সর্বশেষ সংবাদ :

রামেক, শয্যার তুলনায় তিনগুণ রোগি

ইবতিদা ফেরদৌস: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (রামেক) বর্তমানে ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। এক হাজার ২০০ শয্যার অনুমোদিত হাসপাতালটিতে বর্তমানে ভর্তি রোগির সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার। রোগির এই ঢল সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে অপরদিকে হতাশও রোগি ও তার স্বজনরা।
রামেককে ২০১৩ সালে এক হাজার ২০০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হলেও এখনও এটি চলছে ১৯৮৫ সালের ৫০০ শয্যার জনবল ও অবকাঠামো দিয়ে। বর্তমানে ৩৩০ জন চিকিৎসক ও এক হাজার ২১০ জন নার্স এখানে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন, যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
রামেক শুধু রাজশাহী বিভাগ নয়, বরং রংপুর ও খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলা থেকেও রোগি গ্রহণ করে থাকে। রোগির সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও জনবল ও অবকাঠামো বাড়েনি, ফলে প্রতিদিনই বেড়ে চলছে ভোগান্তি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শয্যার অভাবে বহু রোগি মেঝে, করিডোর ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিশেষ করে মেডিসিন বিভাগে পরিস্থিতি সবচেয়ে করুণ। ওয়ার্ড নম্বর ৪২ থেকে ৪৯ পর্যন্ত মেডিসিন ইউনিটে রয়েছে মাত্র ৭১টি বেড (পুরুষদের জন্য ৩২টি, নারীদের জন্য ৩৯টি), অথচ এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন প্রায় ৩৫০ জন রোগি।
স্থান সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারী রোগিদের একই ওয়ার্ডে রাখতে হচ্ছে।
সম্প্রতি রামেক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বেড পাইনি, মেঝেতে শুয়ে আছি। চিকিৎসক একবার এসে দেখে গেছেন, তারপর আর কেউ আসেনি। বড় ডাক্তাররা শুধু সকালে আসেন।’
কিডনি রোগে আক্রান্ত নাজমা খাতুন জানান, ‘হাসপাতালের ফার্মেসিতে প্রয়োজনীয় ওষুধ মেলে না, বাইরে থেকে কিনতে হয়। এতে অতিরিক্ত ব্যয়ের হয়। আমরা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যদি বাহির থেকেই ওষুধ কিনতে হয় তাহলে লাভ কি?
খাবারের মান নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। রোগি আবুল হাসেম বলেন, ‘পাতলা ডাল-ভাত দেওয়া হয়। এতে শরীর ঠিক হওয়ার চেয়ে খারাপ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।’
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে শৌচাগার ও স্নানঘর আরও করুণ দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। বৃদ্ধা তসলিমা আক্তার ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘টয়লেটের দুর্গন্ধে দাঁড়ানো যায় না। সব সময় পিচ্ছিল থাকে, পড়ে গেলে প্রাণ যাওয়ার ভয় থাকে।’
অত্যধিক রোগির চাপ সামলাতে হিমসিম খেতে হয় কর্তব্যরত চিকিৎসকদের। হতাশার সুরে চিকিৎসকরা জানান আগত রোগির তুলনায় চিকিৎসক অনেক কম ফলে ব্যাহত হয় কাঙ্ক্ষিত সেবা।
ইন্টার্ন চিকিৎসক ফারহান খালিদ বলেন, ‘প্রতিদিন ৬০ জন রোগির জন্য প্রস্তুতি থাকে, অথচ এখন ১৩০ থেকে ১৪০ জনকে দেখতে হচ্ছে। এতে মানসম্পন্ন চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
সিনিয়র নার্স সুমি আক্তার বলেন, ‘সারারাত ডিউটি দিই, কিন্তু এত রোগির ভিড়ে সবার প্রতি নজর দেওয়া যায় না। রোগিরা ক্ষুব্ধ হলেও আমাদেরও কিছু করার থাকে না।’
রামেকে বর্তমানে রয়েছে ৫৬টি ওয়ার্ড, ৮টি অপারেশন থিয়েটার (ওটি), ৪৫টি আইসিইউ শয্যা, দুটি এমআরআই মেশিন (এর মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে অচল), দুটি সিটিস্ক্যান মেশিন (একটি অচল)। এতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। এই অবস্থা কেবল রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একক সমস্যা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি।
রামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফ এম শামিম আহমেদ বলেন, আমাদের এখানে রোগির প্রচুর চাপ। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি উন্নত সেবা প্রদানের।


প্রকাশিত: May 23, 2025 | সময়: 4:36 am | সুমন শেখ