Daily Sunshine

নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা যৌক্তিক নয় : সাক্ষাৎকারে রাবি উপাচার্য

Share

এনায়েত করিম : ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্য হিসেবে দ্বিতীয় দফার পূর্ণ মেয়াদ আগামী ৬ মে (বৃহস্পতিবার) সম্পন্ন করতে যাচ্ছেন অধ্যাপক ড. এম আব্দুস সোবহান। তার দায়িত্ব পালনকালে দেশের দ্বিতীয় ও উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ এই বিদ্যাপিঠের উন্নয়ন, শিক্ষা-গবেষণাসহ নানা অর্জন নিয়ে দৈনিক সানশাইনের সাথে কথা বলেছেন রেকর্ড দুইবারের উপাচার্য। নিয়োগসহ অনিয়ম-অভিযোগের বিষয়েও আলোকপাত করেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এনায়েত করিম।

সানশাইন : দু’বার দায়িত্ব পালন করলেন পূর্ণ মেয়াদে, যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিহাসও বটে। আপনার সময়ে ক্যাম্পাসে বিশেষ কোনো অগ্রগতি, যা নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট?

উপাচার্য : ক্যাম্পাসের অগ্রগতি বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক অগ্রগতি বুঝায়। ২০০৯ থেকে ২০১৩ এবং ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল এই দুইপর্বে আমি আমার মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা এবং দেশপ্রেম যতটা আমার আছে তার পুরোটায় আমি নিবেদন করেছি কর্মসম্পাদনে। কতটা সফল হয়েছি সে বিচারের ভারতো আপনাদের। ভৌত অবকাঠামোগত অগ্রগতি, পঠন-পাঠন, গবেষণা, ক্রীড়া, সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। এছাড়া প্রথমবারের মতো রাবিতে ডিজিটাল আর্কাইভস প্রতিষ্ঠা, ৫০ বছরের মাস্টারপ্লান প্রণয়ন, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স এবং ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার প্রতিষ্টা করেছি। তাছাড়া শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধু কর্ণার এবং মুক্তিযুদ্ধ কর্ণার স্থাপন করা হয়েছে। অগ্রগতির তালিকা তৈরি করলে বেশ দীর্ঘ হবে। স্বশরীরে কেউ রাবি ক্যাম্পাসে এলে অগ্রগতির নিদর্শন তার চোখে পড়বেই। অগ্রগতির তো কোনো শেষ নেই। তবে আমি আমার কাজে তৃপ্ত। এখানে উল্লেখ করা একান্ত প্রাসঙ্গিক যে, ২০১০ সালে গবেষণায় রাবির পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ এবং ২০১৯ সালে রাবি সামগ্রিকভাবে গবেষণায় বাংলাদেশে ১ম স্থান অর্জন করেছে (যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা কোপাস-এর জরিপ)। ২০২০ সালে বিশ্বের ১ লক্ষ ৫৯ হাজার ৬১২জন শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর তালিকায় রাবির একজন শিক্ষক ২৮৪তম স্থান অর্জন করেছে। ২০২১ সালে স্পেনের শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিমাগো ইনস্টিটিশন কর্তৃক প্রকাশিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৪১২৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রাবির অবস্থান ১১তম (জরিপকাল ২০১৫-২০১৯)।

সানশাইন : শিক্ষক রাজনীতি করার দায়ে জেল খেটেছেন। শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন। খোদ সরকারপন্থীরাও নানা ভাগে বিভক্ত। কি বলবেন এ রাজনীতি নিয়ে?

উপাচার্য : দেখুন শিক্ষকরা ফুলটাইম রাজনীতিবিদ নয় এবং হওয়া উচিৎও নয় যতক্ষণ এই পেশার সঙ্গে যুক্ত আছেন। তবে প্রতিটি নাগরিকের মত শিক্ষকেরও একটি রাজনৈতিক দর্শন ও আদর্শ থাকবে। আমার রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দর্শন-আর আমার আদর্শ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর সুযোগ্যতম কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা। সেই ১৯৬৯ সালে আমি যখন এসএসসি পরীক্ষার্থী- শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত হয়ে তৎকালীন সারা পূর্ব-পাকিস্থানে ৬ দফার সমর্থনে জনসভা করে চলেছিলেন-তখন তাঁকে দেখেছি এবং তাঁর আদর্শকে ধারণ করেছি। জেল খাটার বিষযটি ১/১১ অর্থাৎ ২০০৭ সালের ঘটনার বিষয়। জননেত্রীকে অন্যায়ভাবে জেলে নেওয়া হলো। আমি তখন রাবির প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের নির্বাচিত আহবায়ক। আমার নেতৃত্বে জননেত্রীর মুক্তির আন্দোলন করা হয়। সুতরাং তৎকালীন সরকার আমাকে গ্রেফতার, রিমান্ড এবং শেষপর্যন্ত শ্রীঘরে ১০৪ দিন। তবে এই জেল খাটা আমার জীবনের গর্ব ও অহংকার। শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে নানামূখী প্রশ্ন- তার কারণ শিক্ষকদের মধ্যে কিছুসংখ্যক ফুলটাইম রাজনীতিকের মতো, তবে সে রাজনীতি কদর্যতাপূর্ণ। আপনি বলছেন খোদ সরকারপন্থী শিক্ষকরাও নানাভাবে বিভক্ত- হ্যাঁ এটি সত্য, তবে এর কারণ উচ্চাভিলাষী প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার বেদনা।

সানশাইন : আপনার প্রশাসনের বিরুদ্ধে দূর্নীতির তদন্ত করেছে ইউজিসি। এ নিয়ে মন্তব্য জানতে চাই।

উপাচার্য : ইউজিসির তদন্ত একপেশে-পক্ষপাতমূলক। যে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত কমিটি-সেগুলি আমলযোগ্য কিনা সেইটি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। যারা অভিযোগ করেছে তাদের মধ্যে প্রধানতম দুইজনের বিরুদ্ধে লক্ষ ও কোটি টাকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাবি প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তকাজে উভয়েই অসহযোগিতা করেছে। উপরন্তু তাদের মধ্যে একজন উচ্চ আদালতে রিট করে তদন্ত কাজ স্থগিত করিয়েছে। এই যে, আর্থিক দূর্নীতির জন্য তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি-এইটিই বর্তমান প্রশাসনের জন্য কাল হয়ে গেল। তখন থেকেই ওই দুইজন এবং তাদের কয়েকজন অনুসারী মিলে আমার বিরুদ্ধে খোড়া অভিযোগ বিমক ও শিক্ষামন্ত্রণালয়ে পাঠাতে থাকে। খোড়া অভিযোগের মূল হলো শিক্ষক নিয়োগে নিম্নমানের (তাদের ভাষায়) নীতিমালা প্রণয়ন। দেখুন যেকোনো নিয়োগনীতিমালা প্রণয়ন রাবি অ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুসরণ করে সকল প্রক্রিয়া সম্পাদন শেষে সিন্ডিকেট কর্তৃক চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। উপাচার্যের এককভাবে এখানে কিছু করার নেই। তদুপরি ২৫ অক্টোবর ২০২০ সালে আমি সকল মিডিয়ার শতাধিক সাংবাদিকের উপস্থিতিতে ২ ঘণ্টাব্যাপী সম্মেলন করেছি এবং সকল প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে দিয়েছি। আমি আমার অবস্থান সরকার ও দেশবাসীর নিকট পরিষ্কার করেছি। অধিকন্তু আমি নিজে দাবি করেছি আমার বিরুদ্ধে কোনো রকম দূর্নীতি যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক তদন্ত করতে।

সানশাইন : নিয়োগে নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে কি বলবেন?

উপাচার্য : এ ব্যাপারে একটি ভূমিকা দেয়া দরকার। ২০১৩ সাল থেকে অদ্যাবধি ৮ বছরব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো কর্মকর্তা বিশেষ করে কর্মচারী নিয়োগ হয়নি। প্রতিবছর অবসরজনিত কর্মচারী পদ শূন্য হয়। ফলে প্রশাসন, বিভাগ, হল ও অন্যান্য দপ্তর কর্মচারী স্বল্পতায় প্রয়োজনীয় কার্যাদি সম্পাদনে নাকাল অবস্থায়। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি কর্মচারী ২০০টি শূন্যপদ বিজ্ঞাপিত হয়। বহু সংখ্যক আবেদনকারীর লিখিত পরীক্ষা সম্পন্ন ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন শেষে যখন মৌখিক পরীক্ষায় তাদেরকে ডাকা হবে-সে সময় মহামারী করোনার হানা। ফলে মৌখিক পরীক্ষা সাময়িক বন্ধ রাখি। ডিসেম্বর ২০২০ এর শুরুর দিকে মৌখিক পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল হঠাৎ ১৩ ডিসেম্বর সকাল ১০টা ৪৭ মিনিটে ইমেইলে শিক্ষামন্ত্রণালয় থেকে সকল প্রকার নিয়োগের (প্রশাসনিক কারণে) স্থগিতাদেশটি আসে। অবশ্য এই নিষেধাজ্ঞা আসার পূর্বে ক্যাম্পাসে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারীরা জোর চেষ্টা চালাচ্ছে মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগ নিষেধাজ্ঞা আনতে, যাতে আমার সময় কোনো নিয়োগ না হয়। অবশেষে গুঞ্জন বাস্তবে পরিণত হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ একটি স্বাভাবিক চলমান প্রক্রিয়া। নিষেধাজ্ঞায় আমার কোনো অনুতাপ নেই। এরপর যিনি এই পদে আসবেন তাঁকে এই নিয়োগ দিতে হবে। কেননা, বিশ্ববিদ্যালয় খুলে গেলে এই নিয়োগ না দেয়া পর্যন্ত নিত্যদিনের কার্যসম্পাদনে প্রশাসন মুখথুবরে পড়বে। আমি মনে করি এই নিষেধাজ্ঞা যৌক্তিক নয়।

সানশাইন : আপনার মেয়ে-মেয়ের জামাইয়ের নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা আছে। এর জবাবে আপনার ব্যাখ্যা কি?

উপাচার্য : দেখুন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালায় উল্লেখিত যোগ্যতায় যোগ্যতাসম্পন্ন যে কোনো ব্যক্তি আবেদন করতে পারেন। আবেদন করলেই সকলেই নিয়োগ পাবেন এমনতো নয়। কেননা এটি হলো আবেদন করার যোগ্যতা। পরবর্তীতে চূড়ান্ত নিয়োগের সুপারিশ করে নিয়োগ নির্বাচনী বাছাই কমিটি (সিন্ডিকেট কর্তৃক গঠিত)। আবেদনকারীগণ এদেশের নাগরিক এবং প্রত্যেকেই এদেশের নাগরিকদের কারো পুত্র, কারো কন্যা, জামাই, বৌমা ইত্যাদি, যে যোগ্যতায় এদেরকে নিয়োগ দেয়া হয় ঠিক একই যোগ্যতায় উপাচার্যের আত্মীয়-স্বজনের নিয়োগ হলে এটি কি অপরাধ? অভিযোগকারীদের অধিকাংশের একাডেমিক রেজাল্ট উপাচার্যের জামাই-মেয়ের রেজাল্টের অনেক নিচে। বিশ্বের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োগ একমাত্র একাডেমিক রেজাল্ট নয়। তা যদি হতো তবে নিয়োগ নির্বাচনী বাছাই কমিটির প্রয়োজন হতো না।

সানশাইন : বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউজের জমি কেনাসহ সাবেক উপাচার্য ড. মিজান উদ্দীন প্রশাসনের বিরুদ্ধেও বেশ কয়েকটি দূর্নীতির তদন্ত হচ্ছিল। এখন কোন পর্যায়ে ?

উপাচার্য : বিষয়টি দূর্নীতি দমনকমিশনের (দুদক) তদন্তাধীন ২০১৭ সাল থেকে। দুদক-কে সহায়তা প্রদানের জন্য বর্তমান রাবি প্রশাসন সিন্ডিকেট কর্তৃক একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে এবং এই কমিটি ২৮৮ পৃষ্টার প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সিন্ডিকেট কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার পর ২০১৯ সালের ২৫/২৬ ফেব্রুয়ারি বিমক, দুদক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছে।

সানশাইন : স্বায়ত্বশাসিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ বাড়ছে বলে মনে করা হয়। এর প্রভাব কি বলবেন।

উপাচার্য : বিষয়টি এমন নয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৪টি বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের এ্যাক্ট দ্বারা পরিচালিত হয়। স্বায়ত্বশাসনের ধারণাটা অনেকের কাছেই পরিষ্কার নয়। স্বায়ত্বশাসন একাডেমিক বিষয়- অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব একাডেমিক কোর্স কারিক্যুলাম, শিক্ষা সহায়ক কারিক্যুলাম এবং শিক্ষাতিরিক্ত কারিক্যুলাম তৈরি করবে। কিন্তু আর্থিক বিষয়ে সরকারের আর্থিক নিয়মাবলী অনুসরণ করতে হবে। এ্যাক্ট-এর কপি মন্ত্রণালয়ে আছে এবং এর আলোকে মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। ব্যতিক্রম ভুলবশত হতে পারে।

মে ০৪
০৩:২১ ২০২১

আরও খবর