, , ।
রবিউল ইসলাম, দুর্গাপুর: সম্প্রতি রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলা খাদ্য গুদামে অত্যন্ত গোপনে নিম্নমানের চাল মজুদ করা হয়। নিম্নমানের এসব চালগুলো সরকারের খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির আওতায় ভিডব্লিউবি (ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট) সদস্য বা উপকারভোগীদের মাঝে বিতরণ করার কথা ছিল। কিন্তু তাতে বাধ সেধেছেন স্বয়ং উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজেই। নিম্নমানের চাল মজুদের ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এদিকে, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় নিম্নমানের চাল বিতরণ বন্ধ করে উন্নতমানের চাল বিতরণের নির্দেশনা দেয়ায় উপকারভোগীদের প্রশংসায় ভাসছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাবরিনা শারমিন।
সূত্রে জানা গেছে, এর আগে ইউএনও সাবরিনা শারমিনের কাছে অভিযোগ আসে উপজেলার ৭ ইউনিয়নে ভিডাব্লিউবির তালিকাভুক্ত উপকারভোগীদের মাঝে খাওয়ার অনুপযোগী নিম্নমানের চাল বিতরণ করা হচ্ছে। এমনকি খাদ্য গুদামেও নিম্নমানের চাল পর্যাপ্ত পরিমাণ মজুদ করা হয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে ঘটনার সত্যতাও পান ইউএনও।
জানা গেছে, গত ২৬ আগস্ট সকাল সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা খাদ্য গুদাম পরিদর্শনে যান ইউএনও সাবরিনা শারমিন। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইয়াছিন আলী, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এস.এম শামীম আহম্মেদ ও ইউডিএফ এম এ মতিন এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শনকালে এফএস এক নম্বর গুদামে খাওয়ার অনুপযোগী নিম্নমানের লাল চালের পর্যাপ্ত পরিমাণ মজুদ পরিলক্ষিত হয়। এ সময় ১৩২ বস্তা চাল জব্দ করে সেগুলো আলাদা করে রাখা হয়।
খাদ্য গুদাম পরিদর্শনের আগে অভিযোগ আসে উপজেলার ঝালুকা ইউনিয়নে উন্নতমানের চালের সঙ্গে নিম্নমানের লাল চাল মিশিয়ে ভিডাব্লিউবি প্রকল্পের উপকারভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। অভিযোগ পেয়ে ইউএনও সাবরিনা শারমিন তাৎক্ষণিকভাবে ওই ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পান। ওই দিনই তিনি চাল বিতরণ কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেন।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গুদামে ১৩২ বস্তা লাল ও নিম্নমানের চাল গোপনে মজুদ করা হয়েছে। তবে চালগুলো কিভাবে কোন এলএসডি থেকে আনা হয়েছে গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি এলএসডি) রফিকুল ইসলাম এ বিষয়ে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হন। তিনি এও জানান, লাল চাল মজুদের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানেন।
জানতে চাইলে গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) ওমর ফারুকের নির্দেশে গুদাম থেকে নিম্নমানের চাল সরিয়ে উন্নতমানের চাল মজুদ করা হচ্ছে। উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইতোমধ্যে তাঁকে শোকজ করেছেন বলেও তিনি স্বীকার করেন।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইয়াছিন আলী জানান, নিম্নমানের চাল মজুদ সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। ইউএনও’র পরিদর্শনের পর তিনি ঘটনা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।
গুদামে নিম্নমানের চাল কি পরিমাণ মজুদ আছে তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
নিম্নমানের চাল মজুদের বিষয়ে উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌসকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আল মামুন ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার এস. এম শামীম আহম্মেদ।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আমরা সবকিছু খতিয়ে দেখছি। তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিন জানান, নিম্নমানের চাল মজুদের বিষয়টি ইতোমধ্যেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১৩২ বস্তা চাল জব্দ করে সেগুলো আলাদা করে রাখা হয়েছে।
ইউএনও আরও বলেন, সরকারের খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির আওতায় এই প্রকল্প দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম মেনে নেয়া যাবে না। এমনকি নিম্নমানের এসব চাল বিতরণ করাও যাবে না। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অপরদিকে, ইউএনও সাবরিনা শারমিনের হস্তক্ষেপে নিম্নমানের চাল বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রাখায় উপকারভোগীদের মাঝে স্বস্তি নেমে এসেছে। পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসায় পঞ্চমুখ ইউএনও সাবরিনা শারমিন।
বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, সান্তাহার অথবা ভবানীগঞ্জ এলএসডি থেকে নিম্নমানের এসব চাল এনে দুর্গাপুর খাদ্য গুদামে গোপনে মজুদ করা হয়েছে। এই চিত্র শুধু দুর্গাপুরেই নয়, রাজশাহীর অন্যান্য এলএসডি গুলোতেও মজুদ করা হয়েছে। সরেজমিনে তদন্ত করলেই এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলেও সূত্রটি নিশ্চিত করেছেন।