Daily Sunshine

যুতসই পদক্ষেপে কমছে রাকাবের লোকসান

Share

স্টাফ রিপোর্টার: এক সময় বৃষ্টিনির্ভর কৃষির সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল কৃষকের ভাগ্য। তাও একফসলি কৃষি ছিল একমাত্র ভরসা। খরা-বন্যার এই বরেন্দ্রখ্যাত উত্তরাঞ্চলজুড়ে প্রায় বছরই দেখা দিত খাদ্য ঘাটতি। এতে খেয়ে না খেয়ে চলতে হতো কৃষক পরিবারকে। কালের গতিতে এ কৃষিতেই সমৃদ্ধ হয়েছে উত্তরের ১৬ জেলার অর্থনীতি। আর এ সমৃদ্ধির সর্ববৃহৎ অংশীদার রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)।
কৃষকের ব্যাংকিং সেবা এখন শতভাগ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর। গ্রাম থেকে শহর সবখানেই সমান গতিশীল রাকাব। লেনদেন হচ্ছে নিমিষেই। ব্যাংকিং লেনদেনের যাবতীয় তথ্য সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় সেলফোনে এসএমএসের মাধ্যমে পাচ্ছেন গ্রাহক। ফলে আস্থা বেড়েছে গ্রাহকের।
১৯৮৭ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে যাত্রা করে রাকাব। কৃষির উন্নয়নে ঋণসহায়তা নিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকটি। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলায় ৩৮৩টি শাখায় ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে রাকাব। এর মধ্যে ৩৩৩টি শাখা একেবারেই কৃষকের বাড়ির কাছে, প্রত্যন্ত এলাকায়। শহর এলাকায় রয়েছে ব্যাংকের বাকি ৫০টি শাখা। কিন্তু নানা কারণে পিছিয়ে পড়েছিল কৃষকের এ ব্যাংক। তবে গত দুই বছরে বদলে গেছে পুরো দৃশ্যপট।
রাকাব সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাকাবে তাৎক্ষণিক অনলাইন ব্যাংকিং সেবা (সিবিএস) কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। মূলত এর পরই রাকাবের দিন বদলের শুরু। ওই বছরের ২৪ অক্টোবর চালু হয় বিএসিএইচ ও বিইএফটিএন সেবা। সর্বশেষ গত ১১ এপ্রিল চালু হয় তাৎক্ষণিকভাবে আন্তঃব্যাংক লেনদেন (আরটিজিএস) সেবাও।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অফলাইন কম্পিউটারাইজড ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে ২০১১ সালে ডিজিটাল ব্যাংকিং জগতে পা রাখে রাকাব। এরপর ধাপে ধাপে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের যাবতীয় ডিজিটাল সেবা চালু হয়েছে। এরই মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে রাকাবের নিজস্ব আধুনিক ও সুরক্ষিত ডাটা সেন্টার। ফলে প্রত্যন্ত এলাকায় অনলাইন ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে রাকাব।
যদিও এক্ষেত্রে বড় বাধা ছিল ইন্টারনেটের ধীরগতি। কিন্তু সে বাধাও উতরে গেছে রাকাব। অপটিক্যাল ফাইবারের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের পাশাপাশি রেডিও লিংক বসিয়ে ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে প্রান্তিক এলাকার ১৭টি শাখায়। এছাড়া ব্যাংকের একমাত্র বিদ্যুৎ বিহীন কুড়িগ্রামের কাশিমপুর বাজার শাখায় বসানো হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ। বর্তমানে ব্যাংকের সব শাখায় নিরবচ্ছিন্নভাবে অনলাইন ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন গ্রাহক।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ শাখায়ও রেডিও লিংক বসিয়ে ব্যাংকিং সেবা কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শাখাটিতে সকাল থেকেই গ্রাহকের লম্বা লাইন। কেউ টাকা জমা দিচ্ছেন আবার কেউ তুলছেন নগদ অর্থ। সব মিলিয়ে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ চলছে সেখানে। ব্যাংকে এসেছিলেন শিবগঞ্জের হাউসনগর এলাকার বাসিন্দা গ্রাহক বার্জেস আলী।
তিনি জানান, শুরুতে এ শাখায় তার মেয়াদি আমানত ছিল। টাকা জমা দেয়ার পর নিশ্চিত হতে পাস বই নিয়ে ঘুরতে হতো ব্যাংকে। কিন্তু এখন সেটি নেই। টাকা জমা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় এসএমএস আসে। তাছাড়া লেনদেনের সব তথ্যই মিলছে এসএমএসে।
রাকাবের সার্বিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০ বছরের মধ্যে কেবল সাত বছরই লাভের মুখ দেখেছে রাকাব। তবে লোকসান হলেও দিন দিন তা কমে আসছে। ২০০১-০২ অর্থবছরে রাকাবের লাভ ছিল ১৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। লাভের অংশ কমতে কমতে তিন বছর পরই লোকসানে যায় রাকাব। ২০০৪-০৫ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত লোকসানের বৃত্ত থেকে বেরুতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। তবে লাভের উদ্যোগ থেমে থাকেনি। এরপর আবার চার বছর ফের মুনাফা ঘরে তোলে। চলতে থাকে লাভ-লোকসানের ভেলা। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আবার লোকসানে যায়। সে বছর ৪৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা লোকসান হলেও ২০২০-২১ অর্থবছর শেষে লোকসান নেমে আসে ৩ কোটি ১০ লাখে।
এ তথ্য নিশ্চিত করে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেন বলেন, অনলাইন ব্যাংকিং সেবা চালুর পর থেকে গ্রাহকের চাহিদা মোতাবেক আধুনিক সব ব্যাংকিং সেবা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে ব্যাংকমুখী হয়েছে গ্রাহক, কমেছে শ্রেণীকৃত ঋণ। এতে কমছে লোকসান। তিনি আশাবাদী, শিগগিরই উত্তরাঞ্চলে লাভজনক ও মডেল ব্যাংক হয়ে উঠবে রাকাব।
রাকাবের সহকারি মহাব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান জানান, রাকাব’র সবক’টি শাখায় নির্ধারিত সময়ের আগেই অনলাইন ব্যাংকিং সেবা চালু হয়েছে। সেবার মান বাড়ার সাথে সাথে লোকসানের পরিমানও কমতে থাকে। অচিরেই এই প্রতিষ্ঠান লোকসান কাটিয়ে লাভের মুখ দেখবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এবিষয়ে জানতে চাইলে রাকাব পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান রইছউল আলম মণ্ডল বলেন, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি খাতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ রাকাবের। বৈশ্বিক মহামারী করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের পাশেও দাঁড়িয়েছে রাকাব। সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের লক্ষমাত্রা অনুযায়ী শতভাগ ঋণ বিতরণ হয়েছে। কৃষি উৎপাদন যাতে ব্যহত না হয় এবং কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্থ না হয় এজন্য বিভিন্ন ঋণের কিস্তি পরিশোধ প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। এসব সম্ভব হয়েছে কৃষিবান্ধব বর্তমান সরকারের পৃষ্টপোষকতায়।
রাকাবের অনলাইন ব্যাংকিং সেবা সম্পর্কে চেয়ারম্যান বলেন, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিক সকল ব্যাংকিং পরিষেবা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করছে রাকাব। পরিচালনা পর্বেষদের বেধে দেয়া সময়সীমার আগেই সকল শাখায় সিবিএস বাস্তবায়ন হয়েছে। এর সুফল পেতে শুরু করেছে ব্যাংক। আইসিটি বিভাগের দক্ষ ও নিবেদিত কর্মীদের হাত ধরেই এই সফলতা আসছে। কৃষকের আর্থিক ভিত শক্তিশালী করতে রাকাব আরও বেশি ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদি চেয়ারম্যান।

অক্টোবর ০৫
০৫:৪৯ ২০২১

আরও খবর

[TheChamp-FB-Comments]