Daily Sunshine

জান্তার নৃশংসতা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন শত শত চিকিৎসক

Share

সানশাইন ডেস্ক: গত ১ এপ্রিল থেকে বাড়িতে নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমাতে পারছেন না মিয়ানমারের ডাক্তার খিন। তার বদলে মান্দালয় শহরের গুপ্ত কোনও স্থানে জেগে জেগে রাত কাটে তার। কানে ভেসে আসে রাস্তায় টহলরত সামরিক যানের শব্দ। আতঙ্কে থাকেন কখন না জানি সেনাবাহিনীর ধরপাকড় আর নির্যাতনের পরবর্তী শিকার হয়ে বসেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খিন বলেন, ‘আমি শুনেছি আমার নাম তাদের (সেনাবাহিনী) তালিকায় আছেৃসম্ভবত তারা আমাকেও খুঁজতে আসবে। মাঝে মাঝে নিজেকে অনিরাপদ মনে হয়। রাতে তারা আশেপাশের এলাকায় টহল দেয়। সম্ভবত আমি আটক হওয়ার ঝুঁকিতে আছি।’
মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরোধিতা করে অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় অভিযান চালানো হচ্ছে। আটককৃতদের বিভিন্ন নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় সামরিক সরকারের নিষ্ঠুরতা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে শত শত চিকিৎসক। ডাক্তার খিন তাদেরই একজন।
খিনের মতোই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন মান্দালয়ের আরেক চিকিৎসক হতুন। তিনি বলেন, ‘আমরা আতঙ্কে দিন পার করছি, এ যেন এক জীবন্ত নরক। আমরা শান্তিতে খেতে পারছি না শান্তিতে ঘুমাতে পারছি না। আমরা আমাদের পরিবার নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে আছি।’ হতুন আরও বলেন, ‘কারও বাড়িতে গিয়ে তাকে না পেলে বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য কোনও সদস্যকে আটক করা হচ্ছে। এক ব্যক্তিকে খুঁজতে গিয়ে তাকে না পেয়ে তার পরিবারের এক সদস্যকে গুলিও করেছে তারা।’
১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মবিরতি শুরু করেন চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা। এর বদলা হিসেবে চিকিৎসকদের গুলি, অ্যাম্বুলেন্সে গুলি, চিকিৎসকদের মারধর, ক্লিনিকগুলোতে তল্লাশি অভিযান চালানোসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে সেনা সরকার। শুধু বিক্ষোভকারীই নয়, সাধারণ মানুষকেও স্বাস্থ্য সুরক্ষাজনিত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত মিয়ানমারের স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে অন্তত ১০৯টি হামলা ও হুমকিপ্রদানের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। ইনসিকিউরিটি ইনসাইট, ফিজিসিয়ান্স ফর হিউম্যান রাইটস (পিএইচআর) ও জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর পাবলিক হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (সিপিএইচএইচআর)-এর নতুন প্রতিবেদন থেকে এ পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে।
ওই বিশ্লেষণে বলা হয়, ১০ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত ও ৩২ জন আহত হয়েছে, ৯৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অন্তত ৪৯ বার হাসপাতালগুলোতে তল্লাশি চালানো হয়েছে কিংবা দখল করা হয়েছে। ৩৭০ জন চিকিৎসক গ্রেফতারি পরোয়ানার মুখে আছেন। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ভিন্ন মত ছড়ানোর দায়ে পেনাল কোডের ৫০৫এ-ধারার আওতায় অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
ডাক্তার খিন এরইমধ্যে দুইবার গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তবে চিকিৎসার জন্য মরিয়া হয়ে থাকা রোগীদের চিকিৎসা দিতে না পারার বিষয়টি তাকে পীড়া দিচ্ছে বেশি। রাত ৮টা থেকে মিয়ানমারের রাস্তায় যে কারফিউ জারি করা হয়েছে তা যেন এক মৃত্যু ফাঁদ। ওই সময়ে কেউ ঘর থেকে বের হওয়া মানেই মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বের হওয়া। জরুরি চিকিৎসাকর্মীরাও এর ব্যতিক্রম নন।
খিন বলেন, ‘এটা খুব হতাশার। চিকিৎসার জন্য মানুষ আমাদেরকে ফোন করে। কিন্তু রাতে কারফিউর মধ্যে গুলিবিদ্ধ আর আটক হওয়ার ভয়ে আমরা তাদের জন্য বেশি কিছু করতে পারি না। একদিন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের আক্রমণে আহত হয়ে পালিয়ে যাওয়া এক রোগী আমাকে জরুরি ভিত্তিতে ফোন করেছিল। তার স্ত্রী মৃত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছে। তিনি আমাকে ফোন করে সহায়তা চেয়েছিলেন। প্রায় ১০ ব্লক দূরে আমাদের একটি উদ্ধারকারী দল অপেক্ষা করছিল। তবে সেনাবাহিনীর সদস্যরা মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল। গুলি চলছিল। উদ্ধারকারী দল সেখানে যেতে পারলো না তাকে সহযোগিতা করতে পারল না। তিনিও মারা গেলেন।’
খিন জানান অনেক সময় প্রসূতি মায়েদের কাছ থেকেও সহযোগিতা চেয়ে তারা ফোন পান। তিনি জানান, একবার অন্তঃসত্ত্বা নারীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায়নি। পরে তার সন্তান মারা যায়। াহত বিক্ষোভকারী ও অসহায় কমিউনিটির মানুষদেরকে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য বেসরকারি ক্লিনিকের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন খিন ও তার সহকর্মীরা। এসব ক্লিনিকে এখন স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারবেন অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। কারফিউর সময় এড়িয়ে ঠিক কখন প্রসব করা ভালো হবে তা নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারবেন তারা। তবে ক্লিনিক চালানোর কাজটিও বিপদমুক্ত নয়।
খিন বলেন, ‘ক্লিনিকের উত্তর ও দক্ষিণ দুই ব্লকে কিছু মানুষ আছেন। তারা সবকিছু নজরে রাখেন এবং যখনই দেখেন যে সেনারা আসছে, তারা আমাদেরকে ফোন দেন। আর পেছন দরজা দিয়ে পালানোর মতো কিছুটা সময় পাই আমরা।’ ডাক্তার হতুনের বাড়িতেও তল্লাশি অভিযান চালিয়েছিল সেনাবাহিনী। তবে তিনি কোনোরকমে পালিয়ে বেঁচেছেন। বেশ কয়েকটি ক্লিনিক ও জরুরি সেবা প্রদানকারী দলকে সমন্বয় করেন হতুন। তিনি জানান, ২৯ এপ্রিল এক বন্ধুভাবাপন্ন পুলিশ সদস্য জানিয়েছেন ১ মে ক্লিনিক-৩ এ তল্লাশি চালাবে জান্তা।
হতুন বলেন, ‘তারা পৌঁছানোর আগেই আমরা সব কিছু গুটিয়ে ফেলতে সক্ষম হই। তারা এসে পরীক্ষা করলো এব সেখানে কিছু ছিল না। কোনও চিকিৎসাকর্মীও ছিলেন না। জায়গাটা ফাঁকা ছিল। তারা ক্ষুব্ধ হয়েছিল।’ হতুন জানান, মাঝে মাঝে সেনা সদস্যরা অনেক বেশি নৃশংস আচরণ করে। কারফিউ চলার সময় অ্যাম্বুলেন্সেও তল্লাশি চালায় এবং গুলি করে। এমনকি একবার রোগীর কাছে অক্সিজেনও পৌঁছাতে দেয়নি। সে রোগী পরে মারা যায়।
তার ভাষায়, ‘ব্যাখ্যা দেওয়ার কোনও সময় তারা আপনাকে দেবে না। তারা যদি বলে থাম, থামতে হবে, যদি বলে যাও যেতে হবে। তারা যদি বলে গাড়ি থেকে নেমে আস, তবে তাই করতে হবে। কেউ কারণ জানতে চাইলে বন্দুক দিয়ে আঘাত করে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাই মানুষ। আমরাও গ্রেফতার ও আটক হওয়াকে ভয় পাই। কিছু মানুষকে তারা রাতে আটক করে নিয়ে গেছে সকালে তাদের মরদেহ ফেরত দেওয়া হয়েছে। আমাদের ডাক্তাররা সাহসী। তারা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছে। নিজেদের নিয়ে এখন আর পরোয়া করে না তারা।’ পরিস্থিতি ডাক্তারদেরকে বেপরোয়া করে তুলেছে বলে মন্তব্য করেন হ্লায়াং নামের আরেক ডাক্তার। তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা ছাড়া আমরা অসহায়। তবে এখনও সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

মে ০৮
০২:৩২ ২০২১

আরও খবর