রাবির বর্ষসেরা গবেষক শফি মাহমুদ

লাবু হক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষকের আত্মা পরিতৃপ্ত হয় শিক্ষার্থীর সফলতায়। প্রকৃত শিক্ষকদের চাওয়া থাকে তার শিক্ষার্থীরা তাকে ছাড়িয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় দেশের সুনাম অর্জনে আরও বড় ভূমিকা রাখুক। আর শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের নির্দেশনায় ব্রত হয়ে এগিয়ে চলে অবিরাম। তেমনিভাবে ২০২০-২১ সেশনে সমগ্র শিক্ষকদের ছাড়িয়ে স্কোপাসের জড়িপে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ষসেরা গবেষক হয়েছেন এক শিক্ষার্থী।
রাবির বর্ষসেরা এই গবেষকের নাম শফি মাহমুদ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়াং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের ২০১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থী। স্কোপাসের জরিপ অনুযায়ী ২০২১ সালে প্রকাশিত তার গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ৩৭। শুধু তাই নয় জরিপে পুরো বাংলাদেশের মধ্যে সেরা ২০ গবেষকের মধ্যেও রয়েছেন তিনি! সম্প্রতি পিএইচডি ড্রিগ্রি অর্জনের জন্য ‘অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে’ স্কলারশিপও পেয়েছেন এই শিক্ষার্থী।
কথা এই উদীয়মান এই গবেষকের সঙ্গে। তিনি জানান, বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরেই মোটামুটি গবেষণার প্রতি আগ্রহ ছিলো তার। তিনি গবেষণা নিয়ে কাজ শুরু করেন ২০১৬ সালে। দ্বিতীয় বর্ষে থাকাকালীন সময়ে তিনি কাজ শিখতেন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক গ্রুপে বন্ধুরা মিলে কম্পিটিশনাল কাজগুলো করতেন। তৃতীয়বর্ষে ল্যাবে জয়েন করে সেরকমভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকায় নিজে নিজে গবেষণার বিষয়ে টুকটাক লিখে বিভিন্ন জায়গায় সাবমিট করতেন। পরে চতুর্থবর্ষ থেকে শিক্ষক এবং বিভাগের বড়দের সাহায্যে ল্যাবে কাজ করা শুরু করেন তিনি।
রাবির বর্ষসেরা এই গবেষক বলেন, গবেষণায় রাতারাতি সফল হয়ে গেছি এমনটা না। আমার প্রথম গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালের মার্চে, কিন্তু এটি জমা দেই ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। এই একটি পেপার প্রায় তিনবছরের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর প্রকাশিত হয়। তবে এতো দীর্ঘ সময় লাগার পরেও হার মেনে নেইনি। প্রথমদিকে ধৈর্য নিয়ে কাজ করার সুবাদে সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই এক বছরে ৩৭টা পেপার প্রকাশ করতে পেরেছি। অনেকে হয়ত ভাববেন এতগুলো প্রবন্ধ এক বছরেই কিভাবে প্রকাশ করা সম্ভব! মূলত দলগতভাবে এবং কোলাবরেশন করে কাজ করার ফলেই এতগুলো গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।
২০১৯ সালে স্নাতক শেষ করা এই গবেষক বলেন, বর্তমানে চাইলেই গবেষণা প্রবন্ধ দ্রুত প্রকাশ করা যায়। তবে ভালো মানের প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা লাগে। আমি হয়ত সেই তিন বছরে আরও প্রবন্ধ প্রকাশ করতে পারতাম। তবে আমি চাচ্ছিলাম আমার কাজ ছোট হোক কিন্তু একটা ভালো জায়গায় যাক।
করোনাভাইরাস নিয়ে ২০২১ সালে তার ১৭ টি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বলা জানায় এই গবেষক। তিনি বলেন, করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে বাসায় ২০২০ সালের আগষ্ট থেকে গবেষণা শুরু করি। আমি মূলত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবু সালেহ স্যারের অধীনে কাজ করি। করোনাভাইরাস নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ কাজ ছিলো প্ল্যান্ট কম্পাউন্ড নিয়ে। সাধারনত এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোতে যে প্ল্যান্টগুলো পাওয়া যায় সেগুলোতে কি কি কম্পাউন্ড আছে তার তালিকা করতাম। তারপর যে প্রোটিণের জন্য করোনাভাইরাস আমাদের শরীরে সংক্রমণ করছে তার বিরুদ্ধে নির্বাচিত সবচেয়ে উপযোগী কম্পাউন্ডগুলো রান করতাম। এর মধ্যে যে কয়েকটি কম্পাউন্ড সবচেয়ে বেশি ভালো ফলাফল দিত সেগুলো নিয়েই চলত আমাদের গবেষণা।
তিনি জানায়, বর্তমানে ক্যান্সার রোগ নির্ণয়ের কেমিক্যালগুলো নিয়ে কাজ করছেন তিনি। মূলত তিনি কম্পিটিশনাল কাজ করেন, বিভিন্ন ড্রাগের ডিজাইন করেন। ড্রাগের কোন মূল কম্পাউন্ড পরিবর্তন করলে সেটি প্রোটিণ বা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে সেটি নিয়েই মূলত তারা গবেষণা চালাচ্ছেন। পরবর্তীতে ওষুধ আবিষ্কারের দিকে ধাবিত হবেনও বলে জানান এই তরুণ গবেষক।
শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে উন্নতমানের ল্যাব তৈরির পাশাপাশি গবেষণায় আরও বরাদ্দ বাড়াতে হবে জানিয়ে এই গবেষক বলেন, কিছু কিছু কেমিক্যালের দাম অনেক বেশি। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমেও কিছু কাজ করে নেওয়া যায়। কম্পিটিশনাল গবেষণা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলকভাবে কম হয়। এজন্য ল্যাবগুলোতে যদি কিছু উন্নতমানের কম্পিউটার দেওয়া হয় তাহলে কম্পিটিশনাল কাজগুলো করতে সহজ হবে। এতে গবেষণার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়বে। বাংলাদেশে গবেষণা খাতে দেওয়া বরাদ্দ অপ্রতুল। শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করতে উন্নতমানের ল্যাব তৈরির পাশাপাশি গবেষণায় আরও বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, গবেষণায় বরাদ্দ অপ্রতুল এটা সত্য। তবে বাংলাদেশ সরকার গবেষণায় বরাদ্দ দিতে সর্বদা প্রস্তুত, কিন্তুনা জানার কারণেই হোক বা উদ্যোগের অভাবেই হোক আমরা সে জায়গায় পৌঁছাতে পারিনা। তবে বর্তমানে আমরা গবেষণায় অভ্যন্তরীণভাবে বরাদ্দ বাড়িয়ে দিয়েছি এবং বরাদ্দ বাড়াতে ইতোমধ্যে আমরা প্রতিটি বিভাগ থেকে তিনটি করে গবেষণার প্রস্তাবনা চেয়েছি। আশা করি শীঘ্রই আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করে তুলতে পারব।


প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২২ | সময়: ৬:৩৯ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ