Daily Sunshine

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আজ

Share

সানশাইন ডেস্ক : …‘পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত/ ঘোষণার ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলে/নতুন নিশান উড়িয়ে/ দামামা বাজিয়ে দিগি¦দিক/ এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে হে স্বাধীনতা।’
নিত্যদিনের মতো আজও ভোরের সূর্যালোকের বর্ণচ্ছটায় রাঙাবে কৃষ্ণচূড়া, গ্রামীণ পথের শেষে নদীর তীরে অশ্বত্থ শাখা থেকে ভেসে আসবে কোকিলের কুহুতান, শ্যামল প্রান্তরের দূর-দূরান্ত থেকে আজ বাজবে রাখালিয়ার মনকাড়া বাঁশির সুর, নীল আকাশের বুকে ডানা মেলবে উড়ন্ত বলাকার ঝাঁক, কলকাকলিতে মুখরিত হবে জনপদ।
তবুও অন্য যে কোন দিনের চেয়ে আজকের দিনটি সম্পূর্ণ আলাদা। ভিন্ন আমেজের, ভিন্ন অনুভূতির। কারণ আজ শুধুই স্বাধীনতা দিবস নয়, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি, বাঙালী জাতির হাজার বছরের লালিত স্বপ্নের মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গৌরবের অধ্যায়। উদ্যাপনের শ্রেষ্ঠতম মুহূর্ত। আজকের দিনে বাঙালী তার স্বর্ণ অতীতের দিকে ফিরে তাকাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নেয়ার নতুন শপথ, নব উজ্জীবন ঘটবে জাতীয় জীবনে।
আজ ২৬ মার্চ। রক্ত, অশ্রুস্নাত বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহের দিন। বাঙালীর শৃৃঙ্খলমুক্তির দিন। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের সুবর্ণজয়ন্তী। বাঙালীর দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলনের চূড়ান্ত লড়াইয়ের সূচনাকাল। বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকা ওড়ানোর দিন আজ। মহার্ঘ্য স্বাধীনতা। কিন্তু বাঙালী জাতিকে এ জন্য দিতে হয়েছে চরম মূল্য। দেখতে দেখতে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হলো। একদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। অন্যদিকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এই দুই মাহেন্দ্রক্ষণ দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
স্বাধীনতার ৫০ বছর। সুবর্ণজয়ন্তীকে স্মরণীয় করে রাখতে দেশব্যাপী চলছে নানা বর্ণিল আয়োজন। আগামী ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস পর্যন্ত দেশব্যাপী একযোগে উদযাপিত হবে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। একদিকে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। অন্যদিকে আজ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। দুইয়ে মিলে এক অন্যরকম বাংলাদেশ। বাঙালী মেতেছে তাই এক অনন্য উৎসবে। জাতীয় জীবনের এই মহিমান্বিত সময়কে কালের রেখায় ধরে রাখতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে চলছে দশ দিনব্যাপী উৎসবের মহাযজ্ঞ। শহরজুড়ে তাই এখন রঙিন আলোর ঝলকানি। সত্যিই এক অন্যরকম অনুভূতি। জাতির সামনে এসেছে মহান স্বাধীনতা দিবস, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী।
দেশের মহার্ঘ্য স্বাধীনতার ৫০ বছরের এই ক্ষুদ্র পরিসরে দেশ ও জাতি অনেক ঘটন-অঘটন, চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষী হয়েছে। সময়ে সময়ে এসব ঘটনা সমগ্র জাতিকে প্রচ- ঝাঁকুনি দিয়েছে, পাল্টে দিয়েছে এর গতিপথ। কখনও জাতির জীবনে এসেছে হতাশা-অন্ধকারাচ্ছন্ন মুহূর্ত, কখনওবা হয়েছে সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় উজ্জীবিত।
যদিও ৫০ বছর একটি জাতির জীবনে খুব বড় পরিসর নয়। গড় আয়ুর নিরিখে হয়তবা একটি প্রজন্ম মাত্র। তথাপি পরাধীনতার শিকল ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা সহস্র বছরের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ আত্মমর্যাদায় বলীয়ান একটি জাতির সামনে অর্ধশতাব্দীর এই মাইলফলক অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে। যেমনটি টানা তৃতীয় মেয়াদে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে গত ১২ বছরে বদলে গেছে বাংলাদেশ। নতুন প্রজন্মের সামনে উদঘাটিত হয়েছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের সত্য ও সঠিক ইতিহাস। ইতিহাসের খলনায়করা হারিয়ে গেছে সত্য ইতিহাসের বিশাল স্তূপের নিচে। স্বাধীনতার এই ৫০ বছরের মধ্যে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যাপরবর্তী দীর্ঘ ২১ বছর এবং পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোটের পাঁচ বছরে পুরো জাতি দেখেছে স্বাধীনতাবিরোধী, একাত্তরের গণহত্যাকারী ও জাতির পিতার খুনীদের আস্ফালন, ইতিহাস বিকৃতির ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র আর স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম মুছে ফেলার নগ্ন আস্ফালন। কিন্তু সত্য ইতিহাসকে কখনও মিথ্যা দিয়ে ঢাকা যায় না, তা আজ প্রমাণিত হয়েছে।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে বঙ্গবন্ধু আজ শুধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীই নন, বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত মানুষের মুক্তির অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তাঁরই নির্দেশিত পথে তাঁরই জ্যেষ্ঠ কন্যার হাত ধরে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের বিস্ময়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাণশক্তি, সারাবিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেল। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণেই বাংলাদেশ পেয়েছে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বের বুকে স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বীর বাঙালী জাতি। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল এ বদ্বীপের মানুষ। ইতিহাসের পৃষ্ঠা রক্তে রাঙিয়ে, আত্মত্যাগের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে একাত্তরের এই দিনে যে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের মানুষ, দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন তার চূড়ান্ত পরিণতি। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের সূচনার সেই গৌরব ও অহঙ্কারের দিন আজ। প্রতিবছর মহান স্বাধীনতা দিবস জাতির জীবনের প্রেরণায় উজ্জীবিত হওয়ার নতুন বার্তা নিয়ে আসে।
ভয়াল ‘কালরাত্রি’র পোড়া কাঠ, লাশ আর জননীর কান্না নিয়ে রক্তে রাঙা নতুন সূর্য উঠেছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। ভয়াল কালরাতের ধ্বংসস্তূপ আর লাশের ভেতর দিয়ে রক্তরাঙা সেই নতুন সূর্য। ভীতবিহ্বল মানুষ দেখল লাশপোড়া ভোর। সারি সারি স্বজনের মৃতদেহ। আকাশে কু-লী পাঁকিয়ে উঠছে ধোঁয়া। পুড়ছে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র আঁকা লালসবুজ পতাকা। জ্বলছে শাড়ি, খুকুর ফ্রক। চোখে জল। বুকে আগুন। জ্বলে উঠল মুক্তিকামী মানুষের চোখ, গড়ল প্রতিরোধ। মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ‘জয় বাংলা’ তীব্র সেøাগান তুলে ট্যাঙ্কের সামনে এগিয়ে দিল সাহসী বুক।
একাত্তরের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানী হিংস্র শ্বাপদের গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। শত্রুসেনাদের বিতাড়িত করতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবনপণ সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালী। দীর্ঘ ন’মাস এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে হাজার বছরের বাঙালীর শ্রেষ্ঠতম অর্জন; মহান স্বাধীনতা।
আজ ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালী জাতির জীবনে সূচনা ঘটবে আরও একটি ঝলমল উৎসব দিনের। রক্ত, অশ্রুস্নাত, বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহের দিন ২৬ মার্চ। এ ভূভাগের সবচেয়ে বড় অর্জন, বাঙালীর সহস্র বছরের জীবন কাঁপানো ইতিহাস- মহান স্বাধীনতা। অসংখ্য শহীদের রক্তে ভেজা, জাতির বীরসেনানীদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের সূচনার দিন। বাঙালীর স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিন। গৌরব ও স্বজন হারানোর বেদনার এই দিনে বীর বাঙালী সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেছিল। তাই আজ গৌরব ও অহঙ্কারের দিন।

মার্চ ২৬
০৬:১৬ ২০২১

আরও খবর