Daily Sunshine

হাতকড়ায় বাধা গণমাধ্যমের হাত

Share

কাজী শাহেদ : মাঝে মাঝেই নানা ইস্যুতে গরম থাকে ফেসবুক। ৩ মে ছিল মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। যদিও গণমাধ্যম মুক্ত কি না সেটা সবাই জানে। তারপরেও ঘটা করে দিবস পালন। এরপর সকাল থেকে গরম ফেসবুক। যে যেভাবে পেরেছেন, সাংবাদিক কাজলের ছবি দিয়ে ফেসবুকে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করেছেন। তবে এই দিবসে একটা বার্তা কিন্তু পরিস্কার হয়েছে, সেটি হলো, হাতকড়ায় বাধা গণমাধ্যমের হাত।

শুধু বাংলাদেশে নয়, গণমাধ্যমের উপর আগ্রাসী হয়েছে অনেক রাষ্ট্রপ্রধান। যখন জনপ্রিয়তা কমতে থাকে, নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে জনরোষে পড়ার শঙ্কা থাকে, তখন প্রথম কণ্ঠরোধ করা হয় গণমাধ্যমের। কারণ জনগণের সঙ্গে গণমাধ্যমেরই সবচেয়ে নিকটতম সম্পর্ক। যদিও কিছু মানুষের আচরণে সেই সম্পর্ক নষ্ট হতে চলেছে।

রাজনৈতিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সন্ত্রসী কর্মকাণ্ড বিষয়ে সোচ্চার মেক্সিকোর সাংবাদিক মিরোস্লাভা ব্রিচ ভেলডুসিয়া গত মার্চ মাসে খুন হয়। জানা যায়, এ ধরণের সামাজিক অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই হুমকি দেয়া হচ্ছিল তাকে। অষ্টমবারের মতো গ্রেফতার হয়েছেন ফিলিপাইনের সাংবাদিক মারিয়া রেসা। গত ১ মে শুক্রবার ফিলিপাইনের ম্যানিলা বিমানবন্দর থেকে আটক করা হয় তাকে। পরে জামিনে মুক্ত হন তিনি। তার আগে, মানহানির অভিযোগ এনে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি আটক করা হয়েছিল তাকে। গত সপ্তাহে মারিয়া রেসার বিরুদ্ধে বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে মামলা দায়ের করে সরকার।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়ানোর অভিযোগে ভিয়েতনামের নারী সাংবাদিক ট্রান থি গা’র বিচার করা হয়। বিচারের রায় একদিনেই দেয়া হয়েছে এবং এতে তাকে নয় বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। সরকারের দুর্নীতি ও পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ভিডিও প্রতিবেদন করেছিলেন থি গা। নয় বছর ধরে কারাগারে বন্দি আছেন যাবজ্জীবন দণ্ড পাওয়া কিরগিজস্তানের সাংবাদিক আজিমজন আসকারভ। মানবাধিকারের বিষয়ে তার করা কিছু প্রতিবেদন রুষ্ট করে দেশটির সরকারকে। ভারতীয় নারী সাংবাদিক রানা আইয়ুব দেশটির বিভিন্ন সামাজিক কুসংস্কার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করেন। নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তিনি। তার ছবি ফটোশপ করে পর্নোগ্রাফি বানিয়ে তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সঙ্গে দেয়া হচ্ছে তার মোবাইল নম্বরও। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে নিকারাগুয়ার পুলিশ দেশটির ‘১০০% নেটিসিয়াস’ নামে টেলিভিশন চ্যানেলে হানা দিয়ে মিগুয়েল মুরা ও লুসিয়া পিনেডা উবেনা নামের দুই সাংবাদিককে আটক করে। তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়। মামলা চলছে তাদের বিরুদ্ধে, তবে যথাযথ আইনি সহযোগিতা পাননি এ দুই সাংবাদিক। আটকে থাকা সহকর্মীদের মুক্তির জন্য লড়াই করে যাওয়া দক্ষিণ সুদানের জুবা মনিটর সংবাদমাধ্যমের সম্পাদক আন্না নিমিরানো প্রতিনিয়তই গ্রেফতার হওয়ার আতঙ্কে থাকেন। সহকর্মীদের মুক্তির দাবিতে এ লড়াইয়ের জন্য তাকে গ্রেফতারের হুমকি দেয়ার পাশাপাশি পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়ারও হুমকি দিচ্ছে সরকার। মোজাম্বিকের উত্তরাঞ্চলে সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত এক পরিবারের ছবি তোলার অপরাধে আটক করা হয় দেশটির সাংবাদিক আমাডে আবুবাকারকে। গত জানুয়ারি মাসে আটক হওয়া এ সাংবাদিককে এখনও বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি।

অপহরণ, নজরদারি ও মানসিক নির্যাতনসহ সব অত্যাচারই সহ্য করতে হয়েছে কলম্বিয়ার প্রবীণ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ক্লাউডিয়া ডুকুকে। ক্লাউডিয়াকে নির্যাতনের অপরাধে সরকারের তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তকাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল আদালত। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সুদান সরকার দেশটির আল-তায়ার পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ওসমান মারঘানিকে আটক করে। আটক অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় বলে জানা যায়। কেন তাকে আটক করা হয়েছে, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছু বলেননি কর্তৃপক্ষ। আটক হওয়ার আগে, দেশটির সরকারবিরোধী আন্দোলন বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন তিনি।

ওই দেশগুলোর সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র এজন্য তুলে ধরা, হয় দেশগুলোতে সামরিক বাহিনীর শাসন চলছে অথবা উন্নত বিশে^র সাহায্য নিয়ে চলে অথবা যে সরকার ক্ষমতায় আছে, তাকে জনগণ পছন্দ করছে না।

আমাদের দেশেও বার বার সাংবাদিকদের আঘাত করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এজন্য বলছি, একজন সাংবাদিক হত্যার বিচার কি পেয়েছি? রাষ্ট্র কেনো খোঁজ নেয় না, তার নাগরিক হত্যার তদন্ত, বিচারের অগ্রগতির কি হলো। দলকানা আর নতজানু নেতৃত্ব এজন্য দায়ী-বলতে পারি। নেতৃত্বের জায়গা থেকে দায় নিয়েই বলছি, অন্য পেশাজীবী সংগঠনগুলো যেভাবে নিজেদের মেরুদণ্ড শক্ত করেছে, সাংবাদিকদের সংগঠনগুলো ঠিক তার বিপরীতে গিয়ে ক্ষয়ে মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়েছে। কথায় কথায় দলের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নিজেদের তো নামিয়েছি, পক্ষান্তরে আমরা দলটিরও ক্ষতি করছি। দলের বিপক্ষে না গিয়েও নিজেদের স্বার্থের কথাটা বলা হয়তো আর আমাদের শেখা হবে না। তবে মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে রাষ্ট্র কিন্তু একটা বার্তা দিয়ে দিলো।

সাংবাদিক কাজল অফিস থেকে নেমে বাসায় যাওয়ার পথে গুম হন। প্রায় দেড় মাস পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হলো যশোর থেকে। নিজ দেশে তিনি অনুপ্রবেশ করেছেন। রাষ্ট্র কি তার নাগরিকত্ব বাতিল করেছিল এই দেড় মাসে? এমন কথা কি কেউ জানেন? তাহলে তাকে অনুপ্রবেশের মামলায় গ্রেফতার দেখানো যে উর্বর মস্তিষ্কের কাজ, সেটি কি তথ্যমন্ত্রী জানেন। এনিয়ে রাষ্ট্রের একটা বিবৃতি থাকা দরকার ছিল। রাষ্ট্র কিন্তু এখনো কোনো বিবৃতি দেয়নি। তার মানে বার্তাটা পরিষ্কার।

অনেকেই সাংবাদিক কাজলের গ্রেফতার, হাতে হাতকড়া নিয়ে ফেসবুক গরম করেছেন। কিন্তু ফেসবুক গরম করে কোনো লাভ নেই। সরকারের বিরুদ্ধে গেলে আপনার বিরুদ্ধে আইসিটি আইনে মামলা হবে। একসময়ের দলকানা অনেকেইে এখন নিজেদের অনেককিছুর ঊর্ধ্বে নিয়ে গেছেন। তারা সরকারের সমালোচনা করে দু-চার কথা লিখে নিজেদের অনেককিছু ভাবেন। কিন্তু পেশা হিসেবে সাংবাদিকতার মর্যাদা ফিরিয়ে আনার সময় মনে হয় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
লেখক : সভাপতি, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন

সানশাইন/০৪ মে/এমওআর

মে ০৪
২০:৩৪ ২০২০

আরও খবর

পত্রিকায় যেমন

বিশেষ সংবাদ

নতুন রূপ পাচ্ছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সোনাদীঘি

নতুন রূপ পাচ্ছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সোনাদীঘি

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের উদ্যোগে মহানগরীর ঐতিহ্যবাহী সোনাদীঘি নতুন রূপ পেতে যাচ্ছে। একই সাথে সোনাদীঘি ফিরে পাচ্ছে তার হারানোর ঐতিহ্য। সোনাদীঘিকে এখন অন্তত তিন দিক থেকে দেখা যাবে। দিঘিকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হবে পায়ে হাঁটার পথসহ মসজিদ, এমফি থিয়েটার (উন্মুক্ত মঞ্চ) ও তথ্যপ্রযুক্তি

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

সরকারি চাকরি প্রার্থীর বয়সে ছাড়

সরকারি চাকরি প্রার্থীর বয়সে ছাড়

সানশাইন ডেস্ক : করোনা মহামারিতে সাধারণ ছুটিতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে স্থগিত ছিল সরকারি-বেসরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া। এ কয়েক মাসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পায়নি দেশের শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী। অংশ নিতে পারেনি কোনো নিয়োগ পরীক্ষাতেও। অনেকেরই বয়স পেরিয়ে গেছে ৩০ বছর। স্বাভাবিকভাবেই সরকারি চাকরির আবেদনে সুযোগ শেষ হয়ে যায় তাদের। তবে এ দুর্যোগকালীন

বিস্তারিত