Daily Sunshine

একই দিনে একাধিক পরীক্ষা বিপাকে চাকরিপ্রার্থীরা

Share

সানশাইন ডেস্ক: দেশজুড়ে চলমান করোনা মহামারি পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় বিভিন্ন সরকারি-আধাসরকারি-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ পরীক্ষা শুরু হয়েছে। বেশিরভাগ পরীক্ষা সপ্তাহের শুক্রবার ও শনিবারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কখনও একই দিনে ২০-২৫টি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একইসময়ে একাধিক পরীক্ষা থাকার কারণে বিড়ম্বনায় পড়ছেন অনেক চাকরিপ্রার্থী। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরীণ সমন্বয় না থাকার কারণেই এমন হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
করোনা সংক্রমণের কারণে গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে লকডাউন জারি করে সরকার। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতসহ সব ধরনের সরকারি-বেসরকারি অফিস বন্ধ হয়ে যায়। পিএসসি, ব্যাংক, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, অধিদফতরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত করে। স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো পরবর্তীতে গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে ডাক্তার-নার্স নিয়োগ ছাড়া প্রায় এক বছর সব ধরনের পরীক্ষা বন্ধ থাকে।
করোনা পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর চলতি বছরের ১৯ মার্চ ৪১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর কয়েকটি অধিদফতর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানও স্বাস্থবিধি মেনে নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণ শুরু করে। কিন্তু এপ্রিলে করোনা সংক্রমণ ব্যাপক হারে বেড়ে গেলে শর্তসাপেক্ষে আবারও লকডাউন জারি করে সরকার। এতে আবারও ঘোষিত নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে প্রথম ধাপের লকডাউনে বেসরকারি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক হারে জনবল ছাটাই করে। পরবর্তীতে লকডাউন শিথিল হলে এসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনবল ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ নিয়োগ কার্যক্রম শুরু করে, যা এখনো চলমান।
চলতি বছর বেশ কয়েক ধাপে লকডাউন দেয়ার পর গত ১১ আগস্ট থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সবকিছু খুলে দেয়ার ঘোষণা দেয় সরকার। এরপরই পিএসসি, ব্যাংক, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, অধিদফতরসহ বিভিন্ন সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণ শুরু করে। কিছু প্রতিষ্ঠান সপ্তাহের অন্যান্য দিন নিয়োগ পরীক্ষা নিলেও ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর থেকে শুধু শুক্রবার ও শনিবার পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। দিনে দুটি শিফটে, সকাল ১০টা থেকে বেলা ১২টার মধ্যে একটি এবং অপরটি বেলা ৩টা থেকে ৫টার মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণের সময় রাখা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন করার এ যেন এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এতে একই দিনে ২০-২৫টি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় একজন প্রার্থীর একই সময়ে একাধিক পরীক্ষা থাকছে। আবেদন ব্যয় অপচয় হওয়ার পাশাপাশি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। যেসব চাকরিপ্রার্থীর বয়স ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে বা শেষের দিকে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ভুক্তভোগী নুরুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে চাকরির চেষ্টা করছেন। তার চাকরির বয়স আগামী জানুয়ারিতে শেষ হবে। তিনি বলেন, করোনার আগে বেশ কিছু চাকরির আবেদন করেছিলাম। করোনার লকডাউন চলাকালেও কিছু আবেদন করেছি। লকডাউন খুলে দেয়ার পর একই সময়ে অনেকগুলো পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর একই সময়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরীক্ষা রয়েছে। ওই দুটিতে আবেদন করতে আমার ৭৬০ টাকা খরচ হয়েছে। পরীক্ষার জন্য যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। করোনার কারণে এমনিতেই অনেক ক্ষতি হয়েছে, আবার আমার বয়স শেষের দিকে। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় না থাকার কারণে পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এটা অমানবিক।
তৌকির আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে এখন চাকরির চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, গত ১০ সেপ্টেম্বর আমার চাকরিতে আবেদনের বয়স শেষ হয়ে গেছে। করোনার মধ্যে খুব বেশি চাকরির বিজ্ঞপ্তি ছিল না। করোনার আগে বা করোনাকালে যেগুলো ছিল সবগুলো আবেদনই করেছি। এখন লকডাউন খোলার সঙ্গে সঙ্গে একই দিনে একাধিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর একই দিনে আমার তিনটি পরীক্ষা ছিল। এর মধ্যে একই সময়ে ছিল দুটি। তিনটি পরীক্ষার মধ্যে দুটি দিতে পেরেছি।
তিনি বলেন, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর বেসামরিক বিমান, সিলেট গ্যাস ফিল্ড, ওষুধ প্রশাসনসহ মোট চারটি পরীক্ষা রয়েছে। এর মধ্যে একই সময়ে রয়েছে তিনটি। ফলে আমি যেকোনো দুটি পরীক্ষা দিতে পারব। সরকারের উচিত এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম রুবেল বলেন, গত সপ্তাহেও একই দিনে একাধিক পরীক্ষা ছিল। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবরও একই সময়ে আমার দুটি করে পরীক্ষা রয়েছে। এ দুদিনে আমাকে যেকোনো দুটি পরীক্ষা বাদ দিতে হবে।
চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ বছর করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, করোনার কারণে সবারই ক্ষতি হয়েছে। আমাদের মতো বেকারদেরও অনেক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সবার জন্য প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকলেও বেকারদের জন্য কিছু করা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ বছর করার দাবি নাকচ করে দেয়া হয়েছে। এখন আবার একই সময়ে একাধিক পরীক্ষা নেয়া শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও কেউ রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া মেলেনি। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কে এম আলী আজম বলেন, যেহেতু আমরা দ্রুত পরীক্ষা নিতে বলেছি, সেজন্যই হয়তো একই দিনে একাধিক পরীক্ষা হচ্ছে। তবে সবাইকে সুযোগ দেয়ার জন্য একটা একটা করে যদি পরীক্ষা নেয়া হয়, তাহলে বছরের পর বছর সময় লেগে যাবে। এতে আরও বিড়ম্বনার সৃষ্টি হবে। আমি ১০ দিন আগে চিকিৎসার জন্য ভারতের দিল্লিতে এসেছি। দেশে ফিরে খোঁজ নিয়ে দেখব কোন কোন মন্ত্রণালয় কবে পরীক্ষা দিয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, পিএসসি চাকরি দেয়ার প্রধান জায়গা। আমরা কোনো পরীক্ষা নেয়ার অনেক আগেই তারিখ ঘোষণা করি এবং সেটা ওয়েবসাইটেও থাকে। অন্যরা যারা পরীক্ষা নেন তারা যদি আমাদের ওয়েবসাইটটা দেখেন তাহলে সুবিধা হবে। আর যেহেতু অনেকদিন পর পরীক্ষা হচ্ছে এবং পরিবেশও অনুকূলে আছে, সেজন্যই সবাই পরীক্ষা নিচ্ছে। এতে হয়তো একটু সমস্যা হচ্ছে, তবে সবাই যদি একটু খেয়াল করে তারিখ ঘোষণা করেন তাহলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।
সমন্বয়ের অভাব রয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের অন্য কারও সঙ্গে সমন্বয় করার ক্ষেত্র বা সুবিধা নেই। যারা পরীক্ষা নেন, তারা যদি পিএসসির দিকে নজর দেন তাহলে সুবিধা হবে। চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বয়সের ব্যাপারে পিএসসির কিছুই করার নেই। এটা পিএসসির দায়িত্ব না, সম্পূর্ণ সরকারের দায়িত্ব। সরকার যে সিদ্ধান্ত দেবে পিএসসি সেই অনুযায়ি যাবতীয় কাজ করবে। সরকারের সিদ্ধান্তের বাহিরে পিএসসি কোনো কাজ করবে না।

সেপ্টেম্বর ২৩
০৬:১৩ ২০২১

আরও খবর

[TheChamp-FB-Comments]

সর্বশেষ