Daily Sunshine

রাবিতে ভর্তিযুদ্ধ শুরু : প্রাণ ফিরেছে মতিহারে শহরেও কোলাহল

Share

স্টাফ রিপোর্টার : করোনার কারণে দীর্ঘদিন নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে মতিহারের সবুজ চত্ত্বর খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। দীর্ঘ মেয়াদী ছুটি ঘোষণা করা হয়। বন্ধ হয়ে যায় আবাসিক হল। এরপর সারা দেশের মত প্রায় এক বছর নিস্তব্ধ থাকে এ ক্যাম্পাস। তবে করোনা মহামারী কাটিয়ে দীর্ঘ নিস্তদ্ধতার পর এ ক্যাম্পাসে আবারো প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। এখন উপলক্ষ ভর্তিযুদ্ধ।
তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক প্রথমবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস। শুধু শিক্ষার্থী নন, তাদের সঙ্গে এসেছেন অভিভাবকরাও। সবমিলিয়ে রাজশাহী নগরীতে এখন অতিরিক্ত তিন লাখের বেশী মানুষের সমাগম। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন পর হলেও প্রাণ ফিরে পেয়েয়ে রাজশাহী নগরও।
সোমবার সকাল থেকেই শুরু হয়েছে ভর্তি পরীক্ষা। তবে দুদিন আগে থেকেই রাজশাহী মুখি হন শিক্ষার্থী আর অভিভাবকরা। সোমবার সকাল ৭টার আগেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে শুরু করেন। ক্যাম্পাসে ঢুকে শিক্ষার্থীরা নিচ্ছিলেন শেষ সময়ের প্রস্তুতি। সকাল ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনগুলো খুলে দেওয়া হয়। এরপর ভবনগুলোর সামনে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। আবার অনেকে নিজের পরীক্ষার কেন্দ্র খুঁজতে শুরু করেন। হাজারো ভর্তিচ্ছু ও তাদের অভিভাবকদের ভীড়ে যেন একাকার হয়ে উঠেছে মতিহারের সবুজ চত্ত্বর। চারিদিকে মানুষের আগাগোনা। তাদের বিচরণে বেড়েছে রাজশাহীর অর্থনীতির গতিও। হোটেল, রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে আবাসিক হোটেল, হোস্টেল, মেস সবখানে ছাত্র আর অভিভাবকে ঠাসা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক আজিজুর রহমান জানান, সকাল সাড়ে ৯টায় পরীক্ষা শুরুর পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী মো. জাকারিয়া ও অধ্যাপক ড. সুলতান উল ইসলামসহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। পরীক্ষার পরিবেশ দেখে তারা সন্তোস প্রকাশ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, ‘জালিয়াতি ঠেকাতে গত কয়েক বছর ধরে আমাদের যেই প্রস্তুতি ছিল এ বছরও সেই প্রস্তুতি রয়েছে। আমরা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। সবকিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।
ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে দকিন ধরেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্যাম্পাসে আসতে শুরু করেন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তাদের জন্য তিনস্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে রাজশাহী মহানগর পুলিশ। এরইমধ্যে খোলা হয়েছে কন্ট্রোলরুম। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশের এলাকায় সিসিটিভির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। নিরাপত্তাজনিত যেকোনো প্রয়োজনে দ্রুত সাড়াও দিচ্ছে পুলিশ।
রাজশাহী মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আবু কালাম বলেন, প্রত্যেক অফিসার ফোর্স ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রেখে আগত ভর্তিচ্ছু পরীক্ষার্থীদের ব্যাগ তল্লাশি করবেন। সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রেখে অত্যন্ত ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করার জন্য তিনি পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেন।
পুলিশ কমিশনার ভর্তিচ্ছু পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, কোনো ধরনের প্রলোভনে কান দেবেন না। আরএমপির বিশেষ টিমসহ গোয়েন্দা সদস্যরা গোপনে সব জায়গায় বিচরণ করছে। আরএমপির সাইবার ক্রাইম ইউনিটসহ বিশেষ টিম গুজব রটানাকারী ও ভুয়া প্রশ্নপত্রের সন্ধানে কাজ করছে। ভুয়া প্রশ্নপত্র দিয়ে প্রতারক চক্র আপনাকে বিপদে ফেলতে পারে, এমন সংবাদ বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা জানলে তা গোপনে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করেন তিনি। এদিকে এবারের ভর্তি পরীক্ষায় রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের পক্ষ থেকে পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি ও মাস্ক বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য পুলিশ কন্ট্রোলরুম ও রাবি কর্তৃপক্ষ ভবন নির্দেশনা ব্যানার, সিট প্লান ইত্যাদি চোখে পড়ার মত জায়গায় প্রদর্শিত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে সহায়তা নিতে পারছে। ট্রাফিক ব্যবস্থায়ও বাড়তি জনবল নিয়োগ করেছ আরএমপি। ট্রাফিক পুলিশের নির্দেশনায় রাবির ভেতরে জনস্বার্থে যানবহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে।
পরীক্ষা চলাকালে ৩-৭ অক্টোব বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এবং আশপাশ এলাকার সব কম্পিউটার ও ফটোকপি দোকানসমূহ বন্ধ রাখা হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের মসজিদ কেন্দ্রীক অবস্থানকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এবার কোভিড-১৯ বিস্তাররোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। তবে ছাত্রীরা আবাসিক হলের উন্মুক্ত স্থানসমূহ ব্যবহার করতে পারবে।
সোমবার পরীক্ষা শুরুর প্রথমদিনেই রাজশাহী নগরীতে সীমাহীন যাননজটের সৃস্টি হয়। সব মিলিয়ে স্তব্ধ ক্যাম্পাসে যেন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। ছাত্র আর অভিবাবকদের কোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো রাজশাহী শহরও।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দফতর সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ‘সি’ ইউনিটের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এবারের ভর্তি পরীক্ষা। তিনটি শিফটে এই ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথম শিফটের পরীক্ষা সকাল সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হয়ে সাড়ে ১০টা। দ্বিতীয় শিফটের পরীক্ষা দুপুর ১২টায় শুরু হয়ে ১টা এবং তৃতীয় শিফটের পরীক্ষা বিকেল ৩টায় শুরু হয়ে শেষ হচ্ছে ৪টায়।
দ্বিতীয় দিন ৫ অক্টোবর ‘এ’ ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম শিফটের পরীক্ষা সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হয়ে সাড়ে ১০টায় শেষ হবে। দ্বিতীয় শিফটের পরীক্ষা দুপুর ১২টায় শুরু হয়ে শেষ হবে ১টায়। তৃতীয় শিফটের পরীক্ষা বিকেল ৩টায় শুরু হয়ে শেষ হবে ৪টায়। প্রতি শিফটে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা ‘এ’ ইউনিটে পরীক্ষা দিতে পারবেন।
এছাড়া ৬ অক্টোবর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটের (বাণিজ্য) ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম শিফটের পরীক্ষা সকাল সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হয়ে শেষ হবে সাড়ে ১০টায়। দ্বিতীয় শিফটের পরীক্ষা দুপুর ১২টায় শুরু হয়ে শেষ হবে ১টায়। তৃতীয় শিফটের পরীক্ষা বিকেল ৩টায় শুরু হয়ে শেষ হবে ৪টায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজলা গেটে ময়মনসিংহ থেকে পরীক্ষা দিতে এসেছেন আরিফ রহমান নামের এক ভর্তিচ্ছু। তিনি বলেন, পরীক্ষার একদিন আগেই রাজশাহী চলে এসেছি। আমি ‘সি’ ইউনিটের দ্বিতীয় শিফটে পরীক্ষা দেবো। আমার সিট পড়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমি ভবনে। ক্যাম্পাস ঘুরে ভবন দেখে নিয়েছি। এছাড়া এই ক্যাম্পাস বেশ পছন্দ হয়েছে।
ক্যাম্পাসের শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্বরে আরো এক ভর্তিচ্ছুর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি বলেন, আমার সিট পড়েছে শহীদুল্লাহ্ হক কলা ভবনে। এই ভবন দেখার জন্য আগেই ক্যাম্পাসে এসেছি। গেট থেকে ভবন নির্দেশক থাকায় কারো সাহায্য ছাড়াই চিনতে পেরেছি।
প্রসঙ্গত, সোমবার থেকে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। এবার প্রতি আসনের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে ৩১ জন শিক্ষার্থী। সি ইউনিটে ৪৪ হাজার ১৯৪ জন তিন শিফটে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। নৈর্ব্যক্তিক পদ্ধতিতে ১০০ নম্বরের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার ‘এ’ ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বুধবার ‘বি’ ইউনিটের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার জানান, এ বছর প্রতি আসনের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে ৩১ জন ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী। ৪ হাজার ১৭৩ আসনের বিপরীতে ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৪৬ টি আবেদন পড়েছে।

অক্টোবর ০৫
০৫:৪৭ ২০২১

আরও খবর

[TheChamp-FB-Comments]