Daily Sunshine

রাজশাহীতে প্রভাব বিস্তারে ব্যবহার হচ্ছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র

Share

রাজু আহমেদ : রাজশাহীর সীমান্তবর্তী দেশ ভারত দিয়ে মাদকের পাশপাশি চোরাই পথে ঢুকছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। যা বিভিন্ন ক্যারিয়ারের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের জেলাসহ দেশের মধ্যবর্তী অঞ্চল সমূহে। আর এসব অস্ত্র পরবর্তিতে ব্যবহার করা হচ্ছে এলাকায় প্রভাব বিস্তার, জনমত নিজের পক্ষে নিতে, জমি দখল নয়তো ছিনতাই অথবা ডাকাতির মতো কাজে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারকারীদের তালিকায় সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি নাম রয়েছে জনপ্রতিনিধিদের।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্রসহ সংশ্লিষ্টদের গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা ধরাছোয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। পাচার হয়ে আসা আগ্নেয়াস্ত্রের সামান্যই ধরা পড়ছে। পৃথক তিনটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে কাজ করলেও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ মাদক উদ্ধারে এগিয়ে রয়েছে র‌্যাব-৫।
এদিকে ক্যারিয়ার (বাহক) হিসেবে যাদের ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের অধিকাশই বয়সে তরুণ। সামান্য কিছু অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ক্যারিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এই চক্রের মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি ঢুকছে মাদক, ভারতীয় কাপড়; পাচার হচ্ছে মানুষ, সীমানা পিলার, টিকটিকি জাতীয় প্রাণী তক্ষকসহ সাপের বিষ।
কয়েকটি সূত্রের দেয়া তথ্য মতে, রাজশাহী ও এর আশপাশের জেলায় ওয়ান শুটার গান বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে, আর বিদেশি পিস্তল বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকায়।
তবে ঢাকা, গাজিপুর সহ নারায়নগঞ্জের মতো দেশের মধ্যবর্তী জেলাগুলোতে পৌছাতে পারলে এই অস্ত্রগুলোর মূল্য আরও বৃদ্ধি পায়। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র পাচার হয়ে তা মূল ক্রেতা পর্যন্ত পৌছাতে ব্যবহার করা হচ্ছে দুই থেকে তিনটি মাধ্যম। একটি চক্র ভারত থেকে দেশে আগ্নেয়াস্ত্রগুলো পৌছে দেয়, যা চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা এবং রাজশাহী জেলার বাঘা ও গোদাগাড়ী উপজেলার সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে এসে স্থানীয় ক্যারিয়াদের মাধ্যমে তা ক্রেতাদের হাতে পৌছে দেয়া হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহীতে কয়েকটি কেস বিশ্লেষণ করলেই কারা অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করছে তা সহজেই অনুমান করা যাবে। রাজশাহীর আড়ানী পৌরসভার মেয়র মুক্তার আলীর বাড়িতে ৬ জুলাই দিবাগত রাতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ সহ মাদক উদ্ধার করে জেলা পুলিশ। এসময় মেয়র মুক্তার আলীকে না পেয়ে পুলিশ তার স্ত্রীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, তিনটি ওয়ান শুটার গান, ৪০টির বেশি গুলি এবং হেরোইনের মতো মাদকদ্রব্য। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এই অবৈধ অস্ত্রগুলো এলাকায় প্রভাব বিস্তারে কাজে লাগাতেন। এদিকে দেশের অন্য জেলা থেকেও অস্ত্র আসছে রাজশাহীতে বিক্রির জন্য।
এর আগে রাজশাহীতে অস্ত্রসহ দুই যুবকের ভিডিও ভাইরাল হলে গত ২৭ জুন সেই যুবককে মহানগরীর বর্ণালীর মোড় থেকে একটি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে নগর পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত ওই যুবকের নাম সেলিম মোর্শেদ ওরফে সেলিম (৪০)। সেলিম রাজশাহী মহানগরীর তিন নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মহাতাব আলীর ছেলে। এ সময় সেলিমের আরও দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেলিমকে গ্রেপ্তারের পর ৩০ জুন রাজশাহী মহানগরীর দাশপুকুর এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে দুই গ্রুপের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ওই ঘটনায় অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার সেলিমের অনুসারী সহ প্রতিপক্ষের মোট দুই জন নিহত হন। এছাড়া অনেকে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অভিযোগ রয়েছে যে জমি নিয়ে সংঘর্ষ তা সেলিমের পরিবারের দখলে ছিল।
এদিকে গত ৪ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩ টায় রাজশাহী নগরীর আলিফ লাম মীম ভাটার মোড় এলাকায় অপারেশন পরিচালনা করে দুইটি অগ্নেআস্ত্রসহ এক যুবককে আটক করে র‌্যাব-৫। এসময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশী পিস্তল, একটি ওয়ান শুটারগান, একটি ম্যাগাজিন, এক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। পরে জানানো হয়, আটককৃত ওই যুবকের নাম রাজীব মিয়া (২৮)। তিনি শেরপুর জেলার শেখহাটি গ্রামের মোক্তার আলীর ছেলে। শেরপুর থেকে রাজীব এসেছিল রাজশাহীতে অস্ত্র বিক্রি করতে।
তবে বসে নেই স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির মধ্যে অস্ত্র উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য হারে এগিয়ে আছে র‌্যাব-৫। র‌্যাব-৫ এর রাজশাহী জেলা ইউনিট পৃথক অভিযানে এবছরের জানুয়ারি মাস থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত গত ৭ মাসে ২১টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে। যার মধ্যে রয়েছে ৯টি বিদেশি পিস্তল ও ১২টি ওয়ান শুটার গান। এছাড়া ১০টি ম্যাগাজিন ও ২৯টি গুলি উদ্ধার করা হয়। জেলা পুলিশ পৃথক অভিযানে গত এক বছরে (গত বছরের আগস্ট থেকে এই বছরের আগস্ট মাস) ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। যার মধ্যে ৫টি বিদেশি পিস্তল, একটি দেশি পিস্তল, কাটা বন্দুক একটি, পাইপগান একটি, ওয়ান শুটারগান একটি, দুইনলা বন্দুক একটি, এসবিবিএল শটগান একটি, ইয়ারগান একটি। এছাড়া ৫৮টি গুলি, ছুরি ২টি, তরবারি একটি ও ৩টি চাইনিজ কুড়ার উদ্ধার করা হয়। এদিকে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মিডিয়া সেলে অনুরোধ করেও তাদের আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার বিষয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) ইফতে খায়ের আলম জানান, জেলা পুলিশের অস্ত্র ও মাদক বিরোধী অভিযান পূর্বের মে কোনো সময়ের চাইতে বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এসব অভিযানের মাধ্যমে গত বছরের আগস্ট থেকে এই বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত এক বছরে মোট ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের এই মুখপাত্র আরও জানান, অস্ত্র পাচারকারীদের গ্রেপ্তারের পর প্রথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাচ্ছে, এই আগ্নেয়াস্ত্রগুলো যারা কিনছে তারা নিজেদের এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে কাজে লাগায়। পাচার হয়ে আসা অস্ত্রগুলোর একটি বড় অংশই রাজশাহীর বাইরের জেলা গুলোতে চলে যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় এই রুটটিকে ক্যরিয়ার হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। তবে তারা সফল হচ্ছে না। জেলা পুলিশের নিয়মিত অভিযানে ধরা পড়ছে আগ্নেয়াস্ত্রসহ পাচারকারীরা।
র‌্যাব-৫ এর কম্পানি কমাণ্ডার (সিও) লে.ক. জিয়াউর রহমান তালুকদার জানান, র‌্যাব-৫ রাজশাহী বিভাগের ৪টি জেলা নিয়ে কাজ করে। গত আট মাসে এই ৪টি জেলায় পৃথক অভিযান চালিয়ে মোট ৫২টির বেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এবছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজশাহী জেলায় উদ্ধার হয়েছে ২১টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র। এর সাথে রয়েছে গুলি ও ম্যাগাজিন। এছাড়া আগস্ট মাসেও ১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারে র‌্যাব-৫ দুর্দান্ত কাজ করে চলেছে। দেশে ১৫টি ইউনিটে ভাগ হয়ে কাজ করে র‌্যাব। যার মধ্যে রাজশাহীর র‌্যাব-৫ ইউনিট অস্ত্র, মাদক সহ সন্ত্রাস দমনে সবসময় প্রথম নয়তো দ্বিতীয় পর্যায়ে থাকছে।
জিয়াউর রহমান আরও জানান, ধরা পড়ার পর ক্যরিয়ারদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রথমিকভাবে জানা গেছে সীমান্ত পার করে এই আগ্নেয়াস্ত্রগুলো রাজশাহী রুট দিয়ে বাইরের জেলায় বিক্রির জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকা গাজিপুর, নারায়নগঞ্জের দিকেই বেশি টার্গেট থাকে। তাছাড়া কিছু ডাকাতের দল এই আগ্নেয়াস্ত্র ক্রয় করে থাকে। তবে র‌্যাব তাদের পরিকল্পনা সফল হতে দেবে না।

সেপ্টেম্বর ০৪
০৫:৫২ ২০২১

আরও খবর

[TheChamp-FB-Comments]