Daily Sunshine

ঘূর্ণিঝড় ইয়াস: আবারও সুরক্ষা দেবে সুন্দরবন?

Share

সানশাইন ডেস্ক: যে পথ ধরে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস এগোচ্ছে, তাতে বাংলাদেশে আঘাত এলেও সুন্দরবন আবারও সুরক্ষা প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে বলে আশা করছেন বন সংরক্ষক ও পরিবেশবিদরা। তবে পূর্ণিমার কারণে উঁচু জলোচ্ছ্বাস হলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বনের জীব-বৈচিত্র্য অতীতের মতো এবারও ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন তারা।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ গতিবেগ বাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলের দিকে। এখন পর্যন্ত ঝড়ের যে গতিপথ, তাতে বাংলাদেশে তা সরাসরি আঘাত করবে না বলে পূর্বাভাস দিচ্ছেন আবহাওয়াবিদরা। তবে পূর্ণিমার জোয়ারের সময় ঝড়টি উপকূলে আছড়ে পড়লে উঁচু জলোচ্ছ্বাস হতে পারে, তাতে আবাস হারাতে পারে সুন্দরবনের অনেক প্রাণী।
ভারতের কলকাতার আঞ্চলিক আবহাওয়া কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবারই ঘূর্ণিঝড় ইয়াস আরও শক্তি বাড়িয়ে ‘অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে’ রূপ নেবে, যা বুধবার ভারতের ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে পৌঁছাবে। তখন বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ হতে পারে ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত।
কিছুটা দুর্বল হয়ে ঘূর্ণিঝড়টি বুধবার দুপুর নাগাদ পশ্চিমবঙ্গের সাগর দ্বীপ ও ওড়িশার পারাদ্বীপের মাঝামাঝি এলাকা দিয়ে উপকূল পেরিয়ে স্থলভাগে উঠে আসতে পারে। তখন বাতাসের বেগ ঘণ্টায় ১৬৫ কিলোমিটারে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঝড় যদি বাংলাদেশে সরাসরি আঘাত নাও করে, দেশে উপকূলীয় অঞ্চল এ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব বলয়ে থাকবে। ফলে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সুন্দরবনের দিকে তাকাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
‘সিডর’, ‘আইলা’, ‘বুলবুল’, ‘আম্পানের’ মত এবারও সুন্দরবন ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ মোকাবেলায় প্রথম প্রতিরক্ষার কাজ করবে বলে মনে করেন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মঈনুদ্দিন খান। “বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস আঘাত হানলে সেটা সুন্দবনের দ্বারা প্রতিহত হবে বলে আমরা আশা করছি। তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশকে আগলে রাখতে হবে বলে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ কারণে বনে যারা জীবিকা নির্বাহ করে- মৌয়াল, জেলে এদের প্রবেশ আমরা ব্ন্ধ করে দিয়েছি। নতুন করে কেউ যেন বনে ঢুকতে না পারে বা যারা বনে আছে, তারা যেন ফিরে আসে; সে নির্দেশ দিয়েছি।”
দেশের বন্দরগুলোতে মহাবিপদ সংকেত জারি হলে বনকর্মীদের নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। প্রথম ধাপে তীব্র গতির বাতাসকে বাধা দিয়ে ঘূর্ণিঝড়কে দুর্বল করার কাজটি করে সুন্দরবন। সুন্দরবনে বাধা পেয়ে ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের গতিবেগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি জলোচ্ছ্বাসের ঢেউয়ের উচ্চতাও কমে আসে।
মঈনুদ্দিন খান বলেন, “সুন্দরবন ও খুলনা অঞ্চলে ‘ইয়াস’ সরাসরি আঘাত না করলে ম্যানগ্রোভ বনটি ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা অনেকটাই ঠেকিয়ে দেবে। তাতে বাংলাদেশের উপকূলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কম হবে।”
তবে এবার পূর্ণিমার সময় ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়লে সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্য ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন তিনি।
“যেহেতু পূর্ণিমার সময় ইয়াস আঘাত হানবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাই জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা অনেক বেশি বেড়ে যেতে পারে। যদি বেশি উঁচুতে জ্বলোচ্ছ্বাস আসে, তাহলে বন্যপ্রাণিদের আবাসস্থল হারানোর আশঙ্কা আছে। “সিডরের মতো যদি জ্বলোচ্ছ্বাস আসে, তাহলে সেটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক হবে। অনেক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হলে বন্যপ্রাণীরা উঁচু আশ্রয়স্থলগুলো হারাবে। অনেক বন্যপ্রাণী হয়ত মারা যাবে।”
ইয়াস বাংলাদেশে ‘বড় ধরনের আঘাত হানবে না’ এমন পূর্বাভাস পেলেও সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে বলে জানান এই বন সংরক্ষক। ব্র্যাকের হিউম্যানেটেরিয়ান প্রোগ্রামের পরিচালক সাজেদুল হাসান মনে করেন, ঘূর্ণিঝড়টি কোনো কারণে গতিপথ পরিবর্তন করলে সুন্দরবন, মানুষ ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনবে।
“এটা একেবারে সুন্দরবনে আঘাত হানলে বনের ক্ষতি হবে। বিভিন্ন প্রজাতির জীব-জন্তুর ওপর আঘাত হানতে পারে। কিন্তু আম্পানের মতো আরেকটু ডানদিকে ঘেঁষে খুলনা বা সাতক্ষীরা অঞ্চলে গেলে এটি জনপদের ওপর আঘাত হানবে।” ঘূর্ণিঝড়ে ঢাল হিসেবে মানবিক বিপর্যয় ঠেকিয়ে সুন্দরবন যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সে তথ্যও উল্লেখ করেন তিনি।
সাজেদুল হাসান বলেন, “এবারে যেটি বলা হচ্ছে, ‘ইয়াস’ যখন আঘাত হানবে, তখন পূর্ণিমা থাকবে। আর পূর্ণিমা থাকলে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস কয়েক ফুট বৃদ্ধি পাবে। সেখানে একটা ঝুঁকি আছে। “সুন্দরবনে যখন আঘাত হানবে, তখন গাছপালা নষ্ট হবে, জীবজন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু সুন্দরবনের পাশের অঞ্চলগুলো যেমন- সাতক্ষীরা, শ্যামনগরে যদি আঘাত হানে, তাহলে সেখানকার মানুষ ও অবকাঠামোর ওপর প্রভাব পড়বে।”
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের যুগ্ম-সম্পাদক মিহির বিশ্বাস মনে করেন, পূর্বাভাস অনুযায়ী এবারের ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পানের’ মতো তীব্র না হলেও এর যে প্রভাব পড়বে তা থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করবে সুন্দরবন। “ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ভারতের উপর দিয়ে চলে গেলেও আমাদের এখানে যে ঢেউটা আসবে, যে আঘাতটা আসবে; সেটা মোকাবেলা করবে সুন্দরবন। সুন্দরবনকে রক্ষাকবচ হিসেবে আমরা মনে করি।”
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আর মানুষের কারণে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জানিয়ে গত কয়েক বছর ধরেই পরিবেশবাদীরা এর সুরক্ষার দাবি জানিয়ে আসছেন। সুন্দরবন যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলের মানুষ ও সম্পদকে প্রাচীর হয়ে রক্ষা করে তা স্মরণ করিয়ে পরিবেশবিদ মিহির বিশ্বাস বলেন, “সুন্দরবনে শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদ বেশি। মনুষ্যসৃষ্ট বাধার ফলে সুন্দরী, গেওয়া, গোলপাতা- এই উদ্ভিদগুলোর বেঁচে থাকা মুশকিল।
“শ্বাসমূল যেহেতু উপরে থাকে, সেখানে বেশি মানুষজন হাঁটাচলা করলে গাছগুলোর ক্ষতি হয় এবং বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। গাছ কাটা, পোড়ানো, মানুষের বিচরণ, জালের আঘাত, নৌকার আঘাতেও শ্যাওলা-গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।” মানুষের অতিরিক্ত বিচরণে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ নষ্ট হবে দাবি করে এই পরিবেশবিদ বলেন, “সুন্দরবনে বিচরণের ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করেই আমাদের সুন্দরবনে যেতে হবে।”
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মঈনুদ্দিন খান জানান, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে লকডাউনের কারণে পর্যটকদের বিচরণ না থাকায় বন এখন অনেক বেশি সুরক্ষিত আছে। তিনি বলেন, “সুন্দরবনের অবস্থানটাই এমন। উপকূলভাগের কিছু গাছপালা হয়তো নষ্ট হবে। ঝড়ের তাণ্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু তারপরও যে গতিতে ঘূর্ণিঝড়টা আসে, সেই গতিটা কমিয়ে দেয় সুন্দরবন। আমরা আশা করছি, এবারও সুন্দরবনের কারণে আমরা রক্ষা পাব।”

মে ২৬
০৬:৩৪ ২০২১

আরও খবর