Daily Sunshine

সাংবাদিক রোজিনা কারাগারে

Share

সানশাইন ডেস্ক: সরকারি নথি সরানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে গাজীপুরে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ৩টার দিকে একটি প্রিজন ভ্যানে করে তাকে সেখানে নেওয়া হয় বলে এ কারাগারের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
সরকারি নথি ‘চুরির চেষ্টার’ অভিযোগে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের এক কর্মকর্তার কক্ষে গত সোমবার রোজিনা ইসলামকে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। পরে রাতে তাকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়। তার বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ও দণ্ডিবিধির কয়েকটি ধারায় মামলা করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব শিব্বির আহমেদ।
এ মামলায় পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবেদন জানালে ঢাকা মেট্রোপলিটন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জসিম তা নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারা কমপ্লেক্সের প্রধান ফটকের সামনে রোজিনা ইসলামের স্বামী মো. মনিরুল ইসলাম মিঠু সাংবাদিকদের জানান, রোজিনা ইসলামের শারীরিক অবস্থা ভালো না। তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
এদিকে, প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম ওই অফিস থেকে কোনো নথি সরানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আর তার সহকর্মীরা বলেছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন করায় তিনি ‘আক্রোশের শিকার’ হয়ে থাকতে পারেন। আগামী ২০ মে এ মামলায় রোজিনা ইসলামের জামিন শুনানির দিন ধার্য করেছে আদালত।
এদিকে, সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে ‘হেনস্তা করার’ অভিযোগ এনে তাতে ‘জড়িত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের’ বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করতে চান তার স্বামী মনিরুল ইসলাম মিঠু। প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনাকে ‘গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি চুরির চেষ্টা এবং মোবাইলে ছবি তোলার’ অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানোর পর সোমবার গভীর রাতে শাহবাগ থানায় এ কথা বলেন তার স্বামী।
সচিবালয়ে রোজিনাকে ‘হেনস্তা করার’ ঘটনা বর্ণনা করে মিঠু বলেন, “আমরা আইনি পদক্ষেপ নেবৃ আমরা কাউন্টার মামলা করব একটা।” মামলায় কী অভিযোগ করবেন- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, “তার ব্যাগের ভেতরে কত কিছু ছিল। টাকাপয়সা ছুঁড়ে ফেলে দিছে, আমিওতো ব্যবসা করি। শারীরিকভাবে হেনস্তা হয়েছে। এখানে ওখানে চামড়া উঠে গেছে।
”তাকে গলা চেপে ধরেছে, তাকে ফেলে দিয়েছে। তার ব্যাগ যখন কেড়ে নিয়েছে, হাত মোচড় দিয়েছে, এখানে (হাতে) লাল হয়ে আছে।” সোমবার দুপুরের পর স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের একান্ত সচিব মো. সাইফুল ইসলাম ভূঞার কক্ষে রোজিনাকে আটক করার পর প্রায় সাড়ে ৫ ঘণ্টা সেখানে তাকে আটকে রাখা হয়।
রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব শিব্বির আহমেদ বাদী হয়ে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে মামলা করেন তার বিরুদ্ধে। রোজিনার বরাতে মিঠু জানান, সচিবালয়ের ওই কক্ষে সে সময় তিনজন পুরুষ এবং একজন নারী ছিলেন, যারা ‘হেনস্তায়’ জড়িত। সচিবালয়ে আটক অবস্থায় সোমবার সন্ধ্যায় রোজিনা অসুস্থ হয়ে পড়লে সাংবাদিকরা তাকে হাসপাতালে নিতে বলেছিলেন, তবে কর্মকর্তারা তাতে সাড়া দেননি।
পরে রাতে রোজিনাকে থানায় নেওয়ার পর তার ছোট বোন সাবিনা পারভীন সুমী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “ও অসুস্থ। ওর শরীর ভালো না। গায়ে জ্বর। সকালে টিকা নিয়েছে। ওর শারীরিক অবস্থা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।” এরপর রাত পৌনে ১২টার দিকে মামলা করার খবর দিয়ে পুলিশ রোজিনাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে চাইলেও পরিবার তাতে আপত্তি জানিয়ে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেওয়ার দাবি জানান।
পুলিশ তাতে রাজি না হওয়ায় রাতে থানাতেই থাকতে হয় প্রথম আলোর এই জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদককে। মঙ্গলবার সকালে তাকে আদালতে পাঠানোর কথা রয়েছে। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার বিষয়ে আপত্তির কারণ জানতে চাইলে মিঠু বলেন, “রোজিনার ছয়টা অসুখ, ১৪টা ওষুধ খায়। এখন ওর শরীরের অবস্থা ভালো না। কিন্তু ওরা যেখানে নিতে চাচ্ছে, ঢাকা মেডিকেলে।
”আমি ঢাকা মেডিকেলের বিষয়ে অবজেকশন দিয়েছি, কারণ ওখানে করোনা। নেবে জরুরি বিভাগে। ওখানে যারা রোগী যায়, পজিটিভরা ভর্তি হয়, আর যারা কাটাছেঁড়া বা হালকা উপসর্গ নিয়ে আসে, তারা জরুরি বিভাগে যায়।” আগের শারীরিক অসুস্থতার মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোজিনার অবস্থা ‘বাজে হয়ে যাবে’ বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন মিঠু।
সোমবার রাতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মিঠু সচিবালয়ে রোজিনার টিকা নেওয়া এবং পরে পেশাগত দায়িত্বপালন করতে গিয়ে ‘হেনস্তার শিকার হওয়ার’ বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, শুধু টিকা নেওয়ার জন্য গ্রামের বাড়ি থেকে আগের দিন তারা ঢাকায় এসেছেন। তারা এক সঙ্গে বেলা ২টা ২০ মিনিটে সচিবালয়ে ঢোকেন এবং টিকা নেন ২টা ২৬ মিনিটে।
”এরপরে ও যখন বের হয়ে আসে, আমি ওকে বললাম, টিকাটা নিয়েছ, চলো, বাসায় চলো। ও আমাকে বলল যে, ’আমাকে একজন আছে তথ্য দেবে।’ তারপর আমি গাড়ি টান দিয়ে চলে গেছি মহাখালী। এরপর কী ঘটেছিল, তার বর্ণনা দিয়ে মিঠু বলেন, “ও আমাকে যেটা বলেছে, ওকে ওর এক সোর্স তথ্য দিয়েছে, ভ্যাকসিনের কোর কমিটি অনুমোদন দিয়েছে, তাতে তিনটা কোম্পানির নাম লেখা আছে, যেটা কনফার্ম কিছু না। ওই চিঠিটা ও পড়েও নাই।
”কাগজটা হাতে নিয়ে উপরে গিয়ে সচিব মহোদয়ের সঙ্গে আলাপ করে তথ্য আছে কি-না, আপডেট আছে কি-না নেবে।” রোজিনা যখন সচিবের পিএসের রুমে গেলেন, সেখানে পিএস ছিলেন না বলে জানালেন মিঠু। “পিএসের রুমের যে কনস্টেবল মিজান, তাকে সে (রোজিনা) জিজ্ঞেস করে পিএস সাহেব কোথায়। কনস্টেবল মিজান বলে, ’উনি বাইরে গেছেন, আপা বসেন’। ও বলছে, ’উনি না থাকলে আমার বসা ঠিক হবে?’ বলছে, ’অসুবিধা নাই, বসেন।’”
স্বামীর ভাষ্য, এরপর রোজিনা ওই কক্ষে বসে পত্রিকা পড়তে শুরু করেন। এর পরপরই কনস্টেবল মিজান ভেতরে ঢোকেন। “ওই ছেলে এসে বলে যে, ’আপনি এখানে ছবি তুলেছেন, ফাইলের।’ ও বলছে যে, ’আমি কোনো ছবি তুলি নাই আজকে।’ তারপর (মিজান) বলে, ‘মোবাইল দেন।’ মোবাইল নিয়ে দেখছে যে, কোনো ছবি তোলে নাই। তখন বলছে, ’আপনি ব্যাগে কোনো কাগজ নিছেন’। বলছে যে, ’না আমি ব্যাগে কোনো কাগজ নিই নাই’। “ এর ভেতরে দুজন অতিরিক্ত সচিব ওই কক্ষে আসেন এবং অন্যরা মিলে রোজিনাকে ’হেনস্তা’ শুরু করেন বলে অভিযোগ করেন মিঠু।
তিনি বলেন, “কনস্টেবল মিজান, পিয়ন তাকে খুব টানাহেঁচড়া করছে। তার গায়ের চামড়া উঠে গেছে, তার ব্যাগ তল্লাশি করে ওই চিঠিটা পেয়েছে, যেই চিঠিটা এক সোর্স দিয়েছিল। তখন বলছে, ’এই চিঠিটা আপনি কোথায় পেলেন?’ ও বলছে, ’আমার এক সোর্স দিয়েছে।’ ”তখন বলছে, ’সোর্সের নাম বলেন।’ ও বলছে, ’সাংবাদিকদের সোর্সের নাম বলার নিয়ম নাই। তখন সে বলছে, ’নাম না বললে আপনি এখান থেকে নিয়েছেন। তখন ও বলছে, ’যদি বলেন আমি এখান থেকে নিয়েছি, তাহলে নিয়েছি।’
”এরপর তার মোবাইল তল্লাশি করে বাড়ির কিছু ছবি ও আগের কিছু নিউজের স্ক্রিনশট ছিল। পীড়াপীড়ির এক পর্যায়ে সে সোর্সের নাম বলে দিয়েছে। এরপর তাকে সাড়ে ৬ ঘণ্টা ওখানে আটকে রাখছে।” স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে ১২ এপ্রিল প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের জন্য রোজিনা ‘অব্যাহতভাবে হুমকি’ পেয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ করেন তার স্বামী। তিনি বলেন, “ওকে ওই নিউজ করার পর বারবার টেলিফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছে, ‘দেখে নেব’।”

মে ১৯
০৫:০৮ ২০২১

আরও খবর