, , ।
স্টাফ রিপোর্টার: প্রায় ৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাজশাহী মহানগরীকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষায় নির্মিত হয়েছে ৪৮৮ দশমিক ৫৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ড্রেনেজ ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে নানা পরিকল্পনায় বাস্তবায়িত এসব ড্রেনের নেটওয়ার্কে প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি তিন ধাপে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অল্প বৃষ্টিতেই থই থই পানি জমে নগরজুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। সামনে বর্ষা, ফলে সিটি করপোরেশনের সক্ষমতা, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশ্ন তুলছে নগরবাসী।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) তথ্য বলছে, নগরীতে বর্তমানে প্রাইমারি ড্রেন রয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ কিমি, সেকেন্ডারি ড্রেন ৮১ দশমিক ৩২ কিমি এবং টারশিয়ারি ড্রেন ৩৯৪ দশমিক ৬২ কিমি। এসব ড্রেন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এত বড় ড্রেন নেটওয়ার্ক থাকার পরেও যখন একটু বৃষ্টি হলেই পানি জমে থাকে, তখন সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানায়, ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর সর্বোচ্চ ১৬৫ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। চলতি বছর মার্চ থেকে মে মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে মোট ১৩৮ দশমিক ২ মিলিমিটার। এর মধ্যে মে মাসের ৮ দিনেই ১৭০ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। অথচ মাত্র ৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিতে পুরো নগরী জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ড্রেনেজ ব্যবস্থায় কিছু বড় ধরণের ত্রুটি রয়েছে। যদি স্বাভাবিক বৃষ্টিতেই পুরো শহর অচল হয়ে যায়, তাহলে বর্ষায় কী অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমেয়।
নগরীর সাহেববাজার, কয়েরদাড়া, দাসপুকুর, উপশহর, সিএন্ডবি মোড়, বালিয়াপুকুর ও মেডিকেল কলেজ এলাকার মতো নিচু জায়গাগুলোতে প্রতিবার বৃষ্টির পরপরই পানি জমে। রাস্তায় ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কোনো কোনো এলাকায় পানি ঘরে ঢুকে পড়ে।
স্থানীয় মুদি দোকানি রহমত আলী বলেন, বৃষ্টি শুরু মানেই দোকান বন্ধ। হাঁটুসমান পানি দোকানের সামনে জমে থাকে, ক্রেতারা আসে না। দুই দিন এমন থাকলে সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে যায়।
স্কুল শিক্ষার্থী ফাতেমা আক্তার জানান, প্রতিদিন স্কুলে যেতে হয়। বৃষ্টির দিনে চারদিক পানিতে ভরে যায়। কখনো কাদায় পড়ে যাই, কখনো স্যান্ডেল খুলে যায়। এরপর ক্লাসে মন বসে না।
রিকশাচালক আলাল শেখ বলেন, রিকশা চালাতে ভয় লাগে। কোথায় চাকা আটকে যায় বোঝা যায় না। যাত্রীও রিকশায় উঠতে চায় না। আয় বন্ধ হয়ে যায়।
সিএন্ডবি মোড়ের ব্যবসায়ী মামুন হোসেন বলেন, আমাদের দোকানের সামনের রাস্তায় কোনো ড্রেনই নেই। পানি নামার পথ নেই। ফলে দোকানের সামনে জমে থাকে পানি, কাদা আর গন্ধ। দিন শেষে দোকান বন্ধ করে চলে যেতে হয়। বারবার অভিযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি।
রাজশাহী শহরের জলাবদ্ধতা এখন কেবল রাস্তায় জমে থাকা পানির সমস্যা নয় এটি শহরের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এবং জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন সময়োপযোগী পরিকল্পনা, জনসচেতনতা, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার এবং প্রকৃতি সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ।
রাসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আহমদ আল মঈন বলেন, মানুষ ড্রেনে ভারী আবর্জনা, ইট, বালু, পলিথিন ফেলে। এতে ড্রেন বন্ধ হয়ে যায়। আমরা নিয়মিত পরিষ্কার করছি। কিন্তু মানুষ সচেতন না হলে কোনো পরিকল্পনাই কাজে দেবে না। তিনি আরও জানান, সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মানুষের অভ্যাস না বদলালে জলাবদ্ধতা রোধ করা কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে ঘাটতি রয়েছে পরিকল্পনায়। নগর পরিকল্পনাবিদ ও রুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল ওয়াকিল বলেন, রাজশাহী শহরের ড্রেনেজ পরিকল্পনা অনুযায়ী, জলাবদ্ধতা হওয়ার কথা নয়। পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ হচ্ছে বারোনই নদী। পানির প্রবাহ ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি রাস্তার পানি ড্রেনে পড়তে বাধা পায়, যা বড় কারণ। এছাড়া পূর্বে যেসব প্রাকৃতিক পুকুর ও জলাধারে পানি জমতো, সেগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি সরতে সময় লাগে। তিনি আরও বলেন, ড্রেনের নেটওয়ার্ক ঠিক থাকলেও ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ দুর্বল। এসব সমস্যা সমাধান না করলে জলাবদ্ধতা নিরসন অসম্ভব।