সর্বশেষ সংবাদ :

‘স্লিঙ্গা’ মালিঙ্গাকে মনে রাখবে ক্রিকেট দুনিয়া

স্পোর্টস ডেস্ক: ওয়ানডে ইতিহাসের একমাত্র বোলার হিসেবে তিন হ্যাটট্রিক তাঁর। এর মধ্যে একটি চার বলে চার উইকেট নেওয়ার কীর্তি। তিনি আজ বিদায় বলছেন ওয়ানডে ক্রিকেটকে। কেবল স্লিঙ্গিং অ্যাকশনের জন্য নয়, নিজের কীর্তি দিয়েই ক্রিকেট ইতিহাসে থাকবেন এই লঙ্কান গতি তারকা। আর একবার। আর একবার দেখা যাবে তাঁকে। ৫০ ওভারের ক্রিকেটে। রাউন্ড আর্ম অ্যাকশনে বল ছুড়ছেন আম্পায়ারের টাইয়ের ঠিক সামনে থেকে। শুরুতে হয়তো কিছু মনে হবে না। শেষ বলটা করে ফেলার পর কি একটু খারাপ লাগবে? যাহ্, ‘স্লিঙ্গা’ তাহলে চলেই যাচ্ছেন! টি-টোয়েন্টিতে তাঁকে আরও কিছুদিন দেখা যাবে। কিন্তু ওখানে মাত্র ২৪ বল, ওভাবে তাঁকে দেখা আর ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো’ একই কথা।
নব্বই দশকের ক্রিকেটপ্রেমী প্রজন্মের কাছে ‘স্লিঙ্গার’ নামটা তেমন পরিচিত ছিল না। ক্রিকেট পোকা হলে ভিন্ন কথা। আশির দশকের জেফ থম্পসনকে টানতে পারেন অনেকে। কিংবা তখনকার ফিদেল এডয়ার্ডসও, হালের রুবেল হোসেন। তবে নব্বই শেষে শতাব্দীর প্রথম দশকে ‘স্লিঙ্গার’ তকমা বলতে গেলে একাই পরিচিত করেছেন লাসিথ মালিঙ্গা। মিচেল জনসন আর শন টেইটরাও ছিলেন। তাঁরাও কিছুটা গুলতি ছোড়ার (স্লিং) ভঙ্গিতে বল করলেও প্রায় পুরোটা মিলে যায় মালিঙ্গার সঙ্গে। যেন মালিঙ্গাই আসল ‘স্লিঙ্গা’ মালিঙ্গাই এ ঘরানার পেসারদের সবচেয়ে বড় ‘বিজ্ঞাপন’।
সেই বিজ্ঞাপনের একটি অঙ্কের আজ শেষ পর্ব। ধারাবাহিক নাটকে শেষ পর্বে এসে মনে মনে পেছন ফিরে গোটা কাহিনির পর্যালোচনা করে থাকেন অনেক দর্শক। মালিঙ্গাকে নিয়েও গত কয়েক দিন ধরে তাই চলছে। এমন করে বল করতেন, কী নিখুঁত ইয়র্কার, তাঁর ওই কীর্তি আর কারও নেই…এমন কত শত কথা! আবেগের আতিশয্যে অনেকটা অজান্তেই ‘করতেন, করেছেন’ বলে ফেলা হচ্ছে। আসলে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট তো বোলারদের নয়। তাই মালিঙ্গার শেষ ওয়ানডেতে আনমনেই মনে হচ্ছে, দেশের রঙিন পোশাকটা তিনি আজই খুলে ফেলছেন!
টিভি পর্দায় প্রেমাদাসায় যাঁরা চোখ রেখেছেন তাঁরাও নিশ্চয়ই দৃশ্যটা দেখতে পেয়েছেন? প্রেমাদাসার সামনে জাতীয় দলের পোশাকের রঙে বিশাল ব্যানার। তার মাঝে লেখাÍ‘আওয়ার স্লিঙ্গা, আওয়ার প্রাইড’Íআমাদের স্লিঙ্গা আমাদের গর্ব। আচ্ছা, মালিঙ্গা কি শুধুই শ্রীলঙ্কার? এ বিশ্বসংসারে যত ক্রিকেটপ্রেমী আছে তাদেরও নয় কি? খেলোয়াড়Íসে যে দেশেরই হোক, পারফরম্যান্স তাঁকে সবার হৃদয়ে ঠাঁই করে দেয়। এই যে সাকিব-মাশরাফিদের নিয়ে মেতে থাকার মাঝে কোহলি, স্টার্ক, উইলিয়ামসনরা চলে আসেন, ক্রিকেটের এই বৈশ্বিক অধিকারবোধ থেকে মালিঙ্গাও তো আমাদের, সবার।
সেই ইতিহাস ওয়ানডেতে একমাত্র বোলার হিসেবে তিন হ্যাটট্রিকের, এ সংস্করণে চার বলে চার উইকেট নেওয়ার অনন্য কীর্তির। ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত মালিঙ্গা ওয়ানডেতে সেরা সময় কাটিয়েছেন ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে। এ সময়ে তাঁর (১০২ ম্যাচে ১৬৩ উইকেট) চেয়ে বেশি উইকেট আর কেউ নিতে পারেনি। অভিষিক্ত হওয়ার প্রথম তিন বছরে (২০০৭) নিয়েছেন ৬৭ উইকেট (৪৫ ম্যাচ)। শুরুটা এমন দুর্দান্ত হলেও ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে একটু ফিকে হয়ে পড়েছিলেন(৩০ ম্যাচে ৪১ উইকেট)। ২০১৫ সালের পর থেকে ছিলেন আসা-যাওয়ার মধ্যে। ২০১৬ সালে তো একটি ওয়ানডেও খেলেননি। ২০১৫ থেকে ২০১৯ এ চার বছরে মালিঙ্গা খেলেছেন মাত্র ৪৮ ম্যাচ!
পরিসংখ্যান তো আরও কতই দেওয়া যায়। কিন্তু দিন শেষে কিংবা ম্যাচ শেষে মানুষ পরিসংখ্যানের কচকচানি কতটুকু রাখে? যতটুকু মনে থাকে তা খেলা, পারফরম্যান্স। আর তাই ওয়াসিম আকরাম, শচীন টেন্ডুলকার কিংবা অ্যাডাম গিলক্রিস্টের মতো কিংবদন্তিরা অবসর নেওয়ার এত বছর পর তাঁদের পরিসংখ্যান মানুষ কতটা মনে রেখেছে? তাঁদের বোলিং, ব্যাটিংÍএসবই মনে থাকে। তাঁদের মতো কাউকে খেলতে দেখলে তখন স্মৃতিচারণ হয়, ছেলেটা অমুকের মতো…তমুকের মতো খেলে।
ঠিক একইভাবে কোনো পেসার ডেথ ওভারে টানা কয়েকটি ইয়র্কার দিলে ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠে ফিরবে মালিঙ্গার স্মৃতি। কেউ টানা তিন ইয়র্কায় হ্যাটট্রিক করলে, বর্ণিল-বাহারী চুল ঝাঁকিয়ে আম্পায়ারের টাইয়ের সামনে থেকে বল করলে, দর্শক থেকে ধারাভাষ্যকার আনমনে অস্ফুটেই হয়তো বলে ফেলবেন..আরে..এ তো আরেক মালিঙ্গা! কিংবদন্তিরা এভাবে বেঁচে থাকে। মালিঙ্গাও এভাবেই বাঁচবেন। শুধু লঙ্কায় নয়, এই বিশ্বসংসারে।


প্রকাশিত: জুলাই ২৭, ২০১৯ | সময়: ৩:৪৯ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ