Daily Sunshine

বদলে যাচ্ছে রাজশাহী নগরী

Share

রাজু আহমেদ : নানা কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে পিছিয়ে থাকা বিভাগীয় শহর রাজশাহী ধিরে ধিরে নিজেকে গুছিয়ে পরিপাটি ও নিরাপদ নগরী হিসেবে গড়ে উঠছে। একসময়ের সংকীর্ণ ও ভাঙা সড়ক এখন প্রশস্ত হচ্ছে, বিনোদনকেন্দ্রগুলো নতুন রূপ পেতে শুরু করেছে, রাতের অন্ধকারে ঢাকা নগরী এখন আলোঝলমলে নগরীতে রূপ নিয়েছে, মোড়ে মোড়ে বসানো হয়েছে শতাধিক নিরাপত্তা ক্যামেরা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে, বৃদ্ধি পেয়েছে নাগরিক সেবা। এক সমেয়র পিছিয়ে থাকা এই রাজশাহী নগরী যার হাত ধরে এগিয়ে চলেছে তিনি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান হেনার পুত্র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন।
পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত রাজশাহী মহানগরীর আয়তন প্রায় ৯৮ বর্গ কিলোমিটার। বেসরকারি হিসেবে বর্তমানে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস। বিভাগীয় শহর হওয়ায় এখানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস-আদালত, ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রুয়েট, রাজশাহী কলেজসহ স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হসাপাতালের কারণে রাজশাহীতে বাইরের জেলার মানুষের আনাগোনা তুলনামূলক বেশি। শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এই অঞ্চলে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজশাহী নগরী রামপুর বোয়ালিয়া নামে পরিচিত থাকাকালীন ১৮৬৯ সালে রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটির সূচনা হয়। পরবর্তীতে রামপুর বোয়ালিয়া মিউনিসিপ্যালিটি রাজশাহী পৌরসভা নাম ধারণ করে। ১৮৮৭ সালের ১৩ আগষ্ট রাজশাহী পৌরসভা রাজশাহী মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনে উন্নীত হয়। ১৯৯০ সালে মিউনিসিপ্যাল শব্দটির পরিবর্তে ‘সিটি’ শব্দটি যুক্ত হয়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) নামকরণ হয়। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ৩০টি ওয়ার্ডে বিভক্ত। সচিবালয়, রাজস্ব, প্রকৌশল, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্ন এবং হিসাব বিভাগ এর মাধ্যমে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের নাগরিক সেবাসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা পেলেও বিভাগীয় এই শহরের নাগরিক সেবা বৃদ্ধি, সড়ক সংস্কার ও প্রশস্তকরণ এবং অবকাঠামোর দিক থেকে পিছিয়ে ছিল। তবে ২০০৮ সালের রাসিক নির্বাচনের পর থেকে এই শহরের ইতিবাচক পরিবর্তশ দেখতে শুরু করে রাজশাহীবাসী। রাসিকের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের হাত ধরে রাজশাহীর এগিয়ে চলার শুরু। এসময় রাজশাহীবাসী বাসাবাড়িতে প্রথম গ্যাসের সংযোগ পায়, দীর্ঘদিনের ভাঙা রাস্তায় নতুন করে সংস্কার শুরু হয়। মাঝের ৫ বছর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে থমকে পড়ে রাজশাহী। তবে ২০১৮ এর নির্বাচনে আবারো আশায় বুক বাঁধে রাজশাহীবাসী। খায়রুজ্জামান লিটনের নেতৃত্বে রাজশাহীতে বর্তমানে কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে। প্রকল্পগুলোর কয়েকটি এরই মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, কয়েকটি চলমান। স্থানীয়রা বলছেন, কাজগুলো সমাপ্ত হলে আমূল পরিবর্তন ঘটবে রাজশাহীর, অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে বাড়বে কর্মসংস্থান।
রাজশাহীবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে স্থাপনা করা হয়েছে একাধিক সিকিউরিটি ক্যামেরা। রাজশাহী মহানগর পুলিশের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত এসব সিসি ক্যামেরার সুফল এরই মধ্যে নগরবাসী পেতে শুরু করেছে। কিশোর গ্যাং ধরা থেকে শুরু করে সম্প্রতি নগরীতে সংঘটিত বেশ কিছু বড় ধরণের ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করতে ও গ্রেপ্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এই সিসি ক্যামেরা। রাজশাহী সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য মতে, আগামীতে সেন্ট্রাল কন্ট্রোলরুম বসিয়ে আরএমপি ও রাসিক একত্রে এই সিসি ক্যামেরার পরিধি বৃদ্ধি করবে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন সূত্রের দেয়া তথ্য মতে, করোনায় মহামারীর মধ্যেও উন্নয়নকাজ চলমান রয়েছে। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সময়মতো টাকা ছাড় পেলে প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। এতে বদলে যাবে রাজশাহী নগরীর চেহারা। নগরী নতুন রূপ দিতে এসব প্রকল্পকে মাইলফলক হিসেবে দেখছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন সহ স্থানীয়রা। বৃহৎ এ প্রকল্প বাস্তবায়নে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। ইতিমধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি টাকার কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যার অনেকগুলোর কাজ চলমান। কয়েকটি শেষের দিকে।
রাজশাহী নগরীতে নির্মিত হতে যাচ্ছে ৫টি ফ্লাইওভার ও ১৯টি অবকাঠামো উন্নয়ন। সম্প্রতি যার নকশা প্রণয়ন ও বিস্তারিত প্রকৌশল প্রণয়নে তিনটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। নগরীর সড়ক অবকাঠামো সম্প্রসারিত হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সড়ক উন্নীত হচ্ছে প্রশস্ত চার লেনে। ‘তালাইমারি মোড় থেকে স্বচ্ছ টাওয়ার পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’ চলামান। এর আওতায় ১৬৪ কোটি ১৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয়ে কল্পনা সিনেমা হল মোড় হতে তালাইমারি মোড় পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার বর্তমান সড়কটির প্রশস্ত করে ৪ লেন সড়কে উন্নীতকরণ কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় ড্রেন ও সড়কের দুই পাশে ২ দশমিক ২০ মিটার চওড়া ফুটপাথ নির্মাণ করা হয়েছে। আলোকায়নের জন্য সড়কটিতে আধুনিক দৃষ্টিনন্দন সড়কবাতি স্থাপন করা হবে। এছাড়া উপশহর মোড় থেকে মালোপাড়া হয়ে মণিচত্ত্বর পর্যন্ত এবং মণিচত্ত্বর থেকে বাটার মোড় পর্যন্ত যানজট মুক্ত বিশাল সড়কে স্বাস্তি মিলেছে রাজশাহীবাসীর। বাইপাস থেকে কোর্ট স্টেশনের প্রশস্ত সড়কটির কাথাও এখানো না বললেই নয়। নগরীতে যানজট নিয়ন্ত্রণে মূল নগরীতে ৫টি ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। শুধু তাই না, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা ১৫০ শষ্যার হাসপাতালটি আবারও চালু হচ্ছে।
বহুল আলোচিত বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কের কাজ শেষের পথে। যার বেশির ভাগ অংশ এখন দৃশ্যমান। বিশাল কর্মযজ্ঞে মাথাচাড়া দিয়েছে পদ্মাপাড়ের বিশাল বিশাল অবকাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির আদলে নির্মাণ করা হচ্ছে এটি। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কে শেখ কামাল আইটি ইনকিউবেশন অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার চালু হয়েছে। হাইটেক পার্ক পুরো চালু হলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে রাজশাহীভিত্তিক অন্তত ৪০ হাজার তরুণ-তরুণীর। এর পাশাপাশি রাজশাহীর শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানায় নির্মিত হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার। এসব উন্নয়ন কর্মকান্ডের অগ্রগতি এখন প্রায় ৮০ ভাগের বেশি। ২২২ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার প্রকল্পটি হাতে নিয়েছিল রাজশাহী সিটি করপোরেশন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এ প্রকল্পটি এখন বাস্তবায়ন করছে গণপূর্ত অধিদফতর। নভোথিয়েটারে আধুনিক প্রযুক্তির ডিজিটাল প্রজেক্টর সিস্টেমযুক্ত প্ল্যানেটরিয়াম, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ডিজিটাল এক্সিবিটস, ফাইভ-ডি সিমিউলেটর থিয়েটার, টেলিস্কোপ, কম্পিউটারাইজড টিকিটিং অ্যান্ড ডেকোরেটিং সিস্টেমসহ নানা সুবিধা থাকবে। ভবন নির্মাণ শেষ হলে দ্রুত অন্যান্য যন্ত্রাংশ সংযোজন হবে নভোথিয়েটারে। প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা নদী তীরবর্তী লালনশাহ মুক্তমঞ্চ সহ নদীর ধার দৃষ্টিনন্দন করতে সংস্কার কাজ হাতে নেয়া হয়েছে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, দৃশমান সবকিছু। এর সবই সম্ভব হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য। তার নেতৃত্বে দেশের প্রতিটি কোনায় আজ উন্নয়নের ছোয়া লেগেছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজশাহী শহরও উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকবে না।

সেপ্টেম্বর ১৫
০৬:১৬ ২০২১

আরও খবর

[TheChamp-FB-Comments]