Daily Sunshine

ধর্ষণচেষ্টার পরীমনির মামলায় ব্যবসায়ী নাসিরসহ গ্রেপ্তার ৫

Share

সানশাইন ডেস্ক: ধর্ষণচেষ্টা, হত্যাচেষ্টা ও মারধরের অভিযোগে চিত্রনায়িকা পরীমনির করা মামলার দুই আসামি ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও অমিসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। উত্তরা ক্লাবের সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দিন মাহমুদ (৫০) ঢাকা বোট ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য (বিনোদন ও সংস্কৃতি)। গত ৮ জুন রাতে বোট ক্লাবেই নাসির ‘ধর্ষণের চেষ্টা’ করেন বলে মামলায় অভিযোগ করেছেন পরীমনি।
ঢাকার পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সোমবার বলেন, “ঢাকা মহানগরের গোয়েন্দা পুলিশ নাসির উদ্দিন মাহমুদকে অ্যারেস্ট করেছে।” আগের দিন রাতে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ জানানোর পর সোমবার সকালে সাভার থানায় ছয়জনের বিরুদ্ধে ওই মামলা দায়ের করেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। পরে উত্তরায় অভিযান চালিয়ে একটি বাসা থেকে নাসির ও অমিসহ পাঁচজনকে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপ কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ঢাকা জেলা পুলিশের একটি দল উত্তরায় নাসির মাহমুদের বাসায় অভিযান চালায়। ওই দলটিকে সহায়তা করতে উত্তরা বিভাগের একটি দলও সেখানে গিয়েছিল। কিন্তু সেখানে নাসিরকে পাওয়া যায়নি। পরে উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডে অমির ভাড়া করা বাসায় অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার মশিউর রহমানের নেতৃত্বে ওই অভিযানে বেশ কিছু মদ ও ইয়াবা জব্দ করা হয়।
অভিযান শেষে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (উত্তর) যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, নাসির ও অমি ছাড়াও তিন নারীকে ওই বাসা থেকে আটক করা হয়েছে। “নাসিরের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ আছে বলে আমরা জেনেছি। এ ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এরপর কেউ কোন অভিযোগ করলে তা গুরুত্ব দেওয়া হবে।” তদন্তের জন্য পুলিশ বোট ক্লাবে যাবে এবং অন্য যারা আসামি আছে, তাদের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান যুগ্ম কমিশনার হারুন।
তিনি বলেন, “৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরসঙ্গে আরও কারা জড়িত, আরও কোনো রাঘব বোয়াল আছে কিনা, যারা রাতের আঁধারে বিভিন্ন ধরনের ক্লাবে উঠতি বয়সী নারীদের নিয়ে অসামাজিক কার্যকলাপ চালায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এক প্রশ্নের উত্তরে হারুন বলেন, “যাদেরকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি তাদের কাজই মদের ব্যবসা করা। তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ সে ছোট ছোট মেয়েদের রক্ষিতা রাখেন, মদের ব্যবসা করেন। যদিও আমরা তদন্ত করছি, এ ধরনের অভিযোগ সত্য কিনা।
“যেহেতু অভিযান চালিয়েছি, মাদক ও অবৈধ আইটেম পেয়েছি। আমরা আরও মামলা করব, পরে সাভার থানার মামলায় এরেস্ট দেখানো হবে। অন্য কেউ যদি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করে, সেগুলোর তদন্ত করব।” পরে ডিবি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গ্রেপ্তার তিন নারীর পরিচয় প্রকাশ করেন গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ।
তিনি বলেন, “গ্রেপ্তার নারীরা নাসির বা অমির স্ত্রী নয়; তাদেরকে মাসিক টাকা দিয়ে আমোদ ফুর্তি করার জন্য রাখা হয়েছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে।” উত্তরার ওই বাসা থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিদেশি মদ-বিয়ারের পাশাপাশি এক হাজার ইয়াবা উদ্ধারের কথা জানিয়ে গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে আরও দুটো মামলা করা হবে।
রোববার রাতে এক ফেইসবুক পোস্টে হত্যাচেষ্টা ও ধর্ষণচেষ্টার ওই অভিযোগ সামনে আনেন দুই ডজন চলচ্চিত্রে নায়িকার চরিত্র রূপায়ন করা পরীমনি। সেখানে তিনি লেখেন, “আমি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমাকে রেপ এবং হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।” পুলিশে জানিয়ে ফল পাননি জানিয়ে ওই ফেইসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চান এই অভিনেত্রী। পরে রাতে বনানীতে নিজের বাসায় তিনি সাংবাদিকদের সামনে সেই রাতের ঘটনার বিবরণ দেন এবং ঢাকা বোট ক্লাবের নাসির উদ্দিন মাহমুদের নাম বলেন।
রূপনগর থানার ওসি আরিফুর রহমান সরদারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল মধ্যরাতে পরীমনির বাসায় গিয়ে ঘটনার বিবরণ শোনেন। বোট ক্লাব যেহেতু বিরুলিয়ায় সাভার থানার আওতায় পড়েছে, সেহেতু সোমবার সকালে সাভার থানায় মামলা দায়ের করেন পরীমনি। নাসির উদ্দিন মাহমুদকে (৫০) প্রধান আসামি করে ওই মামলায় ২ নম্বর আসামি করা হয় অমি নামে ৪০ বছর বয়সী একজনকে, যিনি পরীমনির কস্টিউম ডিজাইনার জিমির ‘পরিচিত’ বলে আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন এই অভিনেত্রী।
মামলার ছয় আসামির মধ্যে বাকি চারজনকে এজাহারে দেখানো হয় ‘অজ্ঞাতনামা’ হিসেবে, যারা প্রধান আসামিকে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরীমনি তার মামলায় বলেছেন, গত বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কস্টিউম ডিজাইনার জিমি ও অমির সঙ্গে দুটো গাড়িতে করে তারা উত্তরার দিকে যান। তার ছোটবোনও সে সসময় সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু অমি ‘পরিকল্পিতভাবে’ তাকে বোট ক্লাবে নিয়ে যায়।
সেখানে নাসির উদ্দিন মাহমুদ ‘জোর করে মদ খাওয়ানোর চেষ্টা’ করেন এবং এক পর্যায়ে‘ধর্ষণের চেষ্টা’ করেন বলে অভিযোগ করেছেন পরীমনি। মামলার আসামিরা বিভিন্ন মাধ্যমে ‘ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দিচ্ছে’ বলেও এজাহারে অভিযোগ করেছেন তিনি। আগের দিন রাতের সংবাদ সম্মেলনে পরীমনি বলেছিলেন, সেদিন বোটক্লাব থেকে ছাড়া পেয়ে বনানী থানায় গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মুখে মদের গন্ধ থাকায় পুলিশ কর্মকর্তারা তার কথা শুনতে চাননি। এক পর্যায়ে পুলিশ তাকে ওয়াশ করার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। সেখান থেকে তিনি বাসায় চলে যান।
যেখানে ওই ঘটনা ঘটেছে, সেই ঢাকা বোট ক্লাবের সভাপতি পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ। তার কাছে নালিশ দিতে গিয়ে সফল হননি বলেও সংবাদ সম্মেলনের দাবি করেন পরীমনি। এ বিষয়ে রোববার রাতে পুলিশ প্রধান বেনজীর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তখন এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেছিলেন, “পুলিশের সাথে যোগাযোগ করলে অবশ্যই তার এ(অভিযোগের) বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
“তবে তিনি আইজিপি স্যারের নাম কেন উল্লেখ করলেন, তা স্পষ্ট নয়। আইজিপি মহোদয়ের সাথে তিনি কোনো যোগাযোগ করেননি।” গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে অমির বাসায় কয়েকটি টেলিভিশনের সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেন আবাসন ও ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িত নাসির ইউ মাহমুদ। ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করে, সেই রাতে পরীমনিরা বোট ক্লাবে গিয়ে কাউন্টার থেকে ‘জোর করে দামি ড্রিংকস’ নেওয়ার চেষ্টা করেন।
“তারা তো নিতে পারে না, তারা তো মেম্বার না। আমি জাস্ট তাদের বাধা দিয়েছে, এটা নেওয়া যাবে না। এটা বিক্রিযোগ্য না। এরপরই সে উত্তেজিত হয়ে যায়। তারপর সে আমাকে গালাগালি শুরু করে। আমার স্টাফরা তাকে থামানোর চেষ্টা করে।” কার কথা বলছেন- এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে বোট ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য (বিনোদন ও সংস্কৃতি) নাসির বলেন, “ওই পরীমনি। ওই ঘটনার আগ পর্যন্ত তাকে আমি চিনতাম না। ওই সময় আমি তাকে থামাতে চেষ্টা করি। তার সঙ্গে যে ছেলে ছিল সে আমাকে চড় থাপ্পড় দেয়, ও (পরীমনি) গ্লাস মারলে আমার ঘাড়ে লাগে।
“এই অবস্থায় আমার সিকিউরিটিদের আমি নির্দেশ দিই, সিকিউরিটিরা তাকে নিয়ে যায়। ততক্ষণে সে অনেক ড্রিংক করে ফেলেছে। সিসি ক্যামেরায় দেখবেন ড্রিংক করা অবস্থায় গাড়িতে উঠতে পারছে। পরের দিনই আমাদের ক্লাবের নিয়ম অনুযায়ী রিপোর্ট করা হয়েছে। আমাদের স্টাফরা লিখিতভাবে সমস্ত রিপোর্ট দিয়েছে। রিপোর্টে স্পষ্ট, আমার সঙ্গে তার কিছুই হয়নি।” উত্তরা ক্লাবের সাবেক সভাপতি নাসির ইউ মাহমুদকে মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে।
আবাসন ব্যবসায় যুক্ত নাসির ইউ মাহমুদ কুঞ্জ ডেভেলপারস লিমিটেডের চেয়ারম্যান এবং মাহমুদ বিল্ডার্স অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লিমিটেডের এমডি। কুঞ্জ ডেভেলপারসের ওবেসাইটে নাসিরের ছবিসহ একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া ছিল, যা পরীমনির মামলা হওয়ার পর সরিয়ে ফেলা হয়। তবে ওয়েবক্যাশে এখনও তথ্যগুলো রয়েছে। ওয়েবসাইটের তথ্যে বলা হয়েছে, ১৯৮১-৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল সায়েন্স বিভাগে পড়ার সময় এসএম হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নাসির ইউ মাহমুদ। এখন তিনি জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৫ সাল থেকে তিন বছর উত্তরা ক্লাবের সভাপতি ছিলেন নাসির। বাংলাদেশ অ্যাসেসিয়েশন অব কন্স্ট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) নির্বাহী কমিটিতেও ছিলেন এক সময়। এক সময় তার প্রথম বিভাগে ঢাকার ফুটবল লিগে খেলার এবং লায়নস ক্লাবে যুক্ত থাকার কথাও ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে। তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কথা বলতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
উত্তরে তিনি বলেন, “পার্টির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নাসির ইউ আহমেদ দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তার বিষয়ে আলোচিত এ ধরনের ঘটনার মত নেতিবাচক কোনো ঘটনা আগে ঘটেনি। তারপরও দলের জ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলে প্রেসিডিয়াম সদস্যের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

জুন ১৫
০৬:০৩ ২০২১

আরও খবর