, , ।
সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী: সাপ কামড়ানোর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে গ্রামের মানুষ। বাংলাদেশের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সাপের কামড় ঘটে গ্রামে। ধানক্ষেতে কাজ করা কৃষক, গৃহস্থালির আঙিনা বা পুকুরপাড়ে বসবাসকারী মানুষই সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন। কিন্তু যেখানে কামড় সবচেয়ে বেশি ঘটে, সেই গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা উপজেলা হাসপাতালে সচরাচর অ্যান্টিভেনম পাওয়া যায় না। এগুলো থাকে মূলত জেলা সদর হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে মেলেনা অ্যান্টিভেনম। তবে, আশার কথা হচ্ছে দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাপের বিষ প্রতিষেধক ভ্যাকসিন ‘অ্যান্টিভেনম’ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) ও ওষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে (ডিজি) এ আদেশ বাস্তবায়ন করে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য বলেছেন আদালত।
উচ্চ আদালতের এমন আদেশে খুশি গ্রামের মানুষ। এদিকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৩১ শয্যা হাসপাতালে সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে দু’শত এন্টিভেনম সরবরাহ করেছে উপজেলা প্রশাসন। সোমবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে এ ওষুধ ডা. তৌহিদুল ইসলামের হাতে তুলে দেন। এ সময় তিনি বলেন, বর্ষাকাল ও কৃষি মৌসুমে সাপের কামড়ের ঘটনা বৃদ্ধি পায়, যা অনেক সময় প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সময়মতো এন্টিভেনম সরবরাহ করা গেলে জীবন বাঁচানো সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এ ধরনের কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়া হবে। এ বিষয়ে গোদাগাড়ী ৩১ শয্যা হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম জানান, এখন থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৩১ শষ্যা হাসপাতালে রোগীদের অ্যান্টিভেনম ইনজেকশান দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘অনেকে সাপে কাটার পর আগে ওঝা বা কবিরাজের কাছে নিয়ে যায়। যখন রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায় তখন হাসপাতালে নিয়ে আসেন, ফলে সেই সময়ে ডাক্তারদের আর কিছু করার থাকে না। এই কারণে চর ও বরেন্দ্র অঞ্চলে সাপের কামড়ে বেশি মানুষ মারা যায়। তাই আমি বলবো এখন থেকে কাউকে সাপে কাটলে তাকে ওঝা বা কবিরাজের কাছে নিয়ে না গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে বিনামূল্যে অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন নিবেন।’
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা জানান, অ্যান্টিভেনম থাকায় রোগিরা দ্রুত সেবা পাবেন এবং সাপের কামড়ে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। বিশেষ করে কৃষক, দিনমজুরসহ নিম্ন আয়ের মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।
স্থানীয় সুশীল সমাজ ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা উপজেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগকে মানবিক ও সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে সাপে কাটা রোগীদের জীবন বাঁচানো এবং তাদের দ্রুত সুস্থ করে তোলার পথ সুগম হবে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১৬ হাজার ৫২১ জন এবং মারা গেছেন ৯১ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৪৩২ জন, মারা গেছেন ১১৮ জন। আর ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুন মাত্র তিন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৪০৫ জন, মারা গেছেন ৪৩ জন।
অর্থাৎ সরকারি হিসাবে গত দুই বছরে দেশে সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ৪২ হাজার মানুষ, আর মারা গেছেন অন্তত দুই শতাধিক।
কিন্তু আন্তর্জাতিক তথ্য ছবিটা আরও ভয়াবহ করে তোলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে বছরে আনুমানিক ৫ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সাপে কামড়ের শিকার হন এবং মারা যান প্রায় ৬ হাজার মানুষ। আর সাম্প্রতিক এক জাতীয় জরিপে বলা হয়েছে, প্রতিবছর গড়ে ৪ লাখ মানুষ সাপে কামড়ান, মৃত্যু হয় অন্তত ৭ হাজার ৫০০ জনের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গবেষণায় দেখা যায় দেশে প্রতিবছর সাপে কামড়ানোর ঘটনায় ২০ শতাংশ বা তার কিছু বেশি মৃত্যুর হার হয়ে থাকে।
সরকারি হিসাব কেবল হাসপাতালভিত্তিক তথ্য। কিন্তু গ্রামের মানুষ অনেক সময় হাসপাতালে না গিয়ে স্থানীয় চিকিৎসক বা ঝাড়ফুঁকের ওপর নির্ভর করেন। তাই প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে এবং দ্রুত অ্যান্টিভেনম দেওয়া গেলে সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।