Daily Sunshine

জিও ব্যাগে বালুর বদলে মাটি

Share

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি : পদ্মা নদীর ভাঙনরোধে এপারে চলছে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ। নদী পেরিয়ে ওপারে নদী ঘেঁষে ভারতীয় সীমানার তারবেড়া। মাত্র কয়েকশ গজ দূরেই ভারতীয় বাড়িঘর, গাছপালা। এদিকে বাংলাদেশের অংশটি অত্যান্ত দুর্গম। নেই ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা। বর্ষাতে তা আরও কঠিন পথ। এখানে বিজিবিকেও টহল দিতে হয় হেঁটে হেঁটে। লোকালয় থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে নদীপথে যেতে হয় জিও ব্যাগ ডাম্পিং-এর জায়গায়। ঘটনাস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়নের হাকিমপুর-রাবনপাড়া ১২ নম্বর বাঁধ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, সোমবার (৩০ আগষ্ট) দুর্গোম চর এলাকার সুযোগ নিয়ে ভাঙন রোধে নদীর ধারে ফেলা জিও ব্যাগে বালুর বদলে মাটি দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল ঠিকাকারের লোকজন। এমনকি ৪০০টি বস্তায় মাটি ভর্তিও করা হয়েছিল। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে এই কর্মকান্ড থেকে বাঁচতে জিও ব্যাগ থেকে মাটি বের করে নেয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই দফায় মাটি ফেলে দিলেও তারা আগে এমনটি করেনি বা পরে করবে না এর কোন নিশ্চয়তা নেই। এমনকি এই কাজে বাঁধা দিতে গেলে স্থানীয় বাসিন্দাদের হুমকি দেয় ঠিকাদারের লোকজন।
এদিকে সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ভাঙন কবলিত গোয়ালডুবি গ্রামেও সোমবার (০৬ সেপ্টেম্বর) এমন আরেকটি ঘটনা ঘটেছে। এখানে জিও ব্যাগে বালুর বদলে ভরাট, মাটিযুক্ত বালু দেয়ার জন্য ৭-৮ ট্রাক্টর ভরাট মাটিযুক্ত বালু নিয়ে আসা হয়। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতিবাদের মুখে পড়ে তা ব্যাগে ভর্তি করতে পারেনি ঠিকাদারের লোকজন। এমনকি রাস্তাতেও ভরাট মাটিযুক্ত বালু নিয়ে আসার পথে আরও কয়েকটি ট্রাক্টর আটক করে স্থানীয়রা। মঙ্গলবার সকালেও আগের দিনের নিয়ে আসা মাটিযুক্ত ভরাট বালু ব্যাগে ভর্তি করার সময় প্রতিবাদ জানায় স্থানীয়রা। পরে ব্যাগ ভর্তি করা বন্ধ করে শ্রমিকরা।
লোকালয় থেকে প্রায় ২০ মিনিট নৌকায় যেতে হয় ১২ নম্বর বাঁধে। হাকিমপুর গ্রামের নৌকার মাঝি রফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন থেকে ভাঙনের কবলে পড়ে হাকিমপুর গ্রামের হাজারো মানুষ তাদের সবকিছু হারিয়েছে। বিলীন হয়েছে কয়েক হাজার একর ফসলী জমি ও বসতবাড়ি। সরকার এসব বিবেচনায় নিয়ে পদ্মার ভাঙন রোধে বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাঁধ নির্মাণের আগে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের প্রাথমিক কাজ করছে। শুনেছি কয়েকদিন আগে এখানে জিও ব্যাগে বালুর বদলে মাটি দিয়ে নদীর ধারে ফেলার জন্য ব্যাগ ভর্তি করা হয়েছিল। যারা এমন কাজ করছে, তাদেরকে মানুষ বলতেও ঘৃণা লাগে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক মাদরাসা শিক্ষক বলেন, বালুর বদলে মাটি দিয়ে জিও ব্যাগ ভর্তির বিষয়টি আমিও শুনেছি। বালুর বদলে মাটি দিলে জিও ব্যাগের মূল কাজ ভাঙন রোধ করা অসম্ভব। কারন পানির সাথে মাটি বেশি সময় টিকবে না। অল্প সময়ে মাটি গলে দিয়ে জিও ব্যাগসহ পদ্মায় বিলীন হবে।
৩৫০টি বস্তায় বালুর বদলে মাটি ভর্তি করা হয়েছিল এমন তথ্য স্বীকার করেছেন হাকিমপুর ১২ নম্বর বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের তত্বাবধায়ক ওয়াসিম। তিনি বলেন, সোমবার (৩০ আগষ্ট) সকালে মাটি ভর্তি করা হলে বিকেলে পাউবো কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিজিবি সদস্যদের উপস্থিতিতে মাটি ভর্তি করা বস্তা খালি করা হয়। ৭ টাকা ফিটের বালু ১৩ টাকা ফিট দাম হয়ে যাওয়ায় এমন কাজ করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
বালুর বদলে জিও ব্যাগে মাটি ভর্তি করা হয়েছে, এমন সংবাদের ভিত্তিতে শাহজাহানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পাঠান ইউপি মনিরুল ইসলামকে। দুপুর ১টার পরে ১২ নম্বর বাঁধে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পান তিনি। ইউপি সদস্য জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন নিয়ে চেয়ারম্যানের নির্দেশে সেখানে উপস্থিত হয়। পরে সেখানে যোগ দেয় হাকিমপুর বিওপি’র বিজিবি সদস্যরা। পাউবো কর্মকর্তা ও বিজিবি সদস্যদের উপস্থিতিতে ভর্তি করা মাটি ফেলা দেয়া হয়। ইউপি সদস্য মনিরুল ইসলাম আরও জানান, ঠিকাদার সরকারি অর্থ নিয়ে কাজ করছে। কোনভাবে কাজ শেষ করতে পারলেই তার বিল নিয়ে এখান চলে যাবে। কিন্তু নিম্নমানের কাজের খেসারত দিবে পদ্মাপাড়ের খেটে-খাওয়া অসহায় মানুষরা। এভাবে কাজ করলে বাঁধ নির্মাণের কয়েক বছর পরেই বাঁধেও ভাঙন ধরবে। পরবর্তী সময়ে যাতে এধরনের কাজ করতে না পারে তাই স্থানীয় বাসিন্দা ও মাঝিদের সজাগ থাকতে বলা হয়েছে।
শাহজাহানপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম বলেন, হাকিমপুরে বালুর বদলে মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে এমন খবর পেয়েই ইউপি সদস্য মনিরুল ইসলাম ও ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক গাউসকে সেখানে পাঠায়। পরে সকলের উপস্থিতিতে মাটি ফেলা দেয়া হয়। কিন্তু দুর্গম এলাকা হওয়ায় সকলের মনে শঙ্কা রয়েছে, আবারও এমন কাজ করে কি না। তবে পাউবো ও ঠিকাদারের লোকজনকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, এমন নিম্নমানের কাজ করা হলে কাজ বন্ধ করে দেয়া হবে।
এদিকে, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের গোয়ালডুবি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান, ইয়াসিন আলী জানান, সকালে কয়েকটি ট্রাক্টরে করে ভরাটের মাটিযুক্ত বালু নিয়ে আসলে গ্রামবাসী বাঁধা দেয়। পরে তারা এগুলো জিও ব্যাগে ভর্তির কাজ বন্ধ রাখে। বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আগামী এধরনের কাজ করলে এর চরম মূল্য দিতে হবে।
প্রকল্প ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন জানান, অনেক বালু আসছে, তার মধ্যে কয়েক ট্রাক্টর ভরাটের বালুও চলে আসে। পরে স্থানীয় লোকজন বাঁধা দিলে সেগুলো দিয়ে জিও ব্যাগে ভর্তি করা হয়নি। এসব ভরাটের মাটিযুক্ত বালু জিও ব্যাগের জন্য মানসম্পন্ন নয় বলে জানান এখানে কাজ করা কয়েকজন শ্রমিকও।
চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদ রানা টিপু বলেন, স্থানীয় জনসাধারণের তথ্য ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি নিম্নমানের ভরাটের কাজে ব্যবহার করা মাটিযুক্ত বালু নিয়ে আসা হয়েছে। তাদেরকে (জিও ব্যাগ ডাম্পিং কাজে নিয়োজিত) বলেছি, এভাবে জিও ব্যাগ দেয়ার থেকে না দেয়ায় ভালো। কারন এতো নিম্নমানের কাজ টেকসই হবে না। বিষয়টি নিয়ে পাউবো কর্মকর্তাদেরকেও জোরালোভাবে বলেছি।
সদ্য যোগদান করা চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সারোয়ার জাহান সুজন জানান, গত বুধবার (০১ সেপ্টেম্বর) এখানে যোগদান করেছি। হাকিমপুরের সাড়ে ৩৫০ বস্তা বালির বদলে মাটি ভর্তির ঘটনাটি সম্ভবত আমার যোগদানের আগের। খোঁজ-খবর নিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, জিও ব্যাগে বালুর পরিবর্তে মাটি ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। এর সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কাজের জায়গায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন থাকার কথা। তাদের গাফেলতি থাকলে সেটিও তদন্ত করা দরকার। তা না হলে সরকারি বরাদ্দ বিপুল পরিমাণ অর্থ বিফলে যাবে এবং জনসাধারণ এর কোন সুফল পাবে না।
উল্লেখ্য, পদ্মার তীর সংরক্ষণে ৫৬৬ কোটি টাকার সম্প্রসারিত প্রকল্পের ঠিকাদারদের কার্যাদেশ দেওয়া হয় জানুয়ারিতে। চলতি বছরে জিও ব্যাগ ডাম্পিং ও সিসি ব্লক তৈরি করা হচ্ছে। পরের বছরে বাঁধ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হবে।

সেপ্টেম্বর ০৮
০৬:৩৫ ২০২১

আরও খবর

[TheChamp-FB-Comments]