Daily Sunshine

রাবিতে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানে নিষেধাজ্ঞা

Share

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সদ্য বিদায়ী ভিসি আবদুস সোবহানের ‘মহা-দুর্নীতি’র গল্প চাউর হচ্ছে এখন মানুষের মুখে মুখে। ক্রমেই বেরিয়ে আসছে তাঁর থলের বিড়াল। রাবিতে নিয়োগ বাণিজ্য করতে গিয়ে বাদ রাখেননি তার পারিবারিক নাপিত থেকে শুরু করে কাঠমিস্ত্রিকেও। তাদেরকেও চাকরি দিয়েছেন ভিসি। এ অবস্থায় নিয়োগকে বিধিবহির্ভূত ও অবৈধ উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রগতিশীল ঘরানার শিক্ষকরা। এছাড়া এডহকে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও দফতরে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়েছেন রেজিস্ট্রার দফতর। রেজিস্ট্রার আব্দুস সালাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, যেহেতু মন্ত্রণালয় এই নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে তদন্ত কমিটি করেছে, তাই বিষয়টি নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ পত্রের যোগদান ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম স্থগিত
এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অবৈধ’ নিয়োগ ও এর সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে তদন্ত করতে ক্যাম্পাস ঘুরে গেলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির সদস্যরা। শনিবার দিনভর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার সঙ্গে কতা বলেন তারা। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জড়িত সবার আলাদা আলাদা মতামতও নেন তদন্ত কমিটির সদস্যরা। অভিযুক্ত ভিসি আবদস সোবহানকেও মুখোমুখি করা হয়। তার বক্তব্যও লিপিবদ্ধ করা হয়।
এ তদন্ত কমিটির নেতৃত্ব দেন কমিটির আহ্বায়ক ও ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর। তার সঙ্গে ছিলেন কমিটির সদস্য এবং ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. আবু তাহের, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব ড. জাকির হোসেন আখন্দ ও ইউজিসির পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার বেলা ১১টার দিকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন। এরপর তারা ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহার কার্যালয়ে যান। পৌনে ১২টার দিকে তদন্ত কমিটির সদস্যরা উপাচার্যের কার্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ কমিটির প্রধান ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, সংশ্লিষ্ট সবকার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে তারা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়োগের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গত বৃহস্পতিবার শেষ কার্যদিবসে উপাচার্য অধ্যাপক এম আবদুস সোবহান ১৪১ জনকে নিয়োগ দেন। ওইদিনই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়োগকে অবৈধ উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি গঠন করে।
নিজের শেষ কর্মদিবসে বৃহস্পতিবার ৯ জন শিক্ষক, ২৩ জন কর্মকর্তা, ৮৫ জন নিম্নমান সহকারী এবং ২৪ জন সহায়ক কর্মচারীসহ ১৪১ জনকে অস্থায়ী নিয়োগ দেন বিদায়ী উপাচার্য। যদিও নিয়োগের নথিতে আগের দিন সই করেছেন একজন উপ-রেজিস্ট্রার।
নিয়োগপ্রাপ্তদের তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তান, স্ত্রী ও স্বজন, ছাত্রলীগের ৪৩ সাবেক-বর্তমান নেতাকর্মী, চারজন সাংবাদিক নেতা ও একজন সাংবাদিকের বোন রয়েছেন। কেবল তাই নয়; পারিবারিক নাপিত, কাঠমিস্ত্রি ও মালির স্ত্রীকে চাকরি দিয়েছেন উপাচার্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুয়ার্ড শাখায় নিরাপত্তা প্রহরী পদে অস্থায়ী নিয়োগ পেয়েছেন শামসুল আলম। তার বাবার নাম মৃত হায়াত আলী। নিয়োগ তালিকায় ১৪ নম্বরে রয়েছে তার নাম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শামসুল আলম দীর্ঘ দিন ধরে উপাচার্য আব্দুস সোবহান ও তার পরিবারের সদস্যদের চুল কাটতেন। তার পরিবারের যাবতীয় আসবাবপত্র তৈরি করতেন কাঠমিস্ত্রি আব্দুস সামাদ রাজন। তাকেও নিরাশ করেননি উপাচার্য। রাজনকে নিয়োগ দিয়েছেন প্রকৌশল দফতর শাখায় কাঠমিস্ত্রি পদে। রাজন বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন কাজলার ধরমপুর এলাকার আবদুস সোবাহান কাঁচুর ছেলে।
উপাচার্যের বাসভবনে মালির কাজ করতেন সাইফুল ইসলাম। তার স্ত্রী মিনু খাতুন ওই বাসভবনে গৃহপরিচারিকা ছিলেন। তার বাবার নাম ওজিউল্লাহ। তাকে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে আয়া পদে নিয়োগ দিয়েছেন উপাচার্য। নিয়োগের এই তালিকায় ১১ নম্বরে রয়েছে তার নাম।
বর্তমানে উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়োগ অবৈধ মর্মে তাদের মতামত দিয়েছে। তদন্ত কমিটিও কাজ শুরু করছে। কাজেই রুটিন দায়িত্ব পালনকারী হিসেবে আমি তাদের কাজে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে পজিটিভ কিছু বলতে পারছি না।
অপরদিকে নিয়োগের তালিকায় দেখা যায়, অ্যাডহকের মাধ্যমে ৯ জন শিক্ষক, ২৩ জন কর্মকর্তা, ৮৫ জন তৃতীয় শেণির এবং ২৪ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এদের মধ্যে শিক্ষক পদে ৯ জনের মধ্যে একজনকে সহযোগী অধ্যাপক ও ৮ জন প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। প্রভাষক পদে নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন, ফিশারিজ বিভাগে তাসকিন পারভেজ, ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ইন্দনিল মিশ্র, ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সে ড. শাহরিয়ার মাহবুব, সংগীত বিভাগে ঋত্বিক মাহমুদ, ইতিহাস বিভাগে কামরুজ্জামান, আরবি বিভাগে ড. এ কে এম মুস্তাফিজুর রহমান, সমাজকর্ম বিভাগে আফজাল হোসেন এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগে আসাদুজ্জামান।
এছাড়া সেন্টার অব এক্সেলেন্স ইন টিচিং অ্যান্ড লার্নিংয়ের সহযোগী অধ্যাপক (আইটি) হিসেবে ড. সাবিহা ইয়াসমিনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তা পদে যারা নিয়োগ পেলেন তাদের তাদের মধ্যে সেকশন অফিসার পদে ১২ জন, সহকারী রেজিস্ট্রার পদে দুজন, সহকারী প্রকৌশলী পদে দুজন, আবাসিক শিক্ষিকা পদে পাঁচ জন ও দুইজন শরীরচর্চার শিক্ষক। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যে সিনিয়র সহকারী পদে একজন, উচ্চমান সহকারী পদে ৩০ জন, নিম্নমান সহকারী পদে ৪৩ জন, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর পদে দুজন, তত্ত্বাবধায়িকা পদে তিন জন, গার্ড সুপারভাইজার পদে একজন, জুনিয়র গ্রন্থাগারিক পদে একজন, সহকারী স্টোরকিপার পদে দুজন, হিসাব সহকারী পদে একজন ও পেশ ইমাম পদে একজন।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষক সমাজ’ ব্যানারে আন্দোলন করে আসছেন আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের একাংশ। দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকদের মুখপাত্র অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম টিপু বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করার পাশাপাশি এই নিয়োগে একাধিক নিয়মের লঙ্ঘন হয়েছে। রেজিস্ট্রার দায়িত্বে থাকলেও তাকে বাদ দিয়ে একজন উপ- রেজিস্ট্রারকে দিয়ে নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। শিক্ষকরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিতর্কিত এ নিয়োগকাণ্ড ঘটিয়ে ঘৃন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন ভিসি আবদুস সোবহান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিদায়ী ভিসি বিভিন্ন পদে অবৈধ ও বিধিবহির্ভূতভাবে জনবল নিয়োগ প্রদান করেছেন। অবৈধ জনবল নিয়োগের বৈধতা প্রাপ্তির সুযোগ নেই।
অবৈধ নিয়োগে জড়িতদের শাস্তি দাবি : এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) অস্থায়ী ভিত্তিতে ১৪১ জনের নিয়োগকে বিধিবহির্ভূত ও অবৈধ উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রগতিশীল ঘরানার শিক্ষকরা। এ নিয়োগের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে দাবি করে এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তিরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
শনিবার ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী শিক্ষকদের স্টিয়ারিং কমিটির’ ১৬ সদস্য স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বিধি-বহির্ভূত ও অবৈধ প্রক্রিয়ায় শিক্ষক, কর্মকর্তা, ও কর্মচারী এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং এ ঘটনার দায় বিদায়ী উপাচার্য ও তার সহায়তাকারীদেরই নিতে হবে বলে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের সদস্যরা মনে করে।’
তারা বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিরোধী নই। কিন্তু সেই নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি মোতাবেক হতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের চাহিদা ছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা কোনো লিখিত-মৌখিক পরীক্ষা ছাড়াই শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগের পক্ষে আমরা নই। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বায়ত্তশাসনের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থনৈতিকভাবে উপাচার্যের লাভবান হওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লজ্জিত করেছে।’
এসব শিক্ষকের দাবি, অতীতে তারা বহুবার উপাচার্যের ক্ষমতার অপব্যবহার , দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিষয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন এবং দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করে তার অপসারণ দাবি করেছেন। দাবি মেনে তাকে তখনই অপসারণ করা গেলে উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো বলে মনে করেন তারা।
বিবৃতিতে শিক্ষকরা বলেন, ‘সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগের নিষেধাজ্ঞা অনেকদিন আগে থেকেই দেয়া ছিল। এরপরেও মেয়াদের শেষ দিনে এসে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুর্নীতির মাধ্যমে এই অবৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু অশান্ত ও অস্থিতিশীল করেনি, বরং দেশ ও জাতির সামনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে দারুণভাবে ক্ষুন্ন করেছে।’
এদিকে সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এডহকে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগদানে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে। শনিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও দফতরে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠিয়েছেন রেজিস্ট্রার দফতর। রেজিস্ট্রার আব্দুস সালাম স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, যেহেতু মন্ত্রণালয় এই নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে তদন্ত কমিটি করেছে, তাই বিষয়টি নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ পত্রের যোগদান ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম স্থগিত রাখতে অনুরোধ করা হলো।

মে ০৯
০২:১৭ ২০২১

আরও খবর