Daily Sunshine

উন্নয়ন বঞ্চিত নাচোলের পাঁচ গ্রাম

Share

এ কে এস রোকন, নাচোল থেকে ফিরে: তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা বাংলাদেশের গ্রামগুলোও এখন উন্নয়নের দিকে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। গ্রাম পর্যায়ে মিলছে মৌলিক সুবিধার পাশাপাশি ইন্টারনেট সুবিধাও।
কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার আদিবাসী অধ্যাষিত ৫টি গ্রামে নেই মৌলিক সুযোগ সুবিধা। প্রত্যন্ত এ পাঁচটি গ্রামের অবস্থান চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার ৪নং নেজামপুর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে। দেড় শতাধিক পরিবার বেষ্টিত এ পাঁচ গ্রাম ঘুরলে দেখা যায় গ্রামগুলো বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হলেও শিক্ষার আলো এখন নিভু নিভু অবস্থায়। যাতায়াতের ভরসা একমাত্র কাঁচা রাস্তা বছরের অর্ধেক সময়ই থাকে কাদাময়।
মৌলিক সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এ পাঁচ গ্রামের বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় সদাই কেনার দরকার পড়লে দৌড়াতে হয় ৪ থেকে ৮ কিলোমিটার পথ। নিজ দেশে পরবাসীর মতো জীবনযাপন বেশিরভাগ কৃষিশ্রমের সঙ্গে জড়িত এ গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের।
গ্রামগুলোয় সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরই বসবাস। অন্য যারা আছেন, তারা কৃষিজমির জন্য অস্থায়ীভাবে বাথানে থাকেন। সম্প্রতি এ পাঁচটি গ্রাম সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পাঁচ গ্রামে যাওয়ার জন্য বেশ কয়েকটি রাস্তা থাকলেও সেখানকার বাসিন্দারা ব্যবহার করে থাকেন দুটি রাস্তা।
একটি হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আমনুরা ধিনগর বাজার দিয়ে, অন্যটি নাচোল উপজেলার প্রবেশদ্বার ইলা মিত্র গেট সংলগ্ন বহরইল গ্রাম হয়ে। দুটি রাস্তার কিছু অংশ পাকা থাকলেও বেশির ভাগই কাঁচা। দুটি রাস্তায়ই মিলিত হয়ে এক হয়েছে তুহিনের মোড়ে, যেখানে বসবাসের জন্য ঘরবাড়ি না থাকলেও দু-তিনটি চায়ের স্টল রয়েছে। তুহিনের মোড় থেকেই একটি রাস্তা গেছে ধরইল দিঘীপাড়া ও শ্যামপুর গ্রামে।
আরেকটি রাস্তা গেছে লইলাপাড়া, জমিনকমিন, বাসুগ্রাম হয়ে কার্তিকপুর। সবচেয়ে দূরের গ্রাম হচ্ছে কার্তিকপুর, দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। এরপর বাসুগ্রাম। আরেকটি রাস্তা আছে তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত কেন্দুয়া-ঘাসুড়া গ্রাম হয়ে নাচোল যাওয়ার। তবে এ রাস্তাটি জঙ্গলবেষ্টিত এবং গা-ছমছমে ভাব থাকায় এটির ব্যবহার হয় না। নাচোল উপজেলায় গ্রামগুলোর অবস্থান হলেও গ্রামের মানুষের ভরসা সদর উপজেলার আমনুরা বাজার। প্রশাসনিক কাজ ছাড়া তাদের নাচোল যাওয়া হয় না বললেই চলে।
এ পাঁচ গ্রামের একটিতেও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চোখে পড়ে না। বাসুগ্রাম ও কার্তিকপুর এলাকায় কারিতাসের একটি স্কুল থাকলেও সেটি বন্ধ হয়ে গেছে ১৫ বছর আগে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যেসব সদস্যের সামর্থ আছে, তারা তাদের সন্তানকে বাইরে রেখে লেখাপড়া করান। ৫ গ্রামের মধ্যে কার্তিকপুরে একটি, বাসুগ্রামে একটি, ধরইল দিঘীপাড়ায় দুটি এবং শ্যামপুরে দুটি চা-স্টল থাকলেও নেই হাটবাজার, বা কোনো মুদি দোকান। এর মধ্যে কেবল বাসুগ্রামের চা-স্টলে একটি ফ্রিজ দেখা গেছে। পাঁচ গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত অনেক কাল থেকেই। গুরুতর কোনো রোগীকে চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হলে বর্ষার সময় খাটিয়াতে নিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। বেশি বিড়ম্বনায় পড়তে হয় প্রসূতিদের নিয়ে। আর বিদ্যুৎ থাকলেও পানির সংকটও রয়েছে গ্রামটিতে।
তবে ধরইল দিঘীপাড়া ও শ্যামপুরের চিত্র অন্যগ্রামগুলোর থেকে একটু ভিন্ন। এ দুই গ্রাম থেকে আমনুরা বাজারের দূরত্ব ৪-৫ কিলোমিটার হওয়ায় এখানকার ছেলেমেয়েরা স্কুলে যায়, তবে সেটাও সংখ্যায় কম। তুলনামূলকভাবে এ দুই গ্রামের শিক্ষার হার একটু বেশি হলেও গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জামনি, পারগান ও সুমিত্রা হেমরম রা অবহেলিত ঐ গ্রামগুলোর ন্যায় তাদের গ্রামের সমস্যারও সমাধান চান।
স্থানীয়দের দাবি, পাঁচ গ্রামের মাঝামাঝি কোনো স্থানে স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ রাস্তাঘাট পাকাকরণ, সপ্তাহে একদিনের জন্য হলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন ও হাটবাজার বসানো। তাদের আক্ষেপ ৪ থেকে ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নিয়মিত ভোট দিলেও এ গ্রামগুলোয় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আসেন কালেভদ্রে।
এলাকার মান্যবর এবং নেজামপুর ইউপির ২নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সনাতন মুর্ম বলেন, প্রায় ২৬টি পরিবারের বসবাস কার্তিকপুরে। আর এসব পরিবারে খাবার পানি সরবরাহের জন্য একটি মটর রয়েছে। নষ্ট হয়ে গেলে তখন বিএমডিএ’র গভীর নলকূপই ভরসা।
তিনি দুঃখের সঙ্গে বলেন, হঠাৎ করে কোনো পণ্যের প্রয়োজন হলে ৭-৮ কিলোমিটার দূরে যেতে হয় কেনার জন্য। শুকনা মৌসুমে তাও একটু সুবিধা, বর্ষার সময় তো কথাই নেই। কাদাপথ মাড়িয়েই পথ চলতে হয়।
কার্তিকপুরের শেফালী হেমরমের চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে আলাপচারিতায় জানা গেল গ্রামের বিভিন্ন সমস্যার কথা। তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। তার ছেলেকে বাইরে রেখে লেখাপড়া করাচ্ছেন। শুধু তার ছেলেই নয় এ গ্রামের প্রায় ১৫-২০ জন বাইরে থেকে লেখাপড়া করছে এবং গ্রামটিতে একজনই ডিগ্রি পাস রয়েছেন। চা স্টলের এ মালিক আরো বলেন, আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। রাস্তা নেই, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, লেখাপড়া করানোর সুযোগও নেই। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শেফালী বলেন, কবে যে এসবের সমাধান হবে।
এরপর কথা হয় বাসুগ্রামের পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব প্যাট্রিকের সঙ্গে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন, নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলা থেকে। দুই মেয়ের বড়টিকে বাইরে রেখে লেখাপড়া করাচ্ছেন। আরেক গ্রামবাসী শিবনাথ (৪২) তার এক ছেলে ও দুই মেয়েকে বাইরে থেকে লেখাপড়া করাচ্ছেন। তাদের দাবী, কার্তিকপুরে কারিতাসের স্কুল বন্ধ হওয়ার পর বাসুগ্রামের খুব কমসংখ্যকই লেখাপড়া করে। গ্রামটিতে একটি কালীমন্দির আছে এবং নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চাও হয়। আর পানির জন্য দুটি মটর রয়েছে, বিল পরিশোধ করেন সবাই মিলে।
এ পাঁচ গ্রাম নিয়ে কথা হয় নেজামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল হকের সঙ্গে। তিনি জানান, রাস্তার বিষয়টি উপজেলা এলজিইডি অফিসকে অবহিত করা হয়েছে এবং তারা সার্ভেও করেছে। এছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছেও বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়েছে।
নাচোল উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, এরই মধ্যে ওইসব গ্রামের রাস্তা সার্ভে করা হয়েছে এবং বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ডিপিপি অনুমোদনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে শিগগিরই রাস্তা তৈরির কাজ শুরু করা যাবে।
আর নাচোল উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল কাদের একই ধরনের উদ্যোগের কথা জানিয়ে বলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি ফেরদৌসী ইসলাম জেসি আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন রাস্তা নির্মাণের। তবে হাটবাজার প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, আশপাশের গ্রামের দূরত্ব বেশি হওয়ায় পণ্য বিক্রি হবে কিনা তা নিয়ে হাটুরেরা চিন্তিত। যে কারণে হাট বসানোর উদ্যোগ নেয়া যাচ্ছে না। আর হাট বসানো না গেলেও অন্তত কাঁচাবাজারের দোকান বসানোর চিন্তাভাবনা চলছে।
আর সাংসদ ফেরদৌসী ইসলাম জেসি জানান, গত ৬ জানুয়ারি বাসুগ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় প্রস্তাব দেয়া হয়েছে এবং কমিটি এ বিষয়ে সুপারিশও করেছে।
সেসাথে নাচোল উপজেলার বাসুগ্রামসহ সারাদেশে যেখানে সর্বনিম্ন ২ কিলোমিটারের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই সেখানেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। আর রাস্তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়েছে। নিয়মিত খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।

মার্চ ২২
০৪:৫৯ ২০২১

আরও খবর

Subcribe Youtube Channel

বিশেষ সংবাদ

ঈদের আগে ৫০ লাখ পরিবার পাচ্ছে আর্থিক সহায়তা

সানশাইন ডক্সে; করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ওয়েভে ক্ষতিগ্রস্ত ৫০ লাখ গরিব পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার চিন্তা করছে সরকার। প্রত‌্যকে পরিবারকে ২৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। ঈদের আগে মোবাইলের মাধ্যমে সুবিধাভোগী পরিবারের হাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঈদ উপহার হিসেবে এ অর্থ পৌঁছে দেওয়া হবে বলে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, সম্প্রতি

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

টিকা কার্ড নিয়ে যাতায়াত করা যাবে

টিকা কার্ড নিয়ে যাতায়াত করা যাবে

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতির কারণে ১৪ এপ্রিল সকাল ৬টা থেকে ২১ এপ্রিল মধ্যরাত পর্যন্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে এ সময়ে টিকা কার্ড নিয়ে টিকা গ্রহণের জন্য যাতায়াত করা যাবে বলে জানানো হয়েছে। সোমবার (১২ এপ্রিল) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অতি জরুরি প্রয়োজন

বিস্তারিত