, , ।
সবুজ ইসলাম: ২০২৪ সালের ০৫ আগস্টের আগে রাজপথে বিএনপি যখন আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলো তখন মিটিং-মিছিল বা সমাবেশে খুব কম নেতাকর্মীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত। দলকে ভালোবাসে এমন কিছু ত্যাগি কর্মীরা বিগত সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মাঠে ছিল। কিন্তু পট পরিবর্তন হওয়ার পরপরই যেন চিত্র পাল্টে গেছে। এখন যেন সবাই বিএনপি। দলের বিপদের সময় মাঠে না থাকলেও এখন তাদের ব্যানার-ফেস্টুনে এলাকা সয়লাব। নতুন এসব বিএনপির নেতাকর্মীদের ভিড়ে ত্যাগীরা যেন কোণঠাঁসা। নব্য গজিয়ে উঠা এসব নেতারা দলের নাম ভাঙিয়ে করছেন নানান অপতৎপরতা। এতে অনেকটা বিরক্ত দলটির শীর্ষ নেতারা।
কেন্দ্র থেকে তৃণমুল পর্যন্ত সর্বত্র সুবিধাবাদী আর হাইব্রিড নেতা-কর্মীদের ভীড়ে কোণঠাঁসা হয়ে পড়েছে তৃণমূল বিএনপি। কেন্দ্র থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলেও তৃণমূলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলতে নেতাকর্মীদের নির্দেশনা প্রদান করেই যাচ্ছে। তারপরেও তৃণমূল পর্যায়ে দলের নাম ভাঙিয়ে অপতৎপরতায় থামছেই না। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দলটির ত্যাগী এবং দুঃসময়ে নেতা-কর্মীরা চরম বিব্রত।
রাজশাহী বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে হাইব্রিডদের পদচারণায় কোনঠাসা হয়ে পড়েছে বহু বছরের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা রাজপথের লড়াইয়ে সম্মুখসারীতে ছিলো তারাই এখন হাইব্রিডদের চাপে দলবিমুখ হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় সুবিধাবাদী শ্রেণির ব্যক্তিরা দলের প্রতিটি জায়গায় গেড়ে বসতে শুরু করেছেন। দলের দুঃসময়ে এরা কখনোই বিএনপির রাজনীতিতে না থাকলেও বর্তমানে হর্তাকর্তা হয়ে উঠছেন। এদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তৃনমূল কর্মীদের মধ্যে হতাশাও বিরাজ করছে।
জানুয়ারি মাসে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের ভিত্তিতে নগরীর মতিহার থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাদাৎ মো. সায়েম মিলনকে তার পদসহ সব প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। একই বিজ্ঞপ্তিতে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আহম্মেদ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে কেন তাকে বহিষ্কার করা হবে না তা জানতে রাজশাহী মহানগর বিএনপির কাছে লিখিত আকারে জবাব দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়াও জুন মাসে জেলার পুঠিয়া উপজেলায় চাঁদাবাজির অভিযোগে দুই নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃত দুজন হলেন- উপজেলা বিএনপির সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম জুম্মা ও বানেশ্বর ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম রফিক। এদের মধ্যে আনোয়ারুল ইসলাম পুঠিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। আর রফিকুল ইসলাম বানেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। বিজ্ঞপ্তিতে স্বক্ষর করেছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ, যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম মার্শাল ও সদস্য সচিব বিশ্বনাথ সরকার।
এইসব বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য রায়হানুল আলম রায়হান দৈনিক সানশাইনকে বলেন, ‘আমরা ৫ আগস্টের আগে যাকে চিনিও না, তারা নাকি এখন বড় নেতা। অনেক জায়গায় দলের নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। আমি আপনাদের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি আর্কষণ করছি, যারা দলের নাম ভাঙিয়ে এগুলো করছে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসেন। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আমাদের এগুলো হাইব্রিড বিএনপি থেকে দূরে থাকতে নির্দেশনা দিয়েছেন।’
রাজশাহী জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব আল আমিন এই বিষয়ে বলেন, ‘নব্য বিএনপি যারা ৫ আগস্টের পরে নেতা হয়েছে তারা দলে ঢুকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। যারা বিগত সময়ে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের সাথেও ছিলো তারা আবার এখন বিএনপির নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি, ট্রেন্ডারবাজি করছে। আমরা এগুলো ঘটনায় বিব্রত। আপনারা দেখেছেন আমাদের দল থেকে অনেককে বহিস্কার করা হয়েছে। কিন্ত যাদের পদ-পদবী নেই তাদের কিভাবে বহিস্কার করবে ? আমরা তৃণমুলের পক্ষ থেকে হাইব্রিড বিএনপির অপসারণ চাই।’
রাজশাহী জেলা তাঁতী দলের সভাপতি কুতুব উদ্দিন বাদশা বলেন, ‘আমরা দলের ভেতরে হাইব্রিড বিএনপি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে আছি। ৫ তারিখের আগে মিটিং মিছিল সমাবেশ করতে লোক পাওয়া যেতো না। কিন্তু এখন আমাদের নেতার অভাব নেই। কিছুদিন আগে পবা উপজেলায় একটি ট্রেন্ডারকে কেন্দ্র করে যেভাবে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে ট্রেন্ডার বাক্স লুট করা হলো তা সত্যিই দুঃখজনক। আওয়ামী লীগের সময়েও এভাবে ট্রেন্ডার বাক্স লুট হয়নি। আর এখন আমাদের দলের নাম ভাঙিয়ে অরাজকতা করা হচ্ছে। আমাদের এদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং দলের হাইকমান্ডদের কাছে থেকে এই বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ চাই।’
রাজশাহী জেলা বিএনপির আহব্বায়ক আবু সাইদ চাঁদ এই বিষয়ে দৈনিক সানশাইনকে বলেন,‘সামনের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় যাবে ভেবে নিয়ে এখন অনেকেই আমাদের দলে যোগদান করতে মরিয়া হয়ে উঠছে। তারা কোথাও আশ্রয় না পেয়ে বিএনপিতে আসার জন্য চেষ্টা করছে। অনেক সময় আমাদের দলের নাম ভাঙিয়ে বিভিন্ন জায়গায় অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। এতে করে বিএনপির সুনাম নষ্ট হচ্ছে। সেজন্য আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের এগুলো হাইব্রিড বিএনপির কাছে থেকে দূরে থাকতে নির্দেশনা দিচ্ছি। কাউকে যাতে দলে অনুপ্রবেশ না করানো হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘আপনারা ইতিমধ্যে দেখেছেন আমার পুঠিয়ায় দল থেকে দুইজনকে ইতিমধ্যে বহিস্কার করা হয়েছে। আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমান আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দিচ্ছেন আমরা সেইভাবে কাজ করছি।’