Daily Sunshine

আধুনিক হচ্ছে রামেকের জরুরী বিভাগ

Share

রাজু আহমেদ: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগি ও স্বাজনদের বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গুরুতর রোগিদের চিকিৎসা দেয়ার ব্যবস্থা নেই। অথচ হাসপাতালে আসা যেকোন রোগিকে প্রথমে এই জরুরী বিভাগেই ভর্তি হতে হয়। এরপর তাকে একজন চিকিৎসক পর্যবেক্ষণ করে অবস্থা বুঝে সরাসরি হাসপাতালের কোন না কোন ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে যে ওয়ার্ডে পাঠানো হয় সেই ওয়ার্ডে কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগী দেখার পর অনেক সময় বলেন এই রোগীর চিকিৎসা এই ওয়ার্ডে নয় অন্য ওয়ার্ডে। চিকিৎসার পরিবর্তে রোগীকে নিয়ে স্বজনদের এই ওয়ার্ড থেকে অন্য ওয়ার্ডে ছুটোছুটি করেই সময় পার হয়।
এভাবে কয়েক দফা রোগী নিয়ে স্বজনরা ঘোরাঘুরির পর হয়তো কাঙ্খিত ওয়ার্ডের সন্ধান পান। এ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন সময় সমালোচনার সম্মুখিন হতে হয়; তার চাইতে বড় বিষয় রোগীদের পড়তে হয় হয়রানি ও ঝুঁকিতে।
ভুক্তভোগী রোগী ও স্বজনদের দাবি, হাসপাতালের জরুরী বিভাগের অব্যবস্থাপনা, মানধাত্তা আমলের অবকাঠামোর এবং জনবল সংকটের কারণেই এমনটা হচ্ছে। সার্বিক অর্থে ১ হাজার ২৫০ বেডের এই হাসপাতালের জরুরী ও ক্যাজুয়ালটি বিভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। অথচ স্বাভাবিক সময়ে ১ হাজার ২৫০ বেডের এই হাসপাতালে রোগী ভর্তি থাকে ২ হাজারেরও বেশি।
সূত্রমতে, ১৯৫৮ সালে রামেক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর জরুরী বিভাগ চালু হয়। বিভিন্ন ধরণের রোগী ও রোগীদের সংখ্যা কথা মাথায় রেখে ১৯৬২ সালে একাধিক কক্ষ নিয়ে চালু করা হয় জরুরী বিভাগ। তবে সময়ের ব্যবধানে ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদাসিনতায় বেশকিছু কক্ষ জরুরী ও ক্যাজুয়ালটি বিভাগের হাতছাড়া হয়ে গেছে। কোন কক্ষে গড়ে তোলা হয়েছে ফাঁড়ি, আবার কোনটিকে করা হয়েছে ওসিসি ওয়ার্ড। এতে করে হাসপাতালটির গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ড জরুরী ও ক্যাজুয়ালটি বিভাগ চাইলেও রোগিদের এই বিভাগে রেখে চিকিৎসা দিতে পারছে না। একই সাথে জরুরী বিভাগে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সংকটও রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় জরুরী বিভাগে এখন রোগি আসলে তারা কোন মতে হাসপাতালের অন্য কোন ওয়ার্ডে পাঠাতে পারলেই বাঁচে।
তবে আশার কথা, রোগীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে কাজ করে চলেছেন বর্তমান পরিচালনা কমিটি। এরই মধ্যে নানা ধরণের উদ্যোগের সুফল পেতে শুরু করেছেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগিরা। হাসপাতালটির পরিচালক ব্রি:জে: ডা. শামীম ইয়াজদানি বলেছেন, হাসপাতালে আসা সকল রোগী আমাদের কাছে ভিআইাপি।
বুধবার রামেক হাসপাতালের সভা কক্ষে ‘হাসপাতাল ব্যাবস্থাপনা কমিটির’ জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জরুরী ও ক্যাজুয়ালটি বিভাগের উন্নয়ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য এবং হাসপাতাল ব্যাবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ফজলে হোসেন বাদশা এমপি। ব্যাবস্থাপনা কমিটির সকল সদস্য উপস্থিতিতে সভা সঞ্চালনা করেন ব্যাবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানি।
সভায় উপস্থিত একটি সূত্রের দেয়া তথ্য মতে, সভায় জানানো হয়, সময়ের ব্যবধানে হাসপাতালে বৃদ্ধি পেয়েছে রোগির সংখ্যা ও রোগির ধরণ। সেই অনুপাতে জরুরী বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়নি। রোগিদের স্বার্থে চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মীসহ জনবল বৃদ্ধি এবং অন্যান্য সকল অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। সভায় জরুরী ওয়ার্ডের কক্ষ ও বেড পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। গুরুতর রোগিদের হাসপাতালের অন্য কোন ওয়ার্ডে প্রেরণের পূর্বে জরুরী বিভাগে রেখে চিকিসা দেয়া হবে, তার পর প্রয়োজনে অন্য ওয়ার্ডে প্রেরণ করা হবে, নয়তো চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে। এতে করে হাসপাতালে ভর্তি অতিরিক্ত রোগির সংখ্যা কমে আসবে।
এদিকে পূর্বের সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক হাসপাতালে প্যাথলজি টেস্ট বৃদ্ধি করা হয়েছে। সেন্ট্রাল অক্সিজেন সার্কুলেশন ৬৫ বেড থেকে বৃদ্ধি করে ৫১৩টি বেডে চালু করা হয়েছে। পাশপাশি আরও দুইটি ওয়ার্ডের ১০০টি বেডে চালু করার কাজ চলছে। প্রস্তুত রয়েছে ১ হাজার ৩০০টি ক্লিনিক্যাল অক্সিজেন সিলিন্ডার। এসময় জানানো হয়, করোনা কালীন সময়ে এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের অক্সিজেনের ব্যবস্থা করা না গেলে রামেক হাসপাতালে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা দেয়া সম্ভভ হতো না। হাসপাতালে মৃতের সংখ্যা ভয়াবহ রূপ নিতো। এসময় রামেক হাসপাতাল নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রসংসা করা হয়।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নওশাদ আলী জানান, ১৯৫০ পরবর্তি সময়ে রোগের ধরণ এবং রোগির সংখ্যা এবং বর্তমান সময়ে রোগের ধরণ ও রোগির সংখ্যায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন জনসংখ্যা যেমন বেড়েছে তেমনি হাসপাতালে রোগির সংখ্যাও অনেক বেশি। রামেক হাসপাতারের জরুরী ও ক্যাজুয়ালটি বিভাগ বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ও কক্ষ রয়েছে। যা সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হচ্ছে। জরুরী বিভাগে রোগী আসলে যাতে সাথে সাথে ওয়ার্ডে না পাঠিয়ে জরুরী বিভাগে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে রেখে তার পর প্রয়োজনে নির্ধারিত ওয়ার্ডে পাঠানো সেভাবেই বিভাগটিকে স্বয়ংস্পূর্ণ ভাবে গতে তোলা হবে।
রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সাংসদ এবং রামেক হাসপাতালের ব্যাবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, শুধুমাত্র রোগীদের স্বার্থে হাসপাতালের ইমারজেন্সি (জরুরী বিভাগ) ও আউটডোর বিভাগ ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি আমরা এবং সেই অনুসারে কাজ শুরু করে দিয়েছি। শুধুতাই নয় হাসপাতালে ভর্তি রোগিদের সমস্ত প্যথলজিক্যাল টেস্ট হাসপাতালেই করা হবে, অত্যন্ত কম টাকায়। টেস্টের জন্য তাদেরকে কষ্ট করে হাসপাতালের বাইরে যেতে হবে না, কোন দালাল ধরা লাগবে না। তাছাড়া সমস্ত জরুরী ওষুধ আমরা যাতে রোগীদের দিতে পারি তার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।
পূর্বের যেকোন সময়ের চাইতে রামেক হাসপাতারের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে উল্লেখ করে সাংসদ বাদশা বলেন, আমি মনে করি বাংলাদেশের অন্যান্য হাসপাতালের তুলনায় রামেক হাসপাতালের পারফরমেন্স অনেক ভালো। করোনা মহামারির মধ্যে রোগিদের যে চিকিৎসা সেবা আমরা দিয়েছি তাই এর প্রমাণ। আমাদের আইসিইউ ছিল কম, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম ছিল কম। এখন ৬০০ এর উপরে রোগিদের বেডে রেখে সেন্ট্রাল অক্সিজেন দিতে পারছি। এর বাইরে ১ হাজার ৩০০ ক্লিনিক্যাল অক্সিজেন সিলিন্ডাল প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরও জানান, রাজশাহীর চিকিৎসা ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করার জন্য সদর হাসপাতাল চালু করা হবে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে। সেখানে ২০০ রোগিকে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সহ চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে। থাকবে আইসিইউ বেডের সুবিধাও।

আগস্ট ১২
০৫:০৫ ২০২১

আরও খবর

[TheChamp-FB-Comments]