, , ।
সাইফুল ইসলাম, গোদাগাড়ী: বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮ টি উপজেলার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে আশঙ্কাজনক হারে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনকেই বরেন্দ্র অঞ্চলে পানিসংকটের অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে আগামীতে বোরো ধান উৎপাদনে অনিশ্চয়তার শঙ্কা করেছে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। এই অবস্থায় বরেন্দ্র অঞ্চলের আটটি উপজেলায় ইরি ধান চাষে নিরুৎসাহিত করছে বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ।
বিএমডিএ সূত্রে জানা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতি বছর পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং মাটির নিচে পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। প্রতিবছর ইরি ধান আবাদ করতে ১৬ থেকে ১৮টি সেচ লাগে। অন্যদিকে গম চাষ করতে মাত্র ২ থেকে ৩টি সেচ লাগে।
এ ছাড়া প্রতিবছর উপজেলায় বৃষ্টির মাধ্যমে ভূগর্ভেস্থে যে পরিমাণ পানি জমা হয় ফসল চাষে তার চেয়ে বেশি পানি ব্যবহার হয়। ২০২৪ সালে গড় বৃষ্টিপাত হয়েছে ১২১৬ মিলি মিটারের মত। এতে প্রতিনিয়ত বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির নিচের পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে। তাই এই অঞ্চলে ইরি ধান আবাদ কমিয়ে দিলে পানির সংকট ধীরে ধীরে কেটে যাবে বলে আশা করছে বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ। সেক্ষেত্রে তারা কৃষকদের ইরি ধান চাষাবাদে নিরুৎসাহিত করার জন্য কৃষকের মাঝে লিফলেট বিতরণ ও প্রতি স্কিমে ডিপ থেকে পানি দেওয়ার কর্মঘণ্টা বেঁধে দিয়েছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আমন ধান ঘরে তোলার পর বোর ধান চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তারা। কিন্তু হঠাৎ করেই বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ পানি দেওয়ার কর্মঘণ্টা বেঁধে দেওয়ার কারণে বিপাকে পড়েছেন তারা।
এতে কৃষকদের মাঝে অসস্তোষ বিরাজ করলেও বাধ্য হয়েই অন্য ফসল উৎপাদনের জন্য ঝুঁকে পড়েছেন তারা। কৃষকরা জানান, ইরি ধান চাষ করতে প্রতি স্কিমে প্রায় ২০০০ ঘণ্টা পানি লাগবে, কিন্তু বিএমডিএ থেকে এ বছর ৯৮০ ঘণ্টা পানি দিবে। তাতে ইরি ধান চাষ করা সম্ভব নয়। তাই এবার তারা সীমিত পরিমাণ জমিতে ইরি ধান চাষ করবেন আর অন্য জমিতে সেচ সাশ্রয় অন্যান্য ফসল চাষাবাদ করছেন। এ ছাড়া বিএমডিএ’র এ সিদ্ধান্তে চালের সংকট দেখা দিতে পারে এবং চালের দামও বাড়তে পারে বলে মনে করেন কৃষকরা।
তবে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, বিএমডিএ’র উদ্যোগটি ভালো। তবে বিএমডিএ’র এই উদ্যোগ আরও আগে থেকে ধীরে ধীরে নেওয়া দরকার ছিল। এই মৌসুমে ইরি ধান চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করার বিষয়টি তিন থেকে চার মাস আগে জানালে তারা অন্য কোনো ফসল চাষের ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতো।
গোদাগাড়ী পৌর এলাকার মহিশালবাড়ী গ্রামের কৃষক শাহাদত হোসেন বলেন, (বিএমডিএ) থেকে শুনতে পাচ্ছি ডিপে (স্কিমে) জমি কম করে আবাদ করতে হবে। এতে আমরা আগে পাঁচ বিঘা জমি আবাদ করতাম এখন পাবো দুই বিঘার মতো। আর আবাদ কমে গেলে আমাদের কাজ কমে যাবে। তাতে আমাদের অসুবিধা হবে। এ ছাড়া ফসল উৎপাদন না হলে চালের উৎপাদন বেড়ে যাবে এবং চালের সংকট দেখা দেবে বলে মনে করছি। দিন দিন পানির লেভেল নিচে নেমে যাচ্ছে তাই সরকারের কাছে পানির লেভেল বাড়ানোর জন্য আবেদন করছি।
শ্রীকৃষ্ণপুর মোজার ডিপ অপারেটর শামিম রেজা বলেন, আমার স্কিমে ২০০ বিঘা জমি আছে। তাতে গতবছর ১৭০ বিঘার মতো ইরি ধান আবাদ করেছিলাম। এ বছর বিএমডিএ তিন মাসের জন্য ৪৮০ ঘণ্টা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তাই এই কর্মঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করা হবে। এ ছাড়া আমরা ভাত বেশি খাই, গম কম খাই। তাই ধান আবাদ হলে কৃষকের জন্য ভালো। আর ধান চাষ না হলে মূল্য বেড়ে যাবে।
সাগুয়ানের ডিপচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, গত বছর ৫০ বিঘা মতো ইরি ধান আবাদ করেছিলাম। এ বছর আবাদ হবে ১০ বিঘার মত। পানি স্বল্পতার কারণে বোরো মৌসুমে ধান আবাদ করতে পারছি না। এ কারণে সেচ সাশ্রয়ী ফসল আবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
গোদাগাড়ী কৃষি কর্মকর্তা মরিয়ম আহম্মেদ বলেন, বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ এই মৌসুমে বোর ধানের আবাদ কমিয়ে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করে ডাল, গম, ভুট্টা জাতীয় ফসল চাষে উৎসাহিত করছেন। বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে এ বিষয়ে অবগত করেছেন এবং আমরাও মাঠ পর্যায়ে কৃষকদেরকে জানিয়েছি। কারণ হলো বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটি ভালো উদ্যোগ। এই সিদ্ধান্ত আরও আগে নিলে ভালো হতো। তারপরও সেচ সাশ্রয়ী অনেক ফসলের পরিধি বাড়ছে।
এ ছাড়া ভূর্গস্থ পানির স্তর সঠিক মাপে রেখে যদি আমরা বোরো ধানের চাষাবাদ কমিয়ে আনতে পারি তাহলে এই অঞ্চলের জন্য এটা একটা শুভ বার্তা এবং যে ফসলগুলোতে পানি কম লাগে সেই ফসলগুলো উৎপাদন করলে এই অঞ্চলের কৃষি বাঁচবে। তাই এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত এবং জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এটিকে বাস্তবায়নের জন্য মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে এবং এটিকে বাস্তবায়ন করতে পারলে এই অঞ্চলের কৃষি বেঁচে যাবে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গোদাগাড়ী জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল লতিফ সরকার বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চল আগে মরুভুমি ছিলো যেখানে একটা ফসল ফলাতে অনেক কষ্ট করতে হত, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ফলে এখন তিন ফসল হচ্ছে, আবার কোথাও কোথাও চার ফসলও হচ্ছে, এতে কৃষক লাভের মুখ দেখতে পারছে।
কিন্তু কয়েক বছর থেকে দেখা যাচ্ছে গোদাগাড়ী, তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, নাচোল, গোমস্তাপুর, নিয়ামতপুর, সাপাহার ও পোরশা সহ বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮টি উপজেলায় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। সেই জন্য বিভিন্ন দেশী-বিদেশী গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে এ সকল এলাকায় টেকসই সেচ ব্যবস্থাপনায় এই সব এলাকায় শস্য বিন্যাসের মাধ্যমে এখন থেকে কম পানি লাগে এমন ফসল আবাদের দিকে আমাদের যেতে হবে যেমন: গম, ভুট্টা, মসুর ডাল, পেঁয়াজ সহ অনান্য ফসল আবাদ করতে হবে। তাহলে পানির যে সমস্যা এই আট উপজেলায় তা অল্প সময়ে সমাধান হয়ে যাবে।
তাই আমরা বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ বোরো ধানের পরিবর্তে গম, সরিষা অর্থাৎ পানি কম লাগে এমন ফসল চাষাবাদে উৎসাহিত করছি। আগামী ১৫ ফ্রেবুয়ারি থেকে ১৫ মে পর্যন্ত তিন মাস বরেন্দ্র অঞ্চলে গভীর নলকূপগুলোতে ৯৮০ ঘণ্টা সেচ কার্যক্রম চালোনোর জন্য নির্দেশ দিয়েছি।
তিনি আরো বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে কৃষি, সেচ ও সার্বিক উন্নয়ন বিষয়ক গত ১৫ জানুয়ারি বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আয়োজনে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ৮টি উপজেলার কৃষি অধিদপ্তর, উপ-পরিচালক কৃষি, বিএডিসি, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, পানি সম্পদ পরিকল্পনা, আঞ্চলিক কৃষি তথ্য অফিসার সহ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের নিয়ে এ বিষয়ে মতবিনিময় সভায় বিএমডি’র সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়।