Daily Sunshine

রাজশাহীতে আরও ১৫ জনের মৃত্যু

Share

স্টাফ রিপোর্টার : দিনে দিনে ‘হটস্পট’ হয়ে উঠা উত্তরের বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে করোনা সংক্রমন ও মৃত্যু বাড়ছেই। ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সংখ্যা। চলমান পরিস্থিতিতে রাজশাহীর অঞ্চলের ঘরে ঘরে করোনা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় শুক্রবার থেকে সর্বাত্মক লকডাউন শুরু হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে ট্রেনযাত্রা, বন্ধ রয়ছে সব ধরণের গণপরিবহন।
এদিকে করোনা আক্রান্ত হয়ে রাজশাহীতে আরও ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় তাদের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে রাজশাহীর আটজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ছয়জন ও নাটোরের একজন। বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময় তারা মারা যান বলে জানান হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস।
তিনি জানান, মৃত ১৫ জনের মধ্যে সাতজন করোনা শনাক্ত হওয়ার পর মারা যান। বাকিরা মারা যান নমুনা পরীক্ষার আগে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। আর করোন শনাক্ত সাতজনের মধ্যে রাজশাহীর চারজন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুইজন ও নাটোরের একজন।
ডা. সাইফুল জানান, চলতি মাসের গত ১১ দিনে এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেছেন ১০৮ জন। এর মধ্যে ৬৩ জনই মারা গেছেন করোনা শনাক্ত হওয়ার পর। বাকিরা উপসর্গ নিয়ে মারা যান। এছাড়া গত ২৪ মে থেকে সর্বশেষ শুক্রবার পর্যন্ত ১৯ দিনে শুধু রামেক হাসপাতালেই মারা গেছেন ১৫৭ জন। ক্রমাগত মৃত্যুর মিছিল আর উচ্চহারে সংক্রমন ভাবিয়ে তুলেছে রাজশাহীর মানুষকে।
রামেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল জানান, গত ২৪ ঘন্টায় করোনা ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন আরও ৪৩ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ২২, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১১, নওগাঁ সাত, নাটোরের একজন, পাবনা একজন ও মেহেরপুর একজন। একই সময় সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৫ জন।
তিনি জানান, শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত করোনা ওয়ার্ডের ২৭১ শয্যার বিপরিতে রোগি ভর্তি রয়েছেন ২৯৭ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ১৪২, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১১০, নওগাঁর ২৪, নাটোরের ১৫, পাবনার ৩, কুষ্টিয়ার ৩ জন। আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন ১৮ জন।
শুক্রবার বেলা ১১ টায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ও আইসিইউ ওয়ার্ডের বাইরে গিয়ে দেখা যায়, সর্বত্র বিরাজ করছে থমথমে নীরবতা। বুকফাটা কান্না আর স্বজন হারানোর আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে সর্বত্র।
কারও চোখ দিয়ে অঝরে পানি ঝরলেও বের হচ্ছে না শব্দ। কোথাও থেকে আবার ভেসে আসছে গোঙানির আওয়াজ! কেউ চোখের পানি মুছতে মুছতে আবার কেউ বুকফাটা কান্নার রোল তুলে সদ্য মৃত্য স্বজনের নিথর লাশ নিয়ে আহাজারি করতে করতে হাসপাতাল এলাকা ত্যাগ করছেন।
করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায়, বিশেষ করে গেল ঈদের পর উদ্বেগজনক হারে রোগী বেড়েছে। প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। গেল কয়েকদিনে মৃত্যুও রেকর্ড ভেঙেছে প্রতিদিনই। এ অবস্থায় হাসপাতালে করোনা রোগী বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা দিতে হিমশিম অবস্থা। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে অনেকটাই বিপর্যস্ত এই হাসপাতাল। চিকিৎসকরা বলছেন, এভাবে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হতে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
করোনা রোগীদের পাশে থাকা স্বজনরা বলছেন, হঠাৎ করে রোগীর শরীরে কমে যায় অক্সিজেন লেভেল ও রক্তচাপ। অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় হৃদস্পন্দন। ঘনঘন শ্বাস নেওয়ার চেষ্টায় রোগী আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে অক্সিজেনের অভাবে রোগীর মৃত্যু হয়।
হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ডে অন্তত ২০ জন রোগীকে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার রানা-উল-ইসলাম। তিনি করোনা আক্রান্ত নানা ও মামার দেখাশোনা করতে করোনা ওয়ার্ডে থাকছিলেন।
রানা বলেন, অক্সিজেনের অভাবে মানুষের মৃত্যু কতটা নির্মম তা অবর্ণনীয়। অনেক রোগীকে দেখেছেন অক্সিজেনের লেভেল আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। অক্সিজেনের অভাবে পুরো শরীর লাফাচ্ছে। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে অনেকেই মারা যাচ্ছে চোখের সামনে, কিছু করার উপায় নাই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে রহমত উল্লাহ তার বাবা শফিউল্লাহকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট তার বাবার। ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলেন না। এদিকে জরুরি বিভাগের সামনে দীর্ঘলাইন। সিরিয়াল অনুযায়ী চলছে ভর্তির কাজ। অনেক কষ্টে তার বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করালেন। ভর্তির সময়ই অক্সিজেন লেভেল ৮০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
রহমত উল্লাহ বলেন, সকাল থেকে তার বাবার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। চার দিন আগে করোনা ধরা পড়লেও তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। হঠাৎ করে অক্সিজেন লেভেল আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।
রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন করোনা পজিটিভ বা উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তি হচ্ছেন। তাদের অধিকাংশই অক্সিজেন সমস্যা প্রকট বলেই হাসপাতালে আসছেন। দেরিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মৃত্যুর বেড়ে যাওয়ার অন্যতম একটি কারণ।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, করোনা আক্রান্ত রোগীরা অনেক দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। দেরি করে ফেলায় মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে। ঈদের পর থেকে করোনা রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে চিকিৎসা দিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, মূলত যাদের অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাচ্ছে তারাই হাসপাতালে ভর্তি হতে আসছেন। ফলে শতভাগ রোগীকেই অক্সিজেন দিতে হচ্ছে। সেন্ট্রাল লাইনে অক্সিজেন সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। পর্যাপ্ত সিলিন্ডার মজুদ রাখা হয়েছে। আরও একটি ওয়ার্ডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর কাজ চলছে। অক্সিজেনের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লিন্ডে বাংলাদেশের অক্সিজেন ভর্তি রিজার্ভ রাখা হয়েছে। তবে রোগী বাড়তে থাকলে অক্সিজেন নিয়েও সংকটে পড়তে হতে পারে।
সরেজমিনে রামেকে গিয়ে দেখা গেছে, অনেকেই দীর্ঘ লাইনে গাদাগাদি করে করোনা পরীক্ষার নমুনা দিতে আসছেন। তাদের অনেকের মাঝেই রয়েছে উপসর্গ। করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজনদের অনেকে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকছেন, বের হচ্ছেন। কেউবা ওষুধসহ জরুরি প্রয়োজনে রাজশাহী শহরেও যাচ্ছেন, মিশে যাচ্ছেন শহরের লোকজনের ভিড়ে। এদের আবার কেউ কেউ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের ফুটপাত থেকে কিনছেন খাবার, কেউ বা দোকানেই বসে খাচ্ছেন। ফলে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। খোদ রামেক হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ও কর্মকর্তারাই স্বীকার করেছেন এই ঝুঁকির কথা।
হাসপাতাল চত্বর ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে আসা লোকজনদের অধিকাংশই এসেছেন এই অঞ্চলের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে। তারা কর্তৃপক্ষের টাঙানো কোনো নির্দেশনার ধার ধারছেন না। নিরাপত্তাকর্মীদের মাইকিংয়ে কান দিচ্ছেন না অনেকেই।
এই পরিস্থিতিতে সংক্রমণ ঝুঁকির শঙ্কার কথা জানিয়েছেন রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস। তিনি জানান, তারা রোগী ও তাদের স্বজনদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাসপাতালে প্রবেশের নির্দেশনা দিচ্ছেন। সবার সুরক্ষায় হাসপাতালে আগমন ও বহির্গমন পথ আলাদা করে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন নির্দেশনা টাঙানো হয়েছে। মাইকিং করে লোকজনকে সচেতন করছেন হাসপাতালের কর্মীরা। কিন্তু কিছুতেই লোকজনকে এই নির্দেশনা মানানো যাচ্ছে না।
রামেক পরিচালকের ভাষ্য, ‘রামেকে রোগী ও তাদের অসচেতনতার জন্য আমরাও বেশ উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন যাপন করছি। প্রয়োজনের তুলনায় শয্যা না থাকায় রোগী ও স্বজনেরাও মানছে না নির্দেশনা। এই মুহূর্তে প্রয়োজন রামেকের বাইরে বিশেষায়িত হাসপাতাল। অন্যথায় ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে’।

জুন ১২
০৪:৩৪ ২০২১

আরও খবর