, , ।
স্টাফ রিপোর্টার, তানোর: রাজশাহীর তানোরে এক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে জমি ও সেচ পাম্প দখলে নিয়ে দুইটি ভুয়া দলিল তৈরির করা অভিযোগ উঠেছে। ভুয়া দলিল করার অভিযোগ তুলে রাশিদা বিবি নামের এক বিধবা নারী আওয়ামী লীগ নেতা সাফিউল, তানোর সাবরেজিস্ট্রার সহ দুইটি ভুয়া দলিল তৈরির সাথে সংশ্লিষ্ট ১৪ জনের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেছেন। মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি ঘটেছে তানোর উপজেলার তালন্দ ইউপির আড়াদিঘি গ্রামে। রাশিদা বিবি মৃত আইনুল ইসলামের স্ত্রী। রাশিদা এবং আওয়ামী লীগ নেতা সাফিউল একই এলাকার বাসিন্দা। সাফিউল উপজেলার তালন্দ ইউপির পাঁচ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি। প্রায় ৩০ লাখ টাকার সম্পদ বেহাতের আশঙ্কায় মামলা দায়েরের পর রাশিদা গত চার বছর থেকে আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।
রাশিদা ২০২২ সালের ৭ আগস্ট রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলী আদালতে দুইটি ভুয়া দলিল তৈরির ঘটনায় প্রতারণার মামলাটি দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তানোর থানার ওসিকে এজাহার হিসেবে গণ্য করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এরপর ১২ আগস্ট থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য থানাকে নির্দেশ দেন।
এদিকে মামলার বাদী রাশিদার দাবি করে বলেন, মামলা দায়েরের পর তানোর থানা পুলিশকে থানায় এজাহার হিসেবে গণ্য করে তদন্তের নির্দেশ দেন বিজ্ঞ আদালত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ নেতা সাফিউলের দ্বারা ‘আর্থিক ভাবে প্রভাবিত’ হয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি। এমনকি এজাহারভুক্ত স্বাক্ষীদের জবানবন্দি না নিয়েই আদালতে প্রতিবেদন দেন।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতার থাকায় তানোর থানা এবং পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দুইজন কর্মকর্তা দুই দফা তদন্ত করে আওয়ামী লীগ নেতা সাফিউলের কাছে ‘অনৈতিক সুবিধা’ নিয়ে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছেন। এ ঘটনায় তিনি নারাজি দিলে আদালত তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন। বর্তমানে এটির তদন্ত করছেন সিআইডি। মামলা করার পর থেকে সাফিউল আমাকে বিভিন্ন ভাবে হুমকি দিচ্ছে।
এদিকে রাশিদার দায়ের করা মামলার আসামিরা হলেন, আওয়ামী লীগ নেতা সাফিউল, তানোর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের তৎকালীন সাবরেজিস্ট্রার প্রয়াত রওশন আরা বেগম, দলিল শনাক্তকারী শহিদুল ইসলাম, রেকর্ড কিপার সাহাদত হোসেন, দলিল লেখক মইন উদ্দিন, নকল কারক মুনজুমার খাতুন, নকল নবিশ হাসিনা খাতুন, আলোক কুমার, হলফ কারক বেলাল হোসেন, পাঠক অহেদ আলী, আব্দুল খালেক ও দলিলের স্বাক্ষী সাইদুর রহমান।
মামলার এজাহারে রাশিদা উল্লেখ করেন, ২০২২ সালের ২৩ মার্চ তার স্বামী আইনুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর মাত্র তিন দিন পর আওয়ামী লীগ নেতা সাফিউল জমি ও সেচ পাম্প আইনুলের কাছে ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর কিনেছেন বলে দাবি করেন। সেসময় প্রতারিত রাশিদা দলিল দেখতে চাইলে সাফিউল অপারগতা প্রকাশ করেন।
জানা গেছে, দুইটি দলিলে আড়াদিঘি মৌজার ৬৭ খতিয়ানের ৬১ নম্বর দাগে পাঁচ শতক জমি কেনার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু দলিলে সেচ পাম্প কেনার ব্যাপারটি নেই। এরপর সাফিউলের দ্বিতীয় দলিলটিতে তোলা হয়। এ দলিলে জমি কেনার বিষয়ে উল্লেখ থাকলেও তফসিলে সেচ পাম্প কেনার কথা উল্লেখ নেই। শুধু উদ্দেশ্যের কলামে সেচ পাম্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এলাকাবাসি জানান, প্রয়াত আইনুল একটি সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করেছিলেন। এরপর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি থেকে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ছাড়পত্র নেন তিনি। আইনুল প্রয়াত হলে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করছেন তার স্ত্রী রাশিদা বিবি।
আড়াদিঘি গ্রামের বাসিন্দা মাইনুল ইসলাম জানান, আইনুল অসুস্থ হলে তার প্রতিবেশি সাফিউল সেচ পাম্পটি পাঁচ লাখ টাকায় লিজ নেন। চুক্তি অনুযায়ী চার বছরের টাকা একযোগে পরিশোধ করার কথা। এ অবস্থায় ২০২২ সালের ২৩ মার্চ আইনুল মারা যান। পরে তার স্ত্রী রাশিদা লিজের টাকা চান। এসময় সাফিউল ব্যাংকের চেক দেন। চেকটি রুপালী ব্যাংক তানোর শাখার অনুকূলে জমা দিলে অপর্যাপ্ত তহবিল ও স্বাক্ষর সঠিক নেই বলে ডিজঅনার ম্লিপ সহ ফেরত দেওয়া হয়। এরপর একই বছরের ২৯ মে রাশিদা এ ঘটনায় সাফিউলের বিরুদ্ধে রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল আমলী আদালতে আরেকটি প্রতারণার মামলা করেন।
এরআগে গত ২০২২ সালের ৮ মে প্রতারক সাফিউল ইসলাম বাদী হয়ে সেচ পাম্পটি তার দখলে আছে মর্মে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৪৪/১৪৫ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় রশিদা বিবি সহ ৮ জন নামধারীকে আসামী করা হয়। মামলাটি বিজ্ঞ আদালত আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্টদের তদন্ত দেন।
বিজ্ঞ বিচারক তদন্ত প্রতিবেদন ও সার্বিক দিক বিবেচনায় লিখিত রায় প্রকাশ করেন। রায়ে বলা হয় নালিশী স্থানে সেচ পাম্প রয়েছে, যার মূল্য ২৫-৩০ লক্ষ টাকা। কিন্তু দলিল মোতাবেক দেখা যায়, উক্ত সম্পত্তি মাত্র ২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকায় হস্তান্তর হয়েছে। যেখানে পাম্পের মূল্য অনেক বেশি। সেখানে জমি সহ পাম্প এত সল্প মূল্যে ক্রয় বিক্রয় গ্রহণযোগ্য নয়। জমি সহ সেচ পাম্পটি সাফিউল ইসলামের দখলে নেই মর্মে প্রতীয়মান হয়। ফলে সেচ পাম্পটি বাদী সাফিউল ইসলামের নিরঙ্কুশ দখল না থাকায় নথিজাত করে দেন আদালতের বিজ্ঞ বিচারক। ফলে ১৪৪-১৪৫ ধারার মামলার রায় বিবাদী রশিদা বিবির পক্ষে হয়।
সেচ পাম্প স্থাপনের শুরু থেকে বর্তমানে মৃত আইনুল ইসলামের স্ত্রী রশিদা বিবির দখলে রয়েছে। সে সুবাদে পল্লীবিদ্যুৎ বিল নিয়মিত পরিশোধ করে সেচ পাম্প পরিচালনা করে আসছেন তিনি।
দলিল জালিয়াতি এবং চেক প্রতারণার মামলার বিষয়ে ফোনে আওয়ামী লীগ নেতা সাফিউল ইসলামকে ফোন দিলে তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
এবিষয়ে তানোর অফিসের সাবরেজিস্ট্রার ইয়াছির আরাফাত বলেন, ঘটনার সময় আমি এখানে কর্মরত ছিলাম না। তবে যোগদানের পরে আদালতে মামলার বিষয়টি শুনেছি। দলিল জালিয়াতি হয়ে থাকলে আদালত যদি নির্দেশ দেন, তাহলে তদন্ত করে দেখা হবে।