চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।”
সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, “হাতিয়ার (অস্ত্র) ইস্যুর ক্ষেত্রে এতদিন শুধু সরকারি কর্মচারীদেরই হাতিয়ার দেওয়া হতো। এখন যারা ইলেকশনে পার্টিসিপেট করবে এবং তারাও যদি হাতিয়ার চায়, তাদেরও হাতিয়ারের লাইসেন্স তাদের আমরা দেব। “এবং যারা ইলেকশনে পার্টিসিপেট করবে, তাদের যদি হাতিয়ার আমাদের কাছে জমা থাকে, ওইগুলিও আমরা তাদের ফেরত দেব।”
ওসমান হাদির সন্দেহভাজনকে ধরার বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “আসামি ধরার প্রক্রিয়াটা চলমান আছে। আমরা আশা করি আপনাদের সহযোগিতায় খুব তাড়াতাড়ি হয়তো তারে ধরতে পারব।” তিনি বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য আমার একটা ছোট্ট একটা কমিটি করে দিয়েছি। ওই কমিটি অ্যাসেস করে তারা ব্যবস্থা নেবে।”
দেড় দশক ধরে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আগামী ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তার নিরাপত্তার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “তার নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনো শঙ্কা নাই। তার নিরাপত্তার ব্যাপারে যত ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার, আমরা নেব এবং তার নিরাপত্তা আমরা নেব।”
হাদির ওপর হামলা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য ‘বিপজ্জনক’: জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই দিনের আলোয় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির ওপরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
শনিবার এক বিবৃতিতে এই ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন সুজনের চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দিন খান ও প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার। বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা মনে করি, এ ধরনের বর্বরোচিত হামলা দেশের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য বিপজ্জনক। “আমরা শরিফ ওসমান হাদির দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি, তার পরিবার ও সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মিতা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে শরিফ ওসমান হাদীর সর্বোত্তম চিকিৎসার ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।”
হাদির ওপর হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে ‘যথাযথ শাস্তি’ নিশ্চিত করা এবং আগামী সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সব প্রার্থী, দলীয় কর্মী ও সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছে সুজন। বিবৃতিতে সুজন বলছে , “সম্ভাব্য আক্রমণের হুমকি থাকা সত্ত্বেও শরিফ ওসমান হাদির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
“তাই ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, কেউ যাতে নির্বাচনের যাত্রা বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে তৎপর হতে হবে।” এই লক্ষ্যে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের ধরার জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর হওয়ারও তাগিদ দিয়েছেন সুজন। শুক্রবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর বিজয়নগর পানির ট্যাংকির সামনে ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। চলন্ত রিকশায় থাকা অবস্থাতেই মোটরসাইকেলের পেছনে বসা আততায়ী তাকে লক্ষ্য করে একটি গুলি ছোড়ে, যেটি তার মাথায় লাগে।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে মস্তিস্কে একটি অস্ত্রপচার শেষে খুলি খুলে রেখে তাকে পাঠানো হয় বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে। বর্তমানে সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তার চিকিৎসা চলছে। হাদির জীবন সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
হাদির আততায়ীকে ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। আর এ ঘটনায় জড়িত প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ‘শিগগিরই’ আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক, অভ্যুত্থান ‘নস্যাৎচেষ্টার’ বিরুদ্ধে ঐক্যের বার্তা ৩ দলের: ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির ওপর হামলাকে ‘ষড়যন্ত্রের’ অংশ হিসেবে তুলে ধরে তিন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানকে ‘নস্যাৎ করার সকল প্রচেষ্টা’ রুখে দিতে দলগুলো ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে রয়েছে।
শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পাটি-এনসিপির নেতারা এই বার্তা দিয়েছেন বলে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলেছে। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ওসমান হাদির ওপর হামলা ‘পূর্ব-পরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্রের’ অংশ; এর পেছনে ‘বিরাট শক্তি’ কাজ করছে।
তিনি বলেন, ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাচনটি না হতে দেওয়া। এই আক্রমণটি খুবই ‘সিম্বলিক’। তারা তাদের শক্তি প্রদর্শন করতে চায়, নির্বাচনের সব আয়োজন ভেস্তে দিতে চায়। এগুলোকে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করতে হবে। মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে মনে হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে। তারা প্রশিক্ষিত শ্যুটার নিয়ে মাঠে নেমেছে।”
বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন বলেন, “এই পরিস্থিতিতে আমাদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কোনো অবস্থাতেই পরস্পরের দোষারোপ থেকে বিরত থাকতে হবে। “ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে আওয়াজ তুলতে হবে। কোনো ধরনের অপশক্তিকে আমরা বরদাস্ত করব না।” তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে যতই রাজনৈতিক বক্তব্যের বিরোধিতা থাকুক না কেন, জাতির স্বার্থে এবং জুলাইয়ের স্বার্থে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতেই হবে।”
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করার পরামর্শ দেন বিএনপির এই নেতা। জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ার বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের নানা বক্তব্য একে অন্যকে দোষারোপ করার প্রবণতা বাড়িয়েছে, যার ফলে আমাদের বিরোধীরা সুযোগ পেয়েছে। আমাদের পূর্বের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”
তিনি বলেন, “ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে আমরা একে অন্যকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলেছি। জাতিকে বিভক্ত করে এমন কথা আমরা কেন বলব? সব দলকে তাদের কমিটমেন্ট ঠিক করতে হবে।” এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই কিছু লোক এই অভ্যুত্থানকে ‘খাটো’ করার জন্য নানা অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে।
তিনি বলেন, “সুসংগঠিতভাবে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন চলছে। মিডিয়া ও প্রশাসনের নানা স্তরে এই কাজ হচ্ছে। নির্বাচনের পর যারা ক্ষমতায় আসবে, তারাও এর ভুক্তভোগী হবে। কেউই একা সরকার চালাতে পারবে না।” গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারির নেতাদের অন্যতম নাহিদ ইসলাম বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে মনে হয় যারা অভ্যুত্থান করেছে তারা অপরাধ করেছে।
“আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিকে ‘নরমালাইজ’ করতে নানা চেষ্টা চলছে। টিভি টকশোতে তারা নিয়মিত অংশ নিচ্ছে, প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় বৈঠক করছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মিলিত হচ্ছে এবং আদালত প্রাঙ্গণে স্লোগান দিচ্ছে।” নিজেদের বিশেষ কোনো নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই তুলে ধরে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, “আমরা এটা নেব না। জুলাইকে সবাই মিলে ‘ওউন’ করতে হবে। জুলাইকে কে কী বলবে—এই টানাপোড়েনে আমরা জুলাইকে শেষ করে দিচ্ছি।
“ষড়যন্ত্রকারীরা আমাদের অনৈক্যকে আমাদের পরাজয় হিসেবে দেখছে। তারা ভারতে বসে যা ইচ্ছা তা-ই করছে, আর আমরা কিছুই করতে পারছি না।”নাহিদ ইসলাম বলেন, “বুদ্ধিজীবী বেশে, সাংস্কৃতিক কর্মী বেশে আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকারীদের থামাতে হবে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “আমরা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ থাকতে না পারলে কোনো নিরাপত্তাই আমাদের কাজে আসবে না। রাজনৈতিক স্বার্থে দলগুলো আওয়ামী লীগকে নানা রকম সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।”প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের চিন্তা করতে হবে-ভবিষ্যতের জন্য আমরা কী করতে পারি।”
শুধু সরকার নয়, সবাইকে শক্ত থাকার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “নিজেদের মধ্যে যেন দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্য থাকবে, কিন্তু কাউকে শত্রু ভাবা বা আক্রমণ করার সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে হবে।”
“নির্বাচনের সময় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, তবে মাথায় রাখতে হবে-এটি যেন একটি নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যে নিয়ন্ত্রণে থাকে,” বলেন তিনি। আসিফ নজরুল বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ‘হানাহানি’ শুরু হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনাদের শুধু দলীয় স্বার্থ নয়, জাতীয় স্বার্থের বিষয়েও সজাগ থাকতে হবে।”
বৈঠকে ওসমান হাদি ওপর হামলার ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের উদ্যোগে সর্বদলীয় প্রতিবাদ সভার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। আগামী দু-একদিনের মধ্যে এই সভা হবে। ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক ঐক্যে যাতে ফাটল না ধরে সেজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি নেতারা। এ ব্যাপারে দলগুলো সুদৃঢ় অবস্থান নেওয়ার কথা বলেছেন তারা।
এছাড়া, নির্বাচনের আগে কঠোরভাবে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনার ওপর জোর দিয়েছেন রাজনৈতিক নেতারা। বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিতি ছিলেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের।
এই মুহূর্তে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান দরকার: গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেছেন, “এই মুহূর্তে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান দরকার।”
শনিবার দুপুরে ঢাকা এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে দেখার পর সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, “এই হামলা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে একটি সংগঠিত চক্র কাজ করছে। সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে তিনি সীমান্তে কঠোর নজরদারি ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান দরকার। জুলাই আন্দোলনের যারা রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। অথচ যারা আন্দোলনে ছিলেন না, তারাই রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদী শক্তি আবার মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
নুরুল হক নুর বলেন, “জুলাই আন্দোলনের পর একের পর এক সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে। চট্টগ্রামে সংসদ সদস্য প্রার্থীর গুলিবিদ্ধ হওয়া, আল রাজী কমপ্লেক্সে হামলা, স্বর্ণ ও ব্যাংক ডাকাতির মতো ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। এসব ঘটনায় সরকারের কঠোর অবস্থানের অভাবই আজকের পরিস্থিতির জন্য দায়ী। জুলাই আন্দোলনের মামলার আসামিরা এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সহজেই জামিন পাচ্ছে, এমনকি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। আদালত ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে।”
তিনি আরো বলেন, “প্রায় ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো হামলাকারীদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তারে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ওসমান হাদি দীর্ঘদিন ধরে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। হাদি এখন হাসপাতালে শয্যাশায়ী। চিকিৎসকদের ভাষায় তার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানুষের দোয়া।”
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি বলেন, “হামলার সময় পুলিশ সদস্যরা কাছাকাছি থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা সরকারকে দিতে হবে। ওসমান হাদির ওপর আঘাত মানে জুলাইয়ের ওপর আঘাত। আজ যদি আমরা ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে সামনে আরো বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান নির্ধারণে বাধ্য হবে। তবে আলোচনার মাধ্যমে সংকট উত্তরণের পথ খুঁজে বের করার যাবে।”
নির্বাচন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, “দেশে অনিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমি আহ্বান জানাই যে, ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা নয় বরং জুলাইয়ের ঐক্য রক্ষাই এখন সবচেয়ে জরুরি।”
হাদির পরিবারের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎ, উন্নত চিকিৎসার আশ্বাস: ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় তাদের মধ্যে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক বার্তায় জানিয়েছে, যমুনায় ওসমান হাদির ভাই আবু বকর সিদ্দীক, বোন মাসুমা, ইনকিলাব মঞ্চের তিন নেতা আব্দুল্লাহ আল জাবের, ফাতিমা তাসনিম জুমা ও মো. বোরহান উদ্দিন আজ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
ওসমান হাদির সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সারাদেশ তার জন্য দোয়া করছে। তার সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিতে সবাই চেষ্টা করছে। তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় যদি দেশের বাইরে পাঠাতে হয়, যেখানে পাঠানোর প্রয়োজন হবে সরকার সেখানেই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।’
ওসমান হাদির বোন বলেন, ‘সে ছোটবেলা থেকেই দেশকে মনেপ্রাণে ভালোবাসত। ছোটবেলা থেকেই সে বিপ্লবী। বিদ্রোহী কবিতা তার প্রিয়, সে বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করতে ভালোবাসত। তার একটি ১০ মাসের সন্তান আছে। হাদি আমাদের মেরুদণ্ড।’‘ওর অনেক কাজ, ওকে বেঁচে থাকতে হবে। আপনারা বিপ্লবী সরকার, যে করেই হোক জুলাই বিপ্লবীদের বাঁচিয়ে রাখবে হবে। তা না হলে এদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব হুমকিতে পড়বে,’ বলেন তিনি।
অপরাধীকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা জাবের বলেন, ‘৫ আগস্টের পর অনেকে বাসায় ফিরে গিয়েছিল ওসমান হাদি বাসায় ফিরে যায়নি। সে জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করত এবং জুলাই বিপ্লবের জন্য দিনরাত কাজ করত। যে ছেলেটা গুলি করেছে, শুনতে পাচ্ছি সে একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিল কোন প্রক্রিয়ায় সে জামিন পেয়েছে সেটা তদন্ত করুন।’
জুলাই যোদ্ধাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ফাতেমা তাসনিম জুমা। এমন নৃশংস হামলার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের পুরো চক্রকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা হবে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এ ঘটনার আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের জন্য ইতোমধ্যেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
এ সময় আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। প্রসঙ্গত, ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি নির্বাচনি প্রচারণাকালে রাজধানীতে শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) দুপুরে গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। এরপর অপারেশন শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়।
যেকোনো প্রকার মব ভায়োলেন্স অগ্রহণযোগ্য: ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য সংসদ সদস্য প্রার্থী ওসমান হাদির ওপর হামলাকারী সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ওই ব্যক্তি সম্পর্কে তথ্য দিলেই তথ্যদাতাকে পুরস্কার দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) এ সংক্রান্ত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে ডিএমপি। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তদের হামলায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি গুরুতর আহত হন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হামলাকারীদের গ্রেফতারে রাজধানীতে জোর অভিযান পরিচালনা করছে।
এতে আরও বলা হয়, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ছবির ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। এই ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে বা তার সন্ধান পেলে দ্রুত নিম্নলিখিত মোবাইল নম্বর অথবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে পুলিশকে জানানোর জন্য বিনীত অনুরোধ করা হলো। সন্ধানদাতার পরিচয় গোপন রাখা হবে এবং উপযুক্ত পুরস্কৃত করা হবে।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে রাজধানীর বিজয়নগরের পানির ট্যাংকির সামনে রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই দুর্বৃত্ত খুব কাছ থেকে ওসমান হাদিকে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে সন্ধ্যার পর নেওয়া হয় এভারকেয়ার হাসপাতালে। বর্তমানে সেখানেই চিকিৎসাধীন তিনি।
হাদির শারীরিক অবস্থার বিষয়ে গতকাল রাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায়), অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেছিলেন, বাম কানের ওপর দিয়ে ঢুকে ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া বুলেট হাদির মস্তিষ্কের কাণ্ড বা ব্রেন স্টেম পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ম্যাসিভ ব্রেন ইনজুরি’ হিসেবে বিবেচিত। আগামী ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, আর এ অবস্থায় কোনো ধরনের নতুন ইন্টারভেনশন করা হবে না। তিনি আরও বলেছিলেন, হাদি এখন ‘খুবই ক্রিটিক্যাল’ অবস্থায় আছেন এবং আগামী ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। তাকে আপাতত কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসে রাখা হয়েছে, যদিও চিকিৎসকেরা এখনও আশার কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না।


প্রকাশিত: December 14, 2025 | সময়: 1:27 am | সুমন শেখ