Daily Sunshine

রামেক হাসপাতালে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে

Share

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনার সংক্রমণ বেড়েই চলেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনা পরিস্থিতি নাজুক হওয়ায় মঙ্গলবার থেকে সাত দিনের জন্য সর্বাত্মক ‘লকডাউনে’র ঘোষণা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। কিন্তু ওই জেলার করোনা রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে। ফলে করোনা আরও বেশি ছড়িয়ে পড়া ও আক্রান্তের ঝুঁকিতে রয়েছেন রাজশাহীবাসী।
জানা গেছে, মঙ্গলবার রাজশাহীর দুটি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষার পর ১৮২ জনের করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে রামেক হাসপাতাল ল্যাবে ৯৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১১ জনের রিপোর্ট পজিটিভ আসে। আর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ল্যাবে ৩৫৩ জনের নমুনা পরীক্ষার পর পজিটিভ এসেছে ১৭১ জনের। রাতে তাদের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
মঙ্গলবার রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস বলেন, রাজশাহীর দুটি ল্যাবে আজ মোট ৪৪৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করানো হয়েছে। এর মধ্যে ১৮২ জনের নমুনায় করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, রাজশাহী জেলায় ২৩৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৫১ জনের শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া গেছে। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২১২ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৩১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। ল্যাব দুটিতে ২৬৫ জনের নমুনা নেগেটিভ এসেছে।
এদিকে মঙ্গলবার রামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনজন করোনা আক্রান্ত রোগির মৃত্যু হয়েছে। উপ-পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, এদের মধ্যে একজন ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে মারা যান। আর ২২ ও ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে আরো একজন করে মারা গেছেন। তিনজনের মধ্যে দুইজনের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। আর অপরজন রাজশাহীর।
ডা. সাইফুল জানান, হাসপাতালের আইসিইউসহ করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৬২ জন রোগি। এদের মধ্যে আইউসিইউতে ভর্তি রয়েছেন ১৪ জন। বুধবার সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩০ জন করোনা আক্রান্ত রোগি। এদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৫ জন ও রাজশাহী ১০ জন। বাকি পাঁচজন নওগাঁ ও নাটোরের।
এর আগে সোমবার দুপুর থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালে চারজন করোনা আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে দুইজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের, একজন রাজশাহীর ও একজন পাবনার। এদের মধ্যে একজন মারা যান আইসিউতে। বাকি তিনজন মধ্যে ১৬, ২২ ও ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে একজন করে মারা যান।
তার আগের দিন ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে চারজনের করোনা পজিটিভ। বাকি ছয়জন করোনা পরীক্ষার আগে মারা যান। এদের মধ্যে আইসিইউতে চারজন, ১৬ নং করোনা ওয়ার্ডে তিনজন, ২৯ নং করোনা ওয়ার্ডে একজন ও ২২ নং করোনা ওয়ার্ডে দুইজন মারা গেছেন।
নিহতদের মধ্যে রাজশাহী জেলার সাতজন। এর মধ্যে দুর্গাপুর, বাঘা ও গোদাগাড়ী উপজেলার একজন করে চারজন এবং নগরীর তিনজন। অপর তিনজনের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা ও নওগাঁর একজন করে।
এদিকে, বুধবার দুপুরে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, মঙ্গলবার বিভাগের আট জেলায় ২৭৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৫৯ জন। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী ৩৯ জন। এছাড়াও বগুড়ার ২৬, নওগাঁর চার, নাটোরের নয়, জয়পুরহাটের ১০, সিরাজগঞ্জের আট ও পাবনার ২০ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।
এর আগে, সোমবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮২ জনের দেহে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আর রাজশাহীতে ৫৪ জন। এই দুই জেলার আক্রান্তদের বেশিরভাগ চিকিৎসা নিচ্ছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।
মঙ্গলবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৫৪ জন করোনা রোগীর মধ্যে ৮৬ জন চাঁপাইনবাবগঞ্জের এবং ৪৮ জন রাজশাহীর। এদের মধ্যে ১৪ জন আইসিইউতে রয়েছেন। যাদের বেশীরভাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের। সেখানকার রোগিদের শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছে বলে জানান হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী।
তিনি জানান, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চারজন করোনা আক্রান্ত রোগির মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে দুইজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের, একজন রাজশাহীর ও একজন পাবনার। এ নিয়ে গত তিনদিনে এই হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ১৯ জনের মৃত্যু হয়। আর গত ১ মার্চ মাস থেকে এ পর্যন্ত এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭১ জন করোনা আক্রান্ত রোগী ও ১১২ জন করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন।
বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী, করোনার প্রথম ধাপে হাসপাতালে সর্বোচ্চ রোগি ছিল ৯৬ জন। কিন্তু দ্বিতীয় ধাপে সর্বোচ্চ রোগি বেড়ে দাড়ায় ১৩৬ জনে। ঈদের আগে সেটি কমে এসেছিল ৭১ জনে। কিন্তু ঈদের পর থেকে করোনা রোগি বাড়তে থাকে। যা একদিনে ১৬৮ জনে দাঁড়ায়। তবে রোগিদের বেশীর ভাগই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা।
তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে শনাক্তের হার ৫৫ ভাগ। তবে কম নয় রাজশাহীতেও। বর্তমানে রাজশাহীতে শনাক্তের হার ৪৫ ভাগ। করোনা আক্রান্ত রোগিদের চিকিৎসায় হাসপাতালে আরও একটি ওয়ার্ড বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে পাঁচটি ওয়ার্ডে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও আরও একটি ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সোমবার মধ্যরাত থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাতদিনব্যাপী সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। লকডাউনের জন্য সাতদিন আগেই আমরা সুপারিশ করেছিলাম।
রাজশাহীতেও লকডাউন প্রয়োজন বলে উল্লেখ্য করে শামীম ইয়াজদানী বলেন, এখানে বর্তমানে লকডাউন দেয়া না গেলেও স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নয়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
কারণ যে হারে হাসপাতালে রোগি ভর্তি হচ্ছে এ ভাবে চলতে থাকলে কয়েকদিনের মধ্যে আমাদের ক্যাপাসিটির বাইরে চলে যাবে। সে ক্ষেত্রে সদর হাসপাতাল চালুর জন্য সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। যেহেতু সেখানে অক্সিজেন লাইন নেয় সেক্ষেতে সেখানে সাধারণ রোগিগুলো রাখার ব্যবস্থা করা যাবে।
তিনি বলেন, রাজশাহীর রোগিদের চেয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রোগিদের অবস্থা দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ফলে করোনা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ভারতীয় ধরন আছে কি না তা পরীক্ষা করতে ৪৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরএ পাঠানো হয়েছে। তবে ফলাফল এখনো পাওয়া যায়নি। তাদের নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পেলে এ বিষয়ে পরিবর্তি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. কাউয়ুম তালুকদার বলেন, রাজশাহীর সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোন মানুষ রাজশাহী আসবে না। রাজশাহীর কেউ চাঁপাইনবাবগঞ্জে যেতে পারবে না।
এছাড়াও করোনার সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে প্রতিটি উপজেলাতে মাইকিং করে প্রচার চালানো হচ্ছে। এর পরও যদি করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসে তখন পরবর্তি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তিনি বলেন, রাজশাহী সদর হাসপাতাল এখন বন্ধ রয়েছে। সেটি চালু করে করোনা ইউনিট করার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। অনুমতি পেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

মে ২৭
০৫:৫৫ ২০২১

আরও খবর