Daily Sunshine

রবিতীর্থ পতিসরেই হোক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

Share

এম মতিউর রহমান মামুন : নওগাঁ জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিয়েছেন সরকারের প্রধানমন্ত্রী সেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্তে নওগাঁবাসী আনন্দিত এবং গর্বিত। নওগাঁ বাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিলো রবিতীর্থ পতিসরে পূর্ণাঙ্গ ‘রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার। তাঁদের দাবির যথেষ্ঠ যৌক্তিকতাও আছে কেননা বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত পতিসর-শিলাইদহ-শাহজাদপুর এ তিনটি স্থানের মধ্যে পতিসরে ছিল কবির নিজস্ব জমিদারী স্টেট। অথচ পতিসরই আছে উপেক্ষিত।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬তম জন্মদিবসে প্রথমবারের মতো মহামান্য রাষ্ট্রপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ রবিতীর্থ পতিসর ঘুরে গেছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতির আগমনে অঞ্চলের গণমানুষ, রবীন্দ্র গবেষক, সংস্কৃতিমনা মানুষ সবাই নতুন করে স্বপ্ন দেখেছেন হয়তো এবার তাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে পারে।

তাদের চাওয়া পতিসরে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কবি প্রতিষ্ঠিত কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন জাতীয়করণ, পতিসরে হাসপাতাল আধুনিকীকরণ, পতিসরে বিশ্বকবির নামে প্রতিষ্ঠিত কৃষি কলেজ জাতীয়করণ ইত্যাদি। এ নিয়ে দেনদরবার, পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, টেলিভিশনে-গোলটেবিলে আলোচনা কম হয়নি। তবে আশার কথা মহামান্য রাষ্ট্রপতি পতিসর ঘুরে যাওয়ার বেশ কিছু পর নওগাঁবাসীর জন্য পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর এলো, তবে নওগাঁর কোথায় এ বিশ্ববিদ্যালয় করা হবে এমন কোন তথ্য জানা যায়নি। তবে পতিসরে বিশ্ববিদ্যালয় করার মতো প্রয়োজনীয় জায়গা-জমি আছে। ভালো হয়, এলাকার গণমানুষের স্বার্থে তাদের নির্বাচিত সব সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর উচিত একযোগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হয়ে রবিতীর্থ পতিসরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা। হয়তো তাদের কথা আমলে নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পতিসর রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করতে পারেন।

বলে রাখা দরকার ১৮৯১ সালের ১৩ জানুয়ারি কবিগুরু পতিসরে পা রেখেই শিক্ষা বঞ্চিত, হতদরিদ্র মানুষের কথা ভেবেছেন, তাদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যে ১৯০৫ সালে এমই স্কুল স্থাপন করে এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের কাজ শুরু করেছিলেন। শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে বা উপদেশ দিয়েই রবীন্দ্রনাথ ক্ষান্ত হননি বরং শিলাইদহ ও কালীগ্রামে হাতে-কলমে এ কাজে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন (রবি জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল, পৃষ্ঠা ৩১২)।

১৯০৫ সালে যখন ভারতে স্কুল-কলেজের সংখ্যা হাতেগোনা, গ্রামাঞ্চলের মানুষের শিক্ষার কথা ভাবাই হয়নি তখন রবীন্দ্রনাথ ভেবেছিলেন গ্রামীণ জীবন ও জনপদের কথা। পিছিয়ে পড়া গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করতে রবীন্দ্রনাথ বিদ্যালয় স্থাপনের পাশাপাশি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিছু বইপত্র এনে শ্যালক নগেন্দ্রনাথের নামে একটি গ্রন্থাগার স্থাপন করেছিলেন পতিসরে।
তিনি পুত্র ও জামাতাকে কৃষিতে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠিয়ে চিঠিতে লিখেছেন ‘তোমরা দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজার অন্ন গ্রাসের অংশ নিয়ে বিদেশে কৃষি শিখতে গেছ ফিরে এসে এই হতভাগ্যদের অন্নগ্রাস কিছু পরিমাণেও যদি বাড়িয়ে দিতে পার তাহলে মনে সান্ত্বনা পাব। মনে রেখো জমিদারের টাকা চাষির টাকা এবং এই চাষিরাই তোমাদের শিক্ষার ব্যয়ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে এবং না খেয়ে বহন করছে। এদের ঋণ সম্পূর্ণ শোধ করবার দায় তোমাদের উপর রইল। নিজেদের সংসারিক উন্নতির চেয়েও এইটেই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে’ (চিঠি পত্র ১৯ পৃ. ১১১)।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গ্রামাঞ্চলের মানুষকে যে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবে পরিণত হলো স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর শাহাজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। বিষয়টা আমাদের জন্য আনন্দের এবং গর্বের। অপরদিকে কিছুটা হতাশা দেখা দিয়েছে কবির নিজস্ব জমিদারি পতিসরে আনুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা হয়নি বলে।
সংস্কৃতিবান মানুষের অনেক দিনের দাবি ছিল বিশ্বকবির নিজস্ব জমিদারি কালীগ্রাম পরগনার পতিসরে রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার কারণ ‘শিলাইদহ-শাহাজাদপুর-পতিসর- পূর্ববঙ্গের এই তিন এলাকার জমিদারি কর্মসূত্রে রবীন্দ্রনাথের যাতায়াত ও অবস্থানের কথা আমাদের জানা আছে, কিন্তু জানা হয়নি কবির কর্মভূমি কীভাবে তার মানসভূমির গড়নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল। রবীন্দ্রনাথের পরিব্যাপ্ত শিল্প মানস ও জীবনবোধ বুঝার জন্য তার জীবনের এই পর্বের গভীর অনুধ্যান দরকার।

এক্ষেত্রে শিলাইদহ শাজাদপুরের ওপর গবেষক, বিশ্লেষক, রবীন্দ্র গবেষকদের গভীর দৃষ্টিপাত ঘটলেও পতিসর ছিল বরাবরই উপেক্ষিত’ (রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর, আহমদ রফিক)। অথচ এ পতিসরই রবীন্দ্রনাথের পল্লিচিন্তা, শিক্ষা ভাবনা ও স্বদেশ ভাবনার আশ্চর্য সংহতি অর্জন করেছিল কিন্তু রবীন্দ্র গবেষণার করুণ পরিণতির ফলে আমরা পতিসরকে জানতে পারিনি। দেশের সত্যিকারের রূপটি কবে যে পতিসরে এসে খুঁজে পেয়েছিলেন তাও আমাদের জানার বাইরে। পতিসরে ঘটেছিল কবিসত্তা ও কর্মিসত্তার এক ভিন্নতর উদ্ভাসন, জমিদার রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন শিক্ষাবিদ রবীন্দ্রনাথ, সমাজ সংস্কারক রবীন্দ্রনাথ।
১৮৯১ সালের ১৩ জানুয়ারি নিজ জমিদারি পতিসরে এসে কবি চারদিকে ঘুরেফিরে বেড়িয়েছেন, যেমন নাগর নদীতে ভেসে তেমনি নাগর নদীর পাড়ে, মাঠে এবং আশপাশে হেঁটে। সে দেখার অভিজ্ঞতা নিঃশব্দে প্রভাব ফেলেছে কবির অন্তরে, তাই তাকে বলতে শুনি ‘তোমরা যে পার যেখানে পার এক-একটি গ্রামের ভার গ্রহণ করিয়া সেখানে গিয়া আশ্রয় লও। গ্রামগুলিকে ব্যবস্থাবদ্ধ করো।
শিক্ষা দাও, কৃষি শিল্প ও গ্রামের ব্যবহার-সামগ্রী সম্বন্ধে নতুন চেষ্ট প্রবর্তিত করো’ (রবীন্দ্ররচনাবলি ১০ম খ- পৃ. ৫২০-২১)। এ প্রভাব তার মানবিক চেতনাকে উদ্দীপ্ত করেই সম্ভবত তাকে সাধারণ মানুষের, দুস্থ গ্রাম্য চাষির জটিল সমস্যা জীবনের গভীরে নিয়ে গেছে স্বাভাবিকতায়।
এমনি এক আত্মিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ চরম সত্য উপলব্ধি করে বুঝতে পারেন এই এলাকার প্রজা-চাষিদের দুঃখ-দুর্দশার প্রধান কারণ অশিক্ষা। অন্যদিকে নিজ জমিদারি কালীগ্রামের সহজ-সরল অল্প আয়ের স্বল্প শিক্ষিত মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অনুভবের মধ্য দিয়ে কবি লিখেছেন ‘কোথায় প্যারিসের আর্টিস্ট-সম্প্রদায়ের উদ্দাম উন্মত্ততা আর কোথায় আমার কালীগ্রামের সরল চাষি প্রজাদের দুঃখ দৈন্য-নিবেদন! এদের অকৃতিম ভালোবাসা এবং এদের অসহ্য কষ্ট দেখলে আমার চোখে জল আসে। বাস্তবিক এরা যেন আমার একটি দেশ জোড়া বৃহৎ পরিবারের লোক’ (ছিন্নপত্রাবলি ১১১ সংখ্যক চিঠি)। সেই উপলব্ধি থেকে প্রায় ২০০টি গ্রামে অবৈতনিক পাঠশালা এবং ৩টি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ এ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন।

পাশাপাশি স্বাস্থসেবা, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা, কৃষি সমবায় ব্যাংক (১৯০৫) স্থাপন অর্থাৎ সমাজ সংস্করণ। আজ থেকে শত বছর পূর্বে পল্লীগঠন, গ্রামোন্নয়ন ও ক্ষুদ্র ঋণদাণ কর্মসসূচির গোড়াপত্তন করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কাজটা শুরু করেছিলেন নিভৃত পল্লী পতিসরে। ১৯০৫ সালে কৃষি সমবায় ব্যাংক স্থাপন করে গরিব চাষিদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়ে দাসত্ব গোলামির জিঞ্জির থেকে কৃষককে মুক্ত করার যে প্রয়াস পেয়েছিলেন তা তো তৎকালীন ভারতের বিরল ঘটনাই বলা যায়। ‘১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করার পর কৃষকদের মধ্যে ব্যাংক এতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, তাদের ঋণের চাহিদা মিটানো স্বল্প শক্তির এ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অবশ্য সমস্যার কিছুটা সমাধান হয় নোবেল পুরস্কারের টাকা ১৯১৪ সালের প্রথম দিকে কৃষি ব্যাংকে জমা হওয়ার পর’ (রবীন্দ্র জীবনী প্রশান্ত কুমার পাল ২য় পৃ. ৪৬২)।
আধুনিক চাষাবাদ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়, খামার ব্যবস্থাপনা, হস্ত ও কুটির শিল্প, তাঁত শিল্প, রেশম শিল্পের বিকাশ ঘটানো ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য যে ঋণ কর্মসূচি বলা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের কালীগ্রামের গ্রামোন্নয়ন ও মহাজনকে এলাকা ছাড়ানো। তাই ঘটেছিল মহাজনরা এলাকা ছাড়ল কৃষক ও কৃষির উন্নতি হলো।

মোট কথা, তার সাহিত্য সৃষ্টি যেখানে গ্রামের ধুলো কাদা মাটির স্পর্শ নিয়ে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধ ভালোবাসা দেশপ্রেম প্রতিফলিত হয়েছে, যে মাটির মাঝে মায়ের অস্তিত্ব কল্পনা করে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে স্বর্গকে কল্পনা করেছেন, সেখানে পতিসরের দানই প্রধান। আর সৃষ্টি কর্মের প্রসঙ্গ বাদ দিলে পতিসরের গুরুত্ব আরো বেড়ে যায় এ জন্য যে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য সাধনার বাইরে পল্লী পুনর্গঠন কর্মকান্ডে যা কিছু সাফল্য তা এই পতিসরে। বিধায় পতিসরে রবীন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করতে পারলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাড়া বিশ্বের রবীন্দ্র অনুসারীদের নিকট আজীবন সমাদ্রিত হবেন।
লেখক-রবীন্দ্রস্মৃতি সংগ্রাহক ও গবেষক

সানশাইন/০৭ মে/এমওআর

মে ০৭
২০:২৪ ২০২০

আরও খবর

পত্রিকায় যেমন

বিশেষ সংবাদ

সুস্থ্য বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাজেটে উচ্চহারে তামাকের করারোপ জরুরি

সুস্থ্য বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাজেটে উচ্চহারে তামাকের করারোপ জরুরি

শরীফ সুমন : দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ৩১ মে নতুন নতুন প্রতিপাদ্যে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। তামাক ব্যবহারের ভয়াবহতা তুলে ধরে এটি সেবন থেকে বিরত থাকতে প্রতিবছর আহ্বান জানানো হচ্ছে। তবে এই আহ্বানে কয়জন তামাকসেবীই বা সাড়া দেয়? দেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

বিআইডব্লিউটিএ’কে পিপিই ও মাস্ক দিল বসুন্ধরা গ্রুপ

বিআইডব্লিউটিএ’কে পিপিই ও মাস্ক দিল বসুন্ধরা গ্রুপ

সানশাইন ডেস্ক : করোনাকালে দুর্গতদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে দেশের শীর্ষ শিল্প গোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপ। দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত বসুন্ধরা গ্রুপ করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষায় এবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-কে পিপিই এবং মাস্ক হস্তান্তর করেছে। বুধবার (২০ মে) মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেকের

বিস্তারিত