Daily Sunshine

করোনায় সংকটে শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ার আশঙ্কা

Share

আনম মুক্তার হোসেন : দেশে চলমান মহামারী করোনা ভাইরাসের ছোবলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা জীবন চরমভাবে ব্যহত হচ্ছে। সেই সাথে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরাও। ১৪ মাস স্কুল বন্ধ থাকায় ঝড়ে পড়তে পারে অনেকের শিক্ষা জীবন। মানসিক বিপর্যয়ে পথ হারাবে অনেক শিশু-কিশোর। করোনাকালীন দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা করতে অনেক শিশু কিশোর দোকান কিংবা স্বল্প আয়ের কাজে জড়িয়ে পড়বে। হারিয়ে যেতে পারে তাদের মূল ধারার শিক্ষা জীবন । ২০ থেকে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝড়ে পড়ার আশঙ্কা। কবে নাগাদ মহামারী দূর হবে, স্কুল খুলবে, ফিরে পাবে শিক্ষার নতুন পরিবেশ তা জানেন না কেউ। তবে শিশুদের পদচারনায় আবারও মুখরিত হবে স্কুলের মাঠ, শ্রেণি কক্ষ, স্কুল প্রাঙ্গন, শিশুরা গাইবে জাতীয় সংগীত, করবে খেলাধুলা ও ছুটোছুটি, ফিরে পাবে শিক্ষার নতুন পরিবেশ, জেগে উঠবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমন আশায় বুক বেঁধে আছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষামহল।
দেশে প্রথম করোনা ভাইরাস সনাক্ত হয় গত বছরের ৮ মার্চে। করোনা রুগি সনাক্ত বৃদ্ধি পাওয়াই ১৭ মার্চ থেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষনা করে সরকার। এরপর দফায় দফায় ছুটি বাড়াতে থাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সর্বশেষ ২৯ মে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে দেশে করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ চলমান। ২৩মে মধ্যরাত পর্যন্ত চলবে দেশে সর্বাত্বক লকডাউন। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া ঠিক নয়। সরকারের পক্ষ থেকে এমন কঠোর স্বাস্থ্যবিধিমানার নির্দেশনা আসছে সব সময়। এতো বড় একটি মহামারীতে দুঃসময় পার করছেন এদেশের ১৬ কোটি মানুষ। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণতায় এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা সম্ভব। যেখানে করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বকে কাবু করে ফেলেছে। বিশ্বে ৩৪ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। প্রতিদিন নতুন মৃত্যু যোগ হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার। সনাক্ত হয়েছে ১৬ কোটি ৪২ লাখের উপরে। দেশে করোনায় প্রাণ হারিয়েছে ১২ হাজারের উপর ও সনাক্ত হয়েছে ৭ লাখ ৮০ হাজারের বেশী। তবে সুস্থতার হারও অনেক।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহসায় খোলা আর সম্ভব নয় জেনে শিশু-কিশোর ও তরুণরা পড়েছে চরম বিপাকে। তারা ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে। মানসিক বিষণ্নতাসহ নানা রোগে ভুগছেন শিশুরা। মনোবিদ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল জানিছেন করোনাকালীন সময়ে ৪৬ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন । শিশুরা ঘরবন্দি থেকে তাদের মানসিক সমস্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। শহরে স্বল্প জায়গার বাসায় শিশুদের দিনের পরদিন আটকে রাখতে হিমসিম খাচ্ছেন অভিভাবকরা। লকডাউনে এক ঘেয়ামী ঘরবন্দি হয়ে তারা পরিবারকে বিরক্ত করছে। পরিবারও তাদেরকে সান্তনা দিতে বসিয়ে দিচ্ছেন টেলিভিশন ও ল্যাপটপের পর্দায়। আবার অনলাইনে ক্লাস চলায় শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে চলে এসেছে মোবাইল ফোন। মোবাইলে কার্টুন দেখে চলে তাদের খাওয়া পড়া। অনেকে ইন্টারনেট ব্যবহার করে ইউটিউব ও কার্টুন দেখে অথবা নানা খেলা দিয়ে ব্যস্ত রাখছে শিশুদের। আর এ থেকে শিশুরা মোবাইল আসক্তি হয়ে পড়ছে বলে জানান শিশু বিশেষজ্ঞ। গ্রামের শিশুরা কিছুটা প্রাণ খুলে চললেও শহরের শিশুদের এমন অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে নগরীর ঘোড়ামারা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী জানান, করোনার থাবায় বছর জুড়ে স্কুল বন্ধ থাকায় এমন পরিস্থিতির সম্মূখীন শিক্ষার্থীদের। যা পরিপূর্ণ জীবনেও এর একটা বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাবে। শিক্ষার্থী একটি শ্রেনিতে পাঠদান না করে উপর শ্রেনিতে উঠবে, এমনটা হতে পারে না। তবে করোনা মহামারীর কারণে সরকার নিরুপায় হয়ে এমন অটোপাশের মাধ্যমে উপর ক্লাসে উঠার ব্যবস্থা করেছে। সারা বিশ্বেই চলছে শিক্ষা ব্যবস্থার এমন চিত্র । এ দিকে শিক্ষার্থীর এক ক্লাসে না পড়ে উপর ক্লাসে পড়তেও তাকে চরম হিমসিম খেতে হবে। আর না পড়ার এ ঘাটতি যেন কোন দিন পুষিয়ে নেয়ার নয়। এ ঘাটতি একজন শিক্ষার্থীর জীবনে বড় ধরনের বাঁধ সাধতে পারে। ধুকে ধুকে এর খেসারত দিতে হতে পারে একজন শিক্ষার্থীকে। বয়ে বেড়াতে হবে এ অটোপাসের বিষের জ্বালা। জীবনে চলার পথে, এমনকি কর্ম জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে চরমভাবে। এ সময়ে ঝড়ে পড়তে পারে অনেক শিক্ষার্থী । করোনাকালীন সময়ে যারা কাজে লেগে যাবে তাদের জন্য স্কুলে ফেরানো কঠিন হয়ে পড়বে। এছাড়া নিম্নবৃত্ত পরিবাররা তাদের অল্প বয়সী মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন বলেও জানান ওই শিক্ষক।
পাওয়ার এন্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের যৌথ গবেষণায় তারা বলছেন করোনা মহামারীর কারণে এক বছরের বেশী সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দেশের ৫৯ লাখ ২০ হাজার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থী ন্যুনতম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত । এছাড়া প্রাথমিকে শতকরা ১৯ ভাগ ও মাধ্যমিকে ২৫ ভাগ শিক্ষার্থী শিখন ঘাটতিতে রয়েছে। তারা পড়াশোনায় অমনোযোগি হয়ে ঝড়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞগণ। তাদের স্কুলে ফেরানো কঠিন হয়ে পড়বে। এছাড়া শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বল্প আয়ের পরিবারের ছেলেমেয়েরা বেশী। পরিবারকে সহায়তা করতেই এসব শিশুরা কাজে লাগছে। ঘরবন্দি শিশুরা পড়তে চাইছেনা, তাদের মধ্যে এক ধরনের বিরক্তি ও বিষণ্নতা কাজ করছে। মোবাইল আসক্তি হয়ে পড়ছেন শিশু কিশোর ও তরুণরা। মনোবিদদের মতে ৪৬ শতাংশ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন। শিশুরা ভুগছে মানসিক রোগে। করোনাকালীন সময়ে এ থেকে বের হওয়ার কোনও উপায় ও নেয় বর্তমানে । এ বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
এ দিকে বছর জুড়ে করোনার কারনে কর্মহীন হয়ে পড়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। লকডাউন পরিস্থিতি সামলে উঠতে হিমসিম খাচ্ছে খেটে খাওয়া এসব মানুষ। এসব দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা করতে তাদের শিশুরা স্বল্প অয়ের কাজে যুক্ত হচ্ছে। কয়েক জায়গা ঘুরে দেখা গেছে, নগরীর আম চত্বর জি এম পাম্পে শিশু রানা, নওদাপাড়া বাজারে গার্মেন্টসে শ্রাবন, শালবাগানে একটি ফার্নিচার দোকানে শ্রী কান্ত রাজু, স্টেশন বাজারে ফার্মেসীতে আশিক, মুদির দোকানে শুভ, আল্লাহ’র দান ষ্টোরে সান্টু ও পল্টু, সাজ্জাদ মোটর সাইকেল ওয়ার্কসপে ফয়সাল, তাহিদ ও শুভ, নুর ইসলাম ওয়ার্কসপে আব্দুল্লাহ কাজ করছে স্বল্প বেতনে। এরা সকলেই প্রাথমিকের গন্ডি পার হয়নি। করোনাকালীন সময়ে স্কুল বন্ধ থাকায় দরিদ্র পরিবারকে সাহায়তা করতেই জড়িয়ে পড়ছে এরা শিশুশ্রমে।
এ সময় কালিগঞ্জ কলেজের প্রভাষক হারুন-অর-রশীদ খোকন জানান, তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় পড়ুয়া তিন ছেলে মেয়ে রয়েছে। তারা ঠিকমত পড়াশোনা করছেনা। বেশীরভাগ সময় তাদের টিভি সিরিয়াল ও কার্টুন দেখে সময় কাটে। তাদের মানসিক পরিবেশ ভালো নয় জেনে তাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করছি। তারপরও ঘরবন্দি থেকে তারা অনেক বেশী বিরক্ত করছে। তাদের মধ্যে এক ধরনের বিষণ্নতা কাজ করছে বলে জানান তিনি।
তবে সরকার প্রধান দেশবাসিকে সাথে নিয়ে এমন মহামারী পরিস্থিতি সামাল দিতে সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর বিচক্ষণতায় এ মহামারী করোনাভাইরাস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। শুরু করেছে ভ্যাকসিন কার্যক্রম। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কঠিন সময় পার করছে দেশবাসি। করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বকে কাবু করে ফেলেছে। শুধু বাংলাদেশ নয় সারা বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থার উপরই এর প্রভাব পরেছে চরমভাবে। তবে সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে চালিয়ে নিতে নানামূখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন প্রথম থেকেই। করোনার বিস্তার রোধে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে কীভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে চালু রাখা যায় তা নিয়ে সার্বক্ষনিক কাজ করছেন। তিনি ভার্চুয়াল মাধ্যমে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীর মনোবল অটুট রাখতে ও পড়ালেখা চালিয়ে যেতে তাদের নানা দিক নির্দেশনা দিয়ে আসছেন। অনলাইনে ক্লাস, টিভি, রেডিওতে নিয়মিত পাঠদান, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রশ্নোত্তরসহ নানা পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন।
এ ছাড়া ইন্টারনেট সুবিধাসহ উপবৃত্তির ব্যবস্থা চালু করেছেন শিক্ষা ক্ষেত্রে । যাতে করে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই শিক্ষা ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে পারে। এমন পদক্ষেপ সরকারের জন্য প্রসংশনীয় বলে মনে করেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তবে অভিভাবকদের আরো সচেতন হওয়ার পরামর্শ সরকার প্রধানের। শিশু কিশোর তথা তরুণ সমাজ যাতে করে বিপথগামী না হয় সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। তারা যাতে কোনও ভাবে মাদকআসক্ত কিংবা মোবাইল আসক্ত না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের সাথে বন্ধু সুলভ আচরণ করতে হবে। তাদের শিক্ষকদের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রেখে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হবে। এমন দিক নির্দেশনা দিয়েছেন এ দেশের সরকার প্রধান। একদিন করোনার রাজত্ব শেষ হবে, ঘুচবে দেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা, জেগে উঠবে নতুন করোনামুক্ত বাংলাদেশ এমন ভাবনা নিয়ে শিক্ষার্থীর পদচারনায় আবারও মুখরিত হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনটায় আশা শিক্ষানুরাগিদের।

মে ১৯
০৫:০৬ ২০২১

আরও খবর