Daily Sunshine

বানেশ্বরে বেড়েছে বেচাকেনা আমের হাটে করোনার প্রভাব

Share

স্টাফ রিপোর্টার : মহামারী করোনার প্রভাব পড়েছে রাজশাহীর বৃহৎ আমের মোকাম পুঠিয়ার বানেশ্বর হাটে। করোনার কারণে এবার বানেশ্বরে ক্রেতা নেই। বাইরের ক্রেতা না আসায় আমের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না চাষিরা। একে তো আমের দাম নেই, তার ওপর ঢলন (ওজনে বেশি) দিতে দিতে দিশেহারা আমচাষি ও বাগান মালিকরা।
তারা বলছেন, করোনার কারণে বাইরের ক্রেতা হাটে আসছে না। এই সুযোগে আড়তদাররা দাম হাঁকছেন গড়পড়তা। ৪০ কেজিতে মণ হলেও তারা নিচ্ছেন ৪৮ কেজি করে। অর্থাৎ দাম দিচ্ছেন এক মনের (৪০ কেজি) কিন্তু নিচ্ছেন ৪৮ কেজি। এতে অনেক লোকসান হচ্ছে আমচাষিদের। প্রশাসনের চোখের সামনেই এসব কাণ্ড ঘটলেও কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। আড়তদারদের কাছে চাষিরা অসহায় হয়ে পড়েছেন।
এখন আমের ভরা মৌসুম। ফলে রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের হাট বানেশ্বর এখন আমে ভরা। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় আমের হাট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বানেশ্বর সরকারি কলেজ মাঠে। করোনাকালীন আমের হাট সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনায় আনতে এই উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
জানা গেছে, হাট ব্যবস্থাপনায় শোলা প্রথা বাতিল, ওজনে মেট্রিক পদ্ধতি অনুসরণসহ মৌসুমের শুরুতেই বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছিল উপজেলা প্রশাসন। এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে চাষি ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠকও হয়েছে। সেই বৈঠকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন।
ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ৪০ কেজির বাড়তি এক কেজিও আম নেবেন না আড়তদাররা। নিলে তার দাম পরিশোধ করতে হবে আম বিক্রেতাকে। কিন্তু ভরা মৌসুমে তা একেবারেই আমলে নিচ্ছেন না আড়তদাররা।
বাজারে বাড়তি আম নেওয়া রেওয়াজে পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বানেশ্বরের আমচাষি আশরাফুল ইসলাম। তিনি জানান, আড়তদাররা এক মণের দাম দিলেও ওজনে নিচ্ছেন ৪৮ কেজি। বাড়তি এই আট কেজির দাম দিচ্ছেন না। ক্যারেটের ওজন ধরছেন আরও তিন কেজি। সব মিলিয়ে ৫০ কেজি দিতে হচ্ছে। গত বছর আড়তদাররা ৪৬ কেজিতে মণ ধরেছিলেন। এবার বাড়িয়েছেন।
এলাকায় আড়তদাররা সিণ্ডিকেট গড়ে তাদের চাষিদের জিম্মি করেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় আম চাষি ও বাগান মালিকরা। তাদের ভাষ্য, আম নামানো, পরিবহন এবং বাজারে তুলতে তাদের মোটা টাকা খরচ হচ্ছে। কিন্তু করোনার কারণে বাজারে বাইরে থেকে পার্টি (পাইকার) আসছে না। স্থানীয় আড়তদাররা আম কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাচ্ছেন।
সুযোগ বুঝে তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। চাষিদের জিম্মি করে ইচ্ছে মতো ঢলন নিচ্ছেন। উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি জেনেও না জানার ভান করছেন। শনিবার বানেশ্বর আমের হাটের বিভিন্ন আড়ত ঘুরে এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, হিমসাগর বা খিরসাপাত আমে বাজার এখন ভরা। এই জাতের আম নামছে গত ২৮ মে থেকে। ২৫ মে থেকে নামছে লক্ষণভোগ বা লখনা আম। এখন প্রায় শেষের দিকে গোপালভোগ। এরইমধ্যে নামতে শুরু করেছে ল্যাংড়া।
বানেশ্বর আমের হাটে প্রতিমণ গোপালভোগ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকায়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গোপালভোগের বাজার চড়া বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। তবে হিমসাগর মিলছে এক হাজার ৪০০ টাকা থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা মণ দরে। আর ল্যাংড়া বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ এক হাজার ৪০০ থেকে দেড় হাজার টাকায়। লক্ষণভোগ বা লখনা আমের দাম নেই বললেই চলে। ডায়াবেটিক আম হিসেবে পরিচিত অপেক্ষাকৃত কম মিষ্টি জাতের এই আম বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে। বাজারে রয়েছে কিছু গুটিজাতের আম। সেগুলো বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা মণ দরে।
আমের এই দামে খুশি ক্রেতারা। তবে অসন্তুষ্ট আম চাষি ও বাগান মালিকরা। জেলার পুঠিয়ার জামিরা এলাকা থেকে বানেশ্বর হাটে আম বিক্রি করতে এসেছেন বাগান মালিক শাহ মোহাম্মদ। বাজারে আমের দাম না পেয়ে হতাশ তিনি।
এই আম চাষি জানিয়েছেন, বাজারে রকম ভেদে প্রতি মণ আম গত বছরের চেয়ে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে। এতে চাষি ও বাগান মালিক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। করোনার কারণে ক্রেতা না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আম সংরক্ষণ ও বিদেশে রফতানি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন এই আম চাষি।
একই ভাষ্য বানেশ্বরের কাপাশিয়া এলাকার আম চাষি আবুল কাশেমের। হাটের প্রবেশ মুখে ভ্যান ভর্তি ৫০ ক্যারেট খিরসাপাত আম রেখে পাশের একটি গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। চোখে মুখে তার হতাশার ছাপ। এই আম চাষি জানান, তার প্রায় ১০ বিঘা আমের বাগান রয়েছে। গোপালভোগ শেষ। এখন নামছে খিরসাপাত। গাছেই পাকছে আম, কিন্তু বাজারে দাম নেই। গাছে আম রাখার উপায়ও নেই।
তবে এ পরিস্থিতিতে কিছুই করার নেই বলে জানিয়েছেন রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কে জে এম আবদুল আওয়াল। তিনি বলেন, রাজশাহীর করোনা পরিস্থিতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চেয়ে খারাপ। কিন্তু আম বাণিজ্যের কথা ভেবে কঠোর লকডাউনে যাচ্ছে না প্রশাসন। ভোক্তারা একান্ত প্রয়োজন না হলে বাড়ির বাইরে বের হচ্ছেন না। ফলে খোলা বাজারে আমের ক্রেতা কমে গেছে। একই কারণে বাজারে আমের চাহিদাও কম। এ জন্যই পাইকারি ক্রেতারাও তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তাছাড়া আম কিনতে যারা রাজশাহীতে আসতেন করোনার কারণে তারাও এখন আর সেইভাবে আসছেন না। এর প্রভাব পড়ছে পুরো অঞ্চলের আম কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে।
আবদুল আওয়াল বলেন, দেশে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদনে সেইভাবে নীতিমালা নেই। গুড এগ্রিকালচার প্রসেসের আওতায় স্থানীয়ভাবে কিছু চাষি সংঘবদ্ধ হয়ে রফতানিযোগ্য আম উৎপাদন করছেন। বাঘা উপজেলার এমনই একটি গ্রুপ এ বছর ৩৩০ টন আম ইউরোপে রফতানির টার্গেট নিয়েছে। মূলত হিট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট দিয়ে এই আম বিদেশে যাচ্ছে। রফতানিযোগ্য এই আমের দেশীয় বাজারও রয়েছে। এই বাজার দিন দিন বাড়ছে।
এদিকে আমের হাটে ঢলনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বানেশ্বর হাটের ইজারাদার উসমান আলী। তিনি জানান, বাড়তি ওজন যেন কেউ না নেন বা দেন সেজন্য মৌসুমের শুরুতে সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত পরে সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এখনো এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তবে জনস্বার্থে এই সিদ্ধান্ত কেন বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুহাম্মদ শরিফুল হক।
তিনি বলেন, আসলে এটি স্থানীয় প্রথায় পরিণত হয়েছে। কৃষকদের স্বার্থে এই প্রথা বাতিল করা হয়। কিন্তু তারপও এই প্রথা কেন ফিরল তা খতিয়ে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জুন ০৮
০৭:৩০ ২০২১

আরও খবর