Daily Sunshine

দুর্নীতির অডিও ফাঁস, গায়েবি প্রতিষ্ঠানে বীজের ডিলারশীপ

Share

স্টাফ রিপোর্টার, নাটোর: নাটোরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন বিএডিসির বীজ ডিলার নিয়োগে অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে বীজ ব্যবসায়ীরা। রোববার সকালে নাটোরের জেলা প্রশাসক শামীম আহম্মেদের কাছে অর্ধশত ব্যবসায়ী এ অভিযোগ করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন বীজ ব্যবসায়ী গোলাম কিবরিয়া, কামরুল ইসলাম, তোহরাব হোসেন জাহিদুল ইসলামসহ আরো অনেকে।
এ সময় পুরাতন বীজ ডিলাররা আন্দোলনের হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করে বিক্রয় কেন্দ্র, গুদাম ভাড়া, কর্মচারীর বেতন দিয়ে ভর্তূকি দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি আর ডিলার নিয়োগের সময় বিরাট অংকের উৎকোচ গ্রহণ করে দেয়া হচ্ছে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে। ডিলারদের কাছে উৎকোচ চাওয়ার ব্যাপারে হেদায়েতুল্লাহ খোকনের একটি ফোনরেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
বিএডিসির বীজ ডিলারদের সূত্রে জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থ বছরের নাটোর জেলার ৭টি উপজেলার ৫২টি ইউনিয়নে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে ১১০ জন ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের নাটোর জেলার সিনিয়র সহকারী পরিচালক (বীজ) এর দপ্তরে কর্মরত উপ-সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে বীজ বিক্রয় কেন্দ্র এবং সংরক্ষণাগার না থাকার পরও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে লাইসেন্স প্রদানের সুপারিশ করেছেন।
নিয়ম অনুযায়ী সশরীরে ডিলারদের দোকান এবং গুদাম সরজমিনে পরির্দশনের কথা থাকলেও তিনি উৎকোচের বিনিময়ে অফিসে বসে পছন্দসই ব্যক্তিকে ডিলার নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেন। এসব অভিযোগের সত্যাতাও মিলেছে ।
নাটোর শহরের নিচাবাজারের মেসার্স এষা এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী আরিফ খাঁনের কোনো দোকান নেই। তবুও তাকে ২০২১-২২ অর্থ বৎসরের বিএডিসির বীজ ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষক বা বীজ ব্যবসায়ীরা ওই ডিলারের নাম পর্যন্ত শুনেননি। রোববার শহরের নিচাবাজারে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে মেসার্স এষা এন্টারপ্রাইজে নামে কোনো দোকান খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই নামে বীজ ডিলারের কোনো দোকান ওই বাজারে কোনোকালেই ছিল না।
এ ব্যাপারে আরিফ খাঁন বলেন, আমার বড় ভাই নাটোর জেলা বিএডিসি বীজ ডিলার সমিতির সভাপতি আসিফ খাঁন আমার নামে ডিলারশীপের লাইসেন্সটি করেছে তিনি ভাল বলতে পারবেন প্রতিষ্ঠানটি কোথায়? একই ভাবে শহরের হরিশপুরের ভাইবোন এন্টারপ্রাইজ, চকরামপুরের আসাদুজ্জামানের দুই ভাই বীজ ভান্ডার, বনবেলঘড়িয়া এলাকায় উম্মে সায়মা রুনার মেসার্স সায়মা এন্টার প্রাইজ, সদর উপজেলার বাকশোর ঘাট মতিউর রহমানের ছমিরন এন্টারপ্রাইজ,পাইকোরদল গ্রামের সোহানুর রহমানে সিনথিয়া এন্টারপ্রাইজ, বড়াইগ্রাম উপজেলার বাহিমালী হারোয়া বাজারে দলিল লেখক মশগুল আজাদের বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স, গোপালপুর ইউনিয়নে রাজাপুর বাজারে আসাদুল ইসলামের মালিকানাধীন শুভ ট্রেডার্স, সিংড়া উপজেলার বিলদহর ইউনিয়নের ওষুধ বিক্রেতা আশিকুল ইসলামের মের্সাস আছিয়া ট্রেডাস সহ জেলার অধিকাংশ নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরজমিনে প্রতিটি এলাকায় ঘুরে এ ধরণের কোন প্রতিষ্টানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২১-২০২২ অর্থ বছরের জন্য বীজ ডিলার লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন বীজ ডিলার নিয়োগের জন্য আমরা আবেদন করি। গত ২৯ জুলাই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ২০২১-২২ অর্থ বছরের ৫ম জরুরী সভায় অনুমোদনক্রমে কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে বিএডিসি বীজ ডিলার লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন বীজ ডিলার নিয়োগের সময় এক মাস বৃদ্ধি করা হয়। ৩১ আগস্ট থেকে নির্ধারিত ফিসহ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়।
কিন্তু যাচাই বাছাই না করে মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে বিএডিসির রাজশাহী বিভাগীয় যুগ্ম-পরিচালক (বীজ বিপণন) দেলোয়ার হোসেন, উপপরিচালক (আলু বীজ) হাসান তৌফিকুর রহমান, সিনিয়র সহকারী পরিচালক (বীবি) এইচ এস জাহিদুল ফেরদৌস, উপপরিচালক (বীজ) জুলফিকার আলীর স্বাক্ষরিত চিঠিতে অবৈধভাবে ডিলার নিয়োগ দেন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের নাটোর জেলার সিনিয়র সহকারী পরিচালক (বীজ) এর দপ্তরে কর্মরত উপ-সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে বীজ বিপনী বিতান এবং সংরক্ষণাগার না থাকার পরও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে লাইসেন্স প্রদানের সুপারিশ করেছেন।
নিয়ম অনুযায়ী সশরীরে ডিলারদের দোকান এবং গুদাম সরজমিনে পরির্দশনের কথা থাকলেও তিনি উৎকোচের বিনিময়ে অফিসে বসে পছন্দসই ব্যক্তিকে ডিলার নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেন। দোলেয়ার হোসেন, যুগ্ম-পরিচালক (বীজ বিপনন) বিএডিসি রাজশাহী বিভাগের পক্ষে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হেদায়েতুল্লাহ খোকন ডিলারদের কাছে মোটা অংকের উৎকোচ দাবী করে। উৎকোচ দিতে যারা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন লাইসেন্সের সকল শর্তপূরন করা সত্বেও তাদের লাইসেন্স প্রদান করা হয়নি। প্রকৃত বীজ ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে অপেশাদার এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান নেই এমন ভূইফোঁড় ব্যক্তিকে বীজের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে।
সদর উপজেলার পাইকোরদল গ্রামে গিয়ে কথা হয়, সিনথিয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক সোহানুর রহমানের সাথে। তিনি অকপটে স্বীকার করেন তার কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। তবে অচিরেই বিক্রয় কেন্দ্র চালু করবেন। নাটোর জেলার সিনিয়র সহকারী পরিচালক (বীজ) এর দপ্তরে কর্মরত উপ-সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান নিকট আত্মীয় তিনিই লাখ দুয়েক টাকার বিনিময়ে লাইসেন্স করে দিয়েছে।
বড়াইগ্রাম উপজেলার বাহিমলী হারোয়া বাজারে দলিল লেখক মশগুল আজাদের বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স নামের কোন ব্যবসা প্রতিষ্টান পাওয়া না গেলেও পাওয়া যায় তাকে। তিনি বলেন, আমি পেশায় দলিল লেখক। নাটোর জেলার সিনিয়র সহকারী পরিচালক (বীজ) এর দপ্তরে কর্মরত উপ-সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান আমার নিকট আত্বীয়। তিনি বীজ ডিলারের লাইসেন্স করে দিয়েছে।
বীজ ব্যবসায়ী তোহরাব হোসেন জানান, মূলত স্বজনপ্রীতি এবং মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে এসব ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যাদের প্রতিষ্ঠানের কোন অস্তিত্ব নেই। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তো দুরের কথা এদের অধিকাংশ বীজের ব্যবসার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতায় নেই। নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করে স্বজনপ্রীতি এবং উৎকোচের বিনিময়ে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে অব্যবসায়ীদের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। প্রতিটি সুপারিশের জন্য নেয়া হয়েছে ৫০ খেকে ৬০ হাজার টাকা। আর লাইসেন্সের জন্য হেদায়েততুল্লাহ খোকনকে দিতে হচ্ছে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা।
ফলে, কৃষকের জন্য বরাদ্দ বীজ খোলাবাজারে বিক্রিসহ অনিয়ম হওয়ার আশংকা রয়েছে। এছাড়া বিএনপি- জামায়াতের পদধারী অনেক ব্যক্তিকে ডিলার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যারা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ।
এ ব্যাপারে নাটোর জেলার সিনিয়র সহকারী পরিচালক (বীজ) এর দপ্তরে কর্মরত উপ-সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, আমি সরজমিনে পরির্দশন করেই বেশিরভাগ ডিলারের নামে লাইসেন্স প্রদানের সুপারিশ করেছি। তবে অনেকের বিক্রয় কেন্দ্র বা বীজ সংরক্ষণাগার নেই এটা সত্যি। আমি সবাইকে খুশি রাখার জন্যই প্রতিটি ডিলারের আবেদনে স্বাক্ষর করেছি। এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য গত তিনদিন ধরে বিএডিসির রাজশাহী বিভাগীয় যুগ্ম-পরিচালক (বীজ বিপণন) দেলোয়ার হোসেন, উপপরিচালক (আলু বীজ) হাসান তৌফিকুর রহমান, সিনিয়র সহকারী পরিচালক (বীবি) জাহিদুল ফেরদৌস, উপ-পরিচালক (বীজ) জুলফিকার আলী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা হেদায়েতুল্লাহ খোকনের নাম্বারে একাধিকবার কল দিলে নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
নাটোরের জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ বলেন, বীজ ডিলার নিয়োগে অনিয়মের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত স্বাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অক্টোবর ০৪
০৫:৫৮ ২০২১

আরও খবর

[TheChamp-FB-Comments]