Daily Sunshine

দেশসেরা চাষি ‘কুল ময়েজের’ কান্না

Share

‘আমি তো সেই ময়েজ, যে দেশে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ধনিয়া পাতা উৎপাদন করেছে। ২০ হাজার টাকা মণের ধনিয়া পাতা দুই হাজার টাকা মণ দরে দেশের মানুষকে সরবরাহ করেছি। চ্যালেঞ্জ নিয়ে করেছিলাম ধনিয়া পাতার আবাদ। আমি তো সেই ময়েজ, যে দেশে কুল চাষে বিপ্লব সাধন করেছিলাম। মানুষ আমার নামই দিয়েছে কুল ময়েজ। ২০০ টাকা কেজির কুল ৩০ টাকা কেজি দরে সরবরাহ করতে পেরেছি।

নিজের ছোট খামারকে ৪০০ বিঘার খামারে পরিণত করি। ২০১৩ সালের হরতাল শুরুর পর থেকে আমার খামার ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এরপর বার বার প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও গত বছর থেকে করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েই চলেছি। খামার চারশ বিঘা থেকে ১২০ বিঘায় নেমে এসেছে। ব্যাংক ঋণ ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা আর স্থানীয় দেনা ২০ লাখ টাকা আজ শোধ করতে পারছি না। দেশসেরা চাষি হওয়ার পরও আজ আমার নামে মামলা। আমার খামার ধ্বংসের পথে। অথচ সরকার আমার দিকে একটু সুদৃষ্টি দিলেই আমি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারতাম।’

বুধবার (১৩ এপ্রিল) নিজের ক্ষতিগ্রস্ত কলাবাগানে দাঁড়িয়ে এসব কথা বলছিলেন দেশের খ্যাতিমান চাষি সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ ওরফে কুল ময়েজ। এমন দুর্দিনে সরকারের কেউ তার পাশে নেই বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বড়ইচড়া গ্রামের চাষি সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ। তিনি মূলত আগাম হাইব্রিড জাতের ধনিয়া পাতা চাষ করেই শূন্য থেকে সফল চাষিতে পরিণত হন। আগে যে ধনিয়া পাতা ভারত থেকে আমদানি করতে হত সেই ধনিয়া পাতা আর আমদানি করতে হয়নি। এলসি বন্ধ করা সম্ভব হয় ময়েজের ধনিয়া পাতা চাষের জন্য। হাইব্রিড ধনিয়া, কুল, কলা চাষের পাশাপাশি তিনি অন্যান্য মসলা জাতীয় দ্রব্যাদি ও সবজি চাষ করেন। নব্বই দশক থেকে সবজি চাষ শুরু করা এই চাষি এখন অন্যতম মডেল চাষি।

কুল ময়েজ বলেন, ‘আমি তো আমার সাফল্য একা ভোগ করিনি। আমি হাজারো কৃষককে উঠিয়ে আনার চেষ্টা করেছি। ঈশ্বরদীতে বেশ কিছু খ্যাতিমান চাষিসহ দেশের জেলায় জেলায় কৃষক উন্নয়ন সোসাইটি করে চাষিদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। অথচ আমি আজ মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে বলতে গেলে পালিয়ে ফিরি। আমাকে সহায়তা দিলে আমার খামার বাঁচবে, এর সাথে জড়িত অনেক শ্রমিক ব্যবসায়ী উপকৃত হবে।’

ধনিয়া পাতার আবাদে অভাবনীয় সাফল্যের পর চাষি ময়েজ অন্যান্য সবজি ও ফল চাষেও এগিয়ে আসেন। এর মধ্যে কুল, পেয়ারা, গাঁজর, পেঁপে, কলা, চিচিংগা, বারমাসী পেঁয়াজ উল্লেখযোগ্য। ২০০৪ সালে ৪১ বিঘাতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করে ৩ লাখ টাকা লাভ করেন। ২০০৫ সালে ৭১ বিঘাতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ করে সাড়ে ৫ লাখ টাকা লোকসান দেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য লোকসান হওয়ায় সংকটে পড়েন।

এরপর বাউকুল ও থাইকুল চাষে নামেন। কুল চাষে তার ভাগ্য বদলে যায়। ২০০৬ সালে ৮০ বিঘা জমিতে এক বিরাট কুল বাগান গড়ে তোলেন। ২০০৭ সালে কুল বিক্রি করে এক কোটি ১৫ লাখ টাকা আয় করেন। সে বছর তার গাঁজর চাষে ১০ লাখ টাকা লাভ হয়। ২০০৮ সালে কুল চাষে তার ৯৫ লাখ টাকা আয় হয়েছিল।

২০০৯ সালে একশ বিঘাতে কুলচাষ করেন। ২০১০ সালে ১১৫ বিঘা, ২০১১ সালে ১২০ বিঘা জমিতে কুল আবাদ করেন। ২০১১ সালে তিনি ১২৫ বিঘা জমিতে কুল আবাদ করেন।

jagonews24

পেয়ারা বাগান করেন ৭২ বিঘা জমিতে। ১৫ বিঘাতে মাল্টা বাগান তৈরি করেন। বাড়িতে একটি ডেইরি ফার্ম করেন। তবে ২০১২ সালে বন্ধ করেন ডেইরি। সেসময় দুধের বাজার না থাকায় তিনি ক্ষতির শিকার হয়েছিলেন বলে জানালেন।

তিনি জানান, বিভিন্ন সময় আর্থিক ক্ষতির শিকার হলেও কৃষি খামারকে ত্যাগ করেননি। দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিরা ছাড়াও মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ, আমেরিকান সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা পর্যন্ত তার খামার পরিদর্শন করেন। তিনি ২০১০ সালে কৃষিতে সর্বোচ্চ পুরস্কার বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক লাভ করেন।

সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ ওরফে কুল ময়েজ জানান, ২০১৩ সালে তার খামারে ধস নামতে শুরু করে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য। সেবছর ১০ মাসে ৪০ দিন হরতাল পালিত হয়। এক সময় একটানা অবরোধ চলে। সেসময় পানির দরে সবজি বিক্রি করতে হয়। এরপর নানা সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। কিন্তু তার দুঃসময়ে পৃষ্ঠপোষকতা পাননি।

সম্প্রতি ঝড়ে ভেঙে যাওয়া তার কলা বাগানে দাঁড়িয়ে বুধবার (১৩ এপ্রিল) তিনি আক্ষেপ করে বলেন, তার দুর্দিনে ব্যাংকসহ অনেক প্রতিষ্ঠান মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দেশের কৃষি ক্ষেত্রে তার অতীত অবদান বিবেচনায় তাকে রক্ষার জন্য একটু সহযোগিতা দরকার।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, কৃষি মন্ত্রণালয় একটু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে তিনি তার খামারটিকে বাঁচাতে পারতেন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত তিনি যেতে পারেন না। তার কাছে যেতে পারলে তার সামান্য তিন কোটি টাকা ঋণ নবায়ন হয়ত সহজেই হয়ে যেত।

তিনি বলেন, আমি ঋণ মওকুফ চাই না, আমাকে সুদ মওকুফের ব্যবস্থা করে ঋণ পূনঃতফশিলীকরণ করলেই ঘুরে দাঁড়াতে পারব। আমার খামারের সাথে জড়িত অনেক শ্রমিকও বেঁচে যাবে।

ঈশ্বরদী উপজেলার খ্যাতিমান চাষি এবং মুলাডুলি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল খালেক মালিথা বলেন, এ দেশের কৃষিতে কুল ময়েজের বিরাট অবদান রয়েছে। একটি ফলের নাম তার নামের সাথে যুক্তই হয়ে গেছে। ময়েজের মতো একজন দেশসেরা চাষিকে রক্ষায়, তার খামার রক্ষায় কৃষিবান্ধব বর্তমান সরকার এগিয়ে আসবে বলে তিনি আশা করেন।

পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আব্দুল কাদের জানান, সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ ওরফে কুল ময়েজ দেশের শীর্ষস্থানীয় কৃষক। তিনি এর আগে ঈশ্বরদী উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তা ছিলেন বলে জানান। এ জন্য কৃষিতে কুল ময়েজের অসামান্য অবদান নিজেই দেখেছেন। তবে ব্যাংক ঋণের বিষয়টি তার অফিসের আওতাধীন নয়। এজন্য তার জন্য সহানুভূতি থাকলেও তার পক্ষে এ বিষয়ে কিছইু করার নেই।

এপ্রিল ১৪
১৪:১৫ ২০২১

আরও খবর