Daily Sunshine

অনিশ্চয়তায় রাবিতে নিয়োগপ্রাপ্তরা

Share

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৪১ জনের বিশাল নিয়োগ দিয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় এসেছেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের (রাবি) সদ্যবিদায়ী উপাচার্য আব্দুস সোবহান। তবে নিয়োগপ্রাপ্তরা স্বস্তিতে নেই। চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের। মানুষের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদেরও।
এখন চাকরি টিকবে কিনা এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। সর্বশেষ শনিবার তদন্ত কমিটির সুপারিশে রেজিস্ট্রার দফতর নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের কর্মস্থলে যোগদানে নিষেধাজ্ঞা জারি করার পর থেকে চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা ও হতাশায় পড়েছেন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্তরা।
পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে নিয়োগপ্রাপ্ত দুজন জানিয়েছেন, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি গঠনের ফলে চাকরি টিকবে কি না তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। যারা চাকরি পেয়েছেন কমবেশি সবাই হতাশ। নিয়োগ আদেশে স্বাক্ষর করলেও এখন যোগদান অনিশ্চিত হয়ে গেল। তাদের চোখ এখন মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর।
সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গত ৬ মে পারিবারিক নাপিত, মিস্ত্রি, রাধুঁনিসহ অনুগত শিক্ষকদের স্বজন, সাংবাদিক ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মী মিলিয়ে ১৪১ জনকে বিভিন্ন পদে অস্থায়ী নিয়োগ দিয়েছেন আব্দুস সোবহান। এই নিয়োগে জড়িতদের শাস্তির আওয়তায় আনতে গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে যথাসময়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদনের আশাবাদ ব্যক্ত করেন নিয়োগপ্রাপ্তরাও।
তবে গণমাধ্যমকর্মীদের ভিসি আব্দুস সোবহান বলেন, আমি ৭৩’র অধ্যাদেশ মেনেই নিয়োগ দিয়েছি। এর আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমরেও ৫৪৪ জনের এডহকে নিয়োগ হয়েছে উল্লেখ করে ভিসি বলেন তারা তো এখনও টিকে আছে। সুতরাং এটা না টিকার কী কারণ আছে? মানবিক কারণে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের চাকরি দিতে এই নিয়োগ দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে তালিকা ঘেঁটে রাবিসহ ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের ৪০ জন বেশি নেতাকর্মীর নাম পাওয়া যায় নি।
এম আব্দুস সোবহান বলেন, দীর্ঘসময় রাবিতে কোনো নিয়োগ না হওয়ায় আমরা নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম। কিন্তু গত বছর ডিসেম্বরে নিষেধাজ্ঞা আসে। আমি মানবিক কারণে ছাত্রলীগকে চাকরি দিয়েছি। তাদের যে জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে তাতে আমি মনে করি তারা চাকরিটা ডিজার্ভ করে। তারা অনার্স মাস্টার্স পাশ করে একটা তৃতীয় শ্রেণির চাকরি পাবে এটা আমি মনে করি খুব যৌক্তিক। অভিযোগ আছে, ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়ে এম আব্দুস সোবহান বিশাল নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বিশ^বিদ্যালয়ের কর্মকর্তা কামরুজ্জামান চঞ্চল বলেন, নিয়োগবাণিজ্য করে নিরাপদে ক্যাম্পাস ছাড়তে ও অবৈধ নিয়োগকে জায়েজ করতেই তিনি ছাত্রলীগের নাম ভাঙ্গিয়েছেন। আরও অনেক মেধাবী ও যোগ্য ছাত্রলীগ নেতা ছিল, যাদের চাকরি হয়নি। যারা চাকরি পেল, তারাও এখন চাকরি নিয়ে শঙ্কার মধ্যে পরে গেল। পরবর্তী প্রশাসন যেন ছাত্রলীগের যোগ্য ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করে।
অবৈধ নিয়োগ ঠেকাতে আত্মগোপনে ছিলেন রাবির রেজিস্ট্রার : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সদ্য বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহানের শেষ কর্মদিবসে দেওয়া ১৪১ জনের নিয়োগ শতভাগ অবৈধ বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম। তাই তিনি অবৈধ নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর না করতে আত্মগোপনে ছিলেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে এমন বক্তব্য দিয়েছেন অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম। রবিবার সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান। অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম বলেন, আমার কাছে জানতে চাওয়া হয়- আপনি (রেজিস্ট্রার) দায়িত্ব পালনকালে যে নিয়োগ হয়েছে সে বিষয়ে আপনার মতামত কী? আমি বলেছি, নিয়োগটি শতভাগ অবৈধ। কারণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আর এ কারণেই আমি নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করিনি, আত্মগোপনে ছিলাম। এ সময় নির্বাহী আদেশে নিয়োগপত্রে উপাচার্য অন্য একজন উপ-রেজিস্ট্রারকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়েছেন।
রেজিস্ট্রার বলেন, তদন্ত কমিটি জানতে চায় এখন আমি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন কিনা? বলেছি এখন আর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি না।
‘যা শয়তান যা, ক্যাম্পাস থেকে যা’ : এদিকে রাবিতে বিতর্কিত নিয়োগ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ‘শয়তান তাড়াতে’ প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের কর্মসূচি শুরু করেছে ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা। ‘যা শয়তান যা, রাবি ক্যাম্পাস থেকে যা’ এই বাক্য বলতে বলতে উপাচার্য ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থানে পাথর নিক্ষেপের কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে। ‘শয়তানমুক্ত রাবি’ এই হ্যাশট্যাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের এমন বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
হঠাৎ এমন পাথর নিক্ষেপের কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে অনিয়ম, দুর্নীতি তাড়াতে এমন অভিনব পন্থা বেছে নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
প্রতীকী পাথর নিক্ষেপকারী মোল্লা সাঈদ নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যসহ অন্যান্য প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দায়িত্ব পালন শেষে অনেকে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতাসহ বিভিন্ন নৈতিক স্খলনের অভিযোগ নিয়ে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তারা এ সব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছেন। সেই জায়গা থেকে আমাদের মনে হয়েছে শয়তানের প্ররোচনায় তারা এ সব অপকর্ম করে, আবার ভুলে যায়’।
তিনি বলেন, ‘তাই বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্ররোচনাকারী শয়তানকে তাড়িয়ে শিক্ষাঙ্গনটিকে অনিয়ম, লুটতরাজের হাত থেকে রক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি শিক্ষা ও গবেষণা সহায়ক পরিবেশ তৈরির জন্য আমরা আকুল আবেদন জানিয়েছি। পরবর্তীতেও যারা দায়িত্বে আসবেন তাদের জন্যও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কঠোর বার্তা দেওয়া’ বলে উল্লেখ করে এ শিক্ষার্থী।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী নুরুল হক জানান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে তিনি এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন। রাবির সদ্যবিদায়ী উপাচার্য আব্দুস সোবহান ‘আপাদমস্তক একজন দুর্নীতিপরায়ণ’ ব্যক্তি ছিলেন। আর তিনি তা প্রমাণ করে দিয়ে গেছেন তার শেষ কর্মদিবসে। সেই জায়গা থেকে অভিযুক্তের নৈতিক এবং মানসিক দীনতার দরিদ্র অবস্থা তুলে ধরে এবং পরিহাস, রম্য করে এ কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৬ মে (বৃহস্পতিবার) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান তার মেয়াদের শেষ কার্যদিবসে একসঙ্গে ১৪১ জনকে নিয়োগ দেন। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এই নিয়োগকে অবৈধ উল্লেখ করে সন্ধ্যায় তদন্ত কমিটি গঠন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শনিবার তদন্ত কমিটির সদস্যরা ক্যাম্পাসে এসে বর্তমান উপাচার্য (দায়িত্বপ্রাপ্ত), সাবেক উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও নিয়োগের সঙ্গে সংশিষ্ট সকলের সঙ্গে বৈঠক করেন।

মে ১০
০২:২১ ২০২১

আরও খবর