Daily Sunshine

কাদের চাকরি দিলেন ‘বিতর্কিত’ বিদায়ী ভিসি?

Share

স্টাফ রিপোর্টার : শেষ সময়ে এসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বিদায়ী ও বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহান ছাত্রলীগের ‘নাম ভাঙিয়ে’ বিতর্কিত এক নিয়োগ কাণ্ড ঘটিয়ে গেলেন। এ নিয়ে এখন রাজশাহী ছাড়াও সর্বত্র চলছে আলোচনা-সমালোচনা ও নানা গুঞ্জন। রাবিতে ১৪১ জনের নিয়োগ নিয়োগ নিয়ে এখন রীতিমত ‘টক অব দ্যা সিটি’তে পরিনত হয়েছে রাজশাহী।
নিয়োগে ছাত্রলীগের কথা বললেও ১৪১ জনের তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান, সাবেকসহ আশেপাশের বিভিন্ন শাখা ছাত্রলীগের ৪৩ জনের বেশি ছাত্রলীগের নাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে ভয়ঙ্কর রকমের এক নিয়োগ বাণিজ্য করে গেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবাহান।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ ছাত্রলীগের চাকরিপ্রাপ্ত নেতারা। এছাড়াও দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত ছাত্রলীগ নেতাদের অধিকাংশকে তৃতীয় শ্রেণির পদে চাকরি দিয়ে তাদেরকে অপমান করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। এসব পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ছাত্রলীগ নেতারা কেউ কেউ আবার চাকরিতে যোগদানও করেননি।
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে রাবি ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি সাদিকুল ইসলাম স্বপন জানান, ‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন সায়েন্স এন্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করেছি। তারপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেছি। তারপরও আমাকে নিম্নমান সহকারীর একটি তৃতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করছি, এটা আমাকে এবং ছাত্রলীগকে অপমান করার একটি কৌশল। সে কারণে আমি চাকরিতে যোগদান করিনি। আমার মতো অধিকাংশ নেতাকেই এভাবে অপমান করা হয়েছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোনোমি অ্যান্ড এগ্রিকালচার এক্সটেনশন বিভাগের ফারুক হাসান নামের এক ছাত্রলীগের সহ-সভাপতিকে উচ্চমান সহকারী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। স্নাতকে ফাস্ট ক্লাস ফোর হলেও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে উচ্চমান সহকারী পদে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষকদের আহ্বায়ক অধ্যাপক সুলতানুল ইসলাম টিপু বলেন, বিদায়ী উপাচার্যের ছিল এটা একটা অপকৌশল। ছাত্রলীগের নাম ভাঙিয়ে তিনি মূলত: নিয়োগ বাণিজ্য-ই করে গেলেন।
এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়াদ শেষে যাবার আগে উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক আবদুস সোবহান যে শতাধিক অস্থায়ী নিয়োগে সই করেছেন, সেই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সন্তান-স্ত্রী-স্বজন, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে একাধিক সাংবাদিক নেতাও রয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার নিয়োগের জন্য প্রস্তুতকৃত ভিসির সই করা তালিকা ধরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এসব তথ্য। যদিও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই নিয়োগকে অবৈধ ও বিধিবহির্ভূত উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
তালিকা থেকে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিবারের ৩ জন সদস্য শিক্ষক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। যে বিভাগগুলোতে নিয়োগ দেখানো হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি জানে না সেই বিভাগের প্লানিং কমিটিও। এর বাইরে কর্মকর্তা পদেও নিয়োগ পেয়েছেন একাধিক শিক্ষকের স্বজন।
শিক্ষক পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন বিশ্ববিদ্যালয়টির বাংলা বিভাগের খন্দকার ফরহাদ হোসেনের ছেলে ঋত্বিক মাহমুদ। যিনি সংগীত বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। নিয়োগ তালিকায় ৫ নম্বরে নাম তার। খন্দকার ফরহাদ হোসেন লেখালেখির জগতে অনীক মাহমুদ নামে পরিচিত।
বিভাগীয় প্লানিং কমিটি থেকে ঋত্বিক মাহমুদের নিয়োগের সুপারিশ গেছে কি না সে বিষয়ে জানতে চাইলে সঙ্গীত বিভাগের প্লানিং কমিটির সদস্য পদ্মীনি দে বলেন, “নিয়োগ নিয়ে বিভাগীয় প্লানিং কমিটির কোনো সভা হয়নি। কীভাবে নিয়োগ দিয়ে গেছেন উপাচার্য সেটা সবাই জানেন।”
ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে নিয়োগ পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. চিত্তরঞ্জন মিশ্র-এর ছেলে ইন্দ্রানিল মিশ্র। নিয়োগ তালিকার ৩ নম্বরে আছে তার নাম।
এছাড়া দুই শিক্ষকের স্ত্রী নিয়োগ পেয়েছেন আবাসিক শিক্ষিকা হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব এক্সেলেন্স ইন টিচিং অ্যান্ড লার্নিং-এর সহযোগী অধ্যাপক (আইটি) হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. খাইরুল ইসলামের স্ত্রী ড. সাবিহা ইয়াসমিনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কলেজ পরিদর্শক ও অধ্যাপক ড. আব্দুল গণির স্ত্রী ফারহানা একরাম নিয়োগ পেয়েছেন তাপসী রাবেয়া হলের আবাসিক শিক্ষিকা হিসেবে। সহকারী আবাসিক শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ হোসেন রিয়াজির স্ত্রী বুরুজ ই জোবাইরা। শেষ সময়ের এই নিয়োগে অধ্যাপক আবদুস সোবহান বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ জন সাংবাদিকের নিয়োগপত্রেও সই করেছেন।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সব ধরনের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও বৃহস্পতিবার শেষ কর্মদিবসে ১৪১ জনকে চাকরি দিয়েছেন উপাচার্য প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান। রাজশাহীর চার সাংবাদিক, ছাত্রলীগের সাবেক নেতাকর্মী, শিক্ষকদের আত্মীয়স্বজনসহ ১৪১ জনকে অ্যাডহকে (অস্থায়ী) শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সেই নিয়োগকে বৃহস্পতিবার বিকেলেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবৈধ ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিষয়টি নিয়ে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি ঘোষণা করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই খবরে ভেঙে পড়েছেন সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র ও নিয়োগ তালিকায় দেখা যায়, নিয়োগ পাওয়া লোকজনের মধ্যে রয়েছেন ৯ জন শিক্ষক, ২৩ জন কর্মকর্তা, ৮৫ জন নিম্নমান সহকারী এবং ২৪ জন সহায়ক কর্মচারী। তাদের নিয়োগপত্রে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর ১২ (৫) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিম্নলিখিত প্রার্থীদের তাদের নামের পাশে বর্ণিত পদ ও স্থানে অস্থায়ী ভিত্তিতে (অ্যাডহক) অনধিক ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হলো। এ নিয়োগ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করা হোক। এ ছাড়া নিয়োগপত্রে বলা আছে, প্রার্থীদের নিয়োগ যোগদানের দিন থেকে কার্যকর হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়েরর উপ-রেজিস্ট্রার মো. মখলেছুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যলয়ে অ্যাডহকে ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়। ছয় মাস পর যদি ওই ব্যক্তি আবার চাকরি করতে চান, তখন তাঁকে বিশ্ববিদ্যলয়ে আবেদন করতে হয়। বিশ্ববিদ্যলয় বিবেচনা করলে পুনরায় ছয় মাস বাড়বে, আর না বিবেচনা করলে তাঁর চাকরি সেখানেই শেষ।
এদিকে, সদ্য চাকরি পাওয়ারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি জায়গায় চাকরি পেয়ে তারা উপাচার্য আবদুস সোবহানের প্রতি কৃতজ্ঞ। একই সঙ্গে আবার অসন্তুষ্ট। তিনি তাদের নিয়োগকে স্থায়ীভাবে করে দিয়ে যেতে পারেননি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আগে থেকেই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। সেটাও তারা মনে করেছিলেন একসময় উঠে যাবে।
কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তারা জানতে পারেন, আলাদাভাবে এই ১৪১ জনের নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে তদন্ত কমিটি ঘোষণা করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ জন্য তারা তাদের চাকরি স্থায়ী করতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে বেশ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তবে কেউ কেউ বলছেন, তাঁদের চাকরি কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।
তারা আরও বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অ্যাডহকে নিয়োগপ্রাপ্তদের পরবর্তী সময়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে স্থায়ী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার নজির রয়েছে। তারা এখন যেভাবেই হোক চাকরি পেয়েছেন। তাদের এখন কাজ হচ্ছে চাকরিকে স্থায়ী করা। এটা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং। সামনে কে উপাচার্য হবেন, কোন প্রশাসন ক্ষমতায় আসে, তার ওপর নির্ভর করছে মূলত তাদের চাকরি। আপাতত তারা চাকরি পাওয়ার আনন্দে থাকলেও ভেতরে চাপা কষ্ট রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. সাইফুল ইসলাম ফারুকী বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের নিয়োগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা ছিলই। উপাচার্যের বিরুদ্ধেও একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাকে তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শেষ দিনে ১৪১ জনকে নিয়োগ দিয়ে গেলেন। এটাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবৈধ ঘোষণাও করেছে। এভাবে এই প্রক্রিয়ায় চাকরিপ্রাপ্তরা তো ঠিক থাকতে পারে না। তাদের অবশ্যই চাকরি স্থায়ীকরণের ব্যাপারে নিরাপত্তাহীনতা বা অনিশ্চয়তায় থাকার কথা। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকার উপাচার্যের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি মনে করেন।

মে ০৮
০২:২৫ ২০২১

আরও খবর