Daily Sunshine

এবছর কর্মচঞ্চল নয় কালুহাটি পাদুকাপল্লী

Share

মিজানুর রহমান, চারঘাট: চারঘাট বড়াল নদের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা কালুহাটি গ্রাম। গ্রামে ছোট্ট ছোট্ট ঘর, তার মধ্যে বসে নানাবয়সী মানুষ তৈরি করছে বাহারি রঙের স্যান্ডেল ও জুতা। নারী-পুরুষের বাহারি জুতা তৈরি করা এ গ্রামটি আশপাশের সবার কাছে ‘পাদুকা পল্লী’ নামেই পরিচিত। এখানকার তৈরি বাহারি জুতা স্যান্ডেল যাচ্ছে গোটা উত্তরবঙ্গসহ রাজধানীতেও। দারিদ্র্য ঘোচানো গ্রামটিতে কোন বেকার নেই বললেই চলে। গত কয়েক বছরে অভাবী গ্রামের চেহারা পাল্টে কালুহাটি এখন ঝকঝকে কর্মচাঞ্চল্যের সাফল্যমতি একটি গ্রাম। নানা সঙ্কট থাকলেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় এ শিল্পটি। স্থানীয়রা স্বপ্ন দেখছেন একদিন বিশ^বাজারে রফতানি হবে কালুহাটির তৈরি পাদুকা। সেই স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে চলেছে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার নিমপাড়া ইউনিয়নের কালুহাটি গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে জুতা-স্যান্ডেল তৈরির বিভিন্ন কারখানার সাইনবোর্ড। একেকটি ঘরই যেন একেক কারখানা! আর কারখানা ঘিরেই তাদের জীবন জীবিকা আর স্বপ্ন। সারাবছরই কর্মচাঞ্চল্য থাকা গ্রামটিতে রোজা এবং ঈদ কেন্দ্র করে ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েক গুণ বেশি। তবে এ বছর ব্যস্ততার ছন্দপতন ঘটেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারনে এ শিল্পে ভাটা পড়েছে। কর্মচঞ্চল এ গ্রামে এখন অলস সময় পার করতে হচ্ছে পাদুকা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের। একদিকে জুতা সেন্ডেল তৈরীর কাচামালের দাম উর্দ্ধমুখি, অন্যদিকে করোনার কারনে চাহিদা কমে গেছে। ফলে চরম দুর্বিসহ ভাবে চলছে জীবনমান।
সরজমিনে গিয়ে পাদুকা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে জানাগেছে, সারা বছর কাজ কম থাকলেও রোজার ঈদকে ঘিরে পাদুকা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের থাকে অনেক আশা ভরসা। তবে গত দুই বছর ধরে বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারনে এ শিল্পের দুর্দিন যাচ্ছে। কর্মহীন হতে হচ্ছে এর সঙ্গে জড়িতদের। ফলে অনেক কারখানাকে গুনতে হচ্ছে ব্যাপক লোকসান। আর এ লোকসান উঠাতে না পারলে অনেককে পথে বসতে হবে।
পাদুকা শিল্পের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা বলেন, আমরা সারা বছর অনেক কষ্টে কারখানা গুলো খুলে রাখি বছরের দুটি ঈদকে ঘিরে। তবে গত কয়েক বছর ধরে বৈশ্বিক করোনার কারণে এ শিল্পে ব্যাপক ক্ষতির প্রভাব পড়েছে।
তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন জটিলতা আর অপরিকল্পিত ভাবে কারখানাগুলোর ব্যবসা করে আসলেও ২০১০ সালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আমাদের সার্বিক ভাবে দিকনিদের্শনা দিয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধমে এ শিল্পের বিকাশ ঘটেছে।
তিনি বলেন, চারঘাট-বাঘার অভিভাবক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সবসময় আমাদের খোজ খবর নেন। তারপরও বৈশ্বিক করোনায় গোটা বিশ্ব যখন টালমাটাল তখন আমাদের দেশের জুতা শিল্পের অবস্থাও করুন। অনেক জুতা-সেন্ডেলের দোকানপাট এখনো ব্যবসা সফল করতে পারছে না। ফলে এ বছর আমাদের লোকসান অনেক।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় এক দশক পরেও এ কালুহাটি গ্রামের বেশির ভাগ পরিবার ছিল নিম্ন আয়ের। ওই সময় গ্রামের অত্যন্ত অভাবী পরিবারের ১২-১৫ বছরের ছেলে আমিরুল ইসলাম আর বারিক ঢাকায় সিদ্দিক বাজারে কাজ নেন একটি জুতা-স্যান্ডেলের কারখানায়। টানা ৯ বছর সেখানেই কাজ করেন। ১৯৮৫ সালের দিকে আমিরুলের মাথায় আসে, এ কাজ তারা গ্রামের মানুষকে শেখালে গ্রামের অভাব দূর করা সম্ভব।
তিনি গ্রামে চলে আসেন কিন্তু তখনও তার একটি কারখানা করার মতো পুঁজি হয়নি। তিনি গ্রামের মানুষকে ব্যবসায়ের সম্ভাবনার কথা বোঝালেন। ব্যবসা নিয়ে সে সময় আশঙ্কায় কেউ এগিয়ে আসতে চায়নি। এমন পরিস্থিতিতে গ্রামের বেকার যুবক নওশাদ আলী সরকার। তিনি কারখানায় পুঁজির যোগান দিলেন। একটি ঘর নিয়ে তারা কারখানা শুরু করেন। একটা সময় সৈয়দ নামের এক ব্যক্তিও কাজ করেন। শুরু হলো কাঁচামাল কিনে নিয়ে এসে জুতা-স্যান্ডেল তৈরি আর বাজারে বিক্রি। এভাবে দিনে দিনে ব্যবসার সম্ভাবনার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। একে একে অনেকেই কাজ শিখতে থাকে। এই গ্রামের অনেকেই তা কাছে সরাসরি কাজ শিখেছেন বলেও জানা যায়।
বর্তমানে আমিরুল সুজ নামে নিজের বাড়িতেই দিনরাত শ্রমিকসহ কাজ করেন এ উদ্যোক্তা। আমাদের এ কাজটা ভাগ্যের পরিবর্তন করে দিয়েছে। ভাল লাগে এখন সবাই এ কাজ করছে। আগে কেউ করতে চায়নি। আমাদের গ্রামটি এখন অনেক পাল্টে গেছে।
পাদুকার উন্নয়নে ২০১০ সালে চারঘাট-বাঘা আসনের সাংসদ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে অনেকেই ট্রেনিং পেয়েছেন। একই সময় ব্যবসায়ীদের এক ছাতার নিচে আনতে কালুহাটি পাদুকা শিল্প মালিক সমবায় সমিতি লি. গঠন করা হয়। যার সদস্য বর্তমানে ১১৭।
বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড হুগো বসের জুতায় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ দেখে নিজের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে এ কালুহাটির পাদুকা পল্লীর সফলতাকে আরও বড় কিছু করার স্বপ্নের কথা লেখেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সাংসদ শাহরিয়ার আলম। তার স্বপ্নের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও আশায় বুক বেঁধেছেন একদিন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশে^র বিভিন্ন বাজারে যাবে কালুহাটির তৈরি জুতা।

মে ০৩
০৩:০১ ২০২১

আরও খবর