Daily Sunshine

স্থবির রাবির সাংস্কৃতিক অঙ্গন

Share

রাবি প্রতিনিধি : বিকেল গড়াতেই ঢোল-তবলা আর হারমোনিয়ামের বাজনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নুপুরের ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দ ভেসে আসত সেখান থেকে। গান, নাটকের মহড়া, নৃত্য আর মন মাতানো বাঁশির সুরে মুখর থাকত ভবনটির প্রায় প্রতিটি কক্ষ। তবে করোনা পরিস্থিতিতে বন্ধ থাকা সেই ভবনটিতে এখন সুনশান নিরবতা। যেন একটুখানি নুপুরের আওয়াজ পেতে প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে সংস্কৃতি চর্চায় মুখর থাকা সেই ভবনটি। বলছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাংস্কৃতিক কর্মীদের সংস্কৃতি চর্চার তীর্থস্থান রাকসু ভবনের কথা।
করোনা সংক্রমণ রোধে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় বর্তমানে এই ভবনটিতে চলছে না কোনো সংস্কৃতি চর্চা। তবে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘জুম’, ‘গুগল মিট’, ‘ফেইসবুক রুম’ ব্যবহার করে চালাচ্ছে তাদের কার্যক্রম। যদিও সেগুলো খুব বেশি ফলপ্রসূ হচ্ছে না বলে মনে করছেন নাট্যজনরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ক্যাম্পাসে ২২ টিরও বেশি সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। যার মধ্যে নাট্য সংগঠন সমকাল নাট্যচক্র অনলাইনে ‘ফিরিয়ে দাও সেই অরণ্য’ নামক নাটকের মহড়া চালিয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটভুক্ত আটটি সংগঠন অনলাইনে কিছু প্রতিযোগিতাসহ নাটকের মহড়া ও ওয়ার্কশপ চালু রেখেছে। এছাড়া সাংস্কৃতিক সংগঠন স্বনন, অরণি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ড্রামা এসোসিয়েশন ও অনুশীলন নাট্যদল প্রত্যেকে সপ্তাহে দুটি করে লাইভ শ্রুতি গানের আসর এবং নাটক প্রচার করছে। তবে বেশ কিছু সংগঠন অনলাইনে কার্যক্রম সচল রাখলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে তা পারছে না অন্যান্য সংগঠনগুলো। আবার অনেকে কার্যক্রম শুরু করেও সেটা সচল রাখতে সক্ষম হয়নি।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মহিউদ্দিন মানিক বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সবাই ছন্দহীন জীবনযাপন করছে। তবে জোটভূক্ত আটটি সংগঠন বিভিন্ন সময় নিজেদেরকে মানসিকভাবে উৎফুল্ল রাখতে বেশ কিছু ইভেন্টের আয়োজন করেছে। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছে অনলাইন কাজের মধ্যে সকলে পাশাপাশি থেকে ভালো-মন্দ শেয়ার করার।
অনলাইন কর্যক্রম তেমন ফলপ্রসূ হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমকাল নাট্যচক্রের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, অনলাইনে কার্যক্রম চালিয়ে তেমন উপকার হচ্ছে না। অনলাইনে একটা নাটকের মহড়া শুরু করলেও আটকে আছে সেটা। তবে মানসিক প্রশান্তির জন্য আমরা একে অপরের সঙ্গে অনলাইনে যুক্ত থাকার চেষ্টা করছি।
তবে করোনায় অনলাইন কার্যক্রম বেশ ফলপ্রসূ হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কবিতা চর্চার সংগঠন স্বনন’র আহ্বায়ক তমালিকা। তিনি বলেন, এবছর সকলে সশরীরে একত্রিত হয়ে বিভিন্ন উৎসব উদযাপন করতে পারিনি। তবে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আমরা বেশ ভালোভাবে সেটা কাভার করতে পেরেছি। আমাদের বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে দেশে-বিদেশে থাকা আমাদের প্রাক্তন সংগঠক ও কর্মীরা যুক্ত হয়েছিলেন যেটা সরাসরি সম্ভব হতো না। এছাড়া তারা অনলাইনে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত আবৃত্তি চর্চা করছেন বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও গানের সংগঠন উদীচীর সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান রবীন বলেন, করোনাকালে অনলাইনে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন ছাড়া সাংগঠনিকভাবে তেমন কোন কাজ করা হয়নি। তবে এই ক্রান্তিলগ্নে ভার্চুয়ালি সর্বদা আমরা চেষ্টা করেছি সকলের কাছাকাছি থাকতে।
করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কর্মীদের মঞ্চে ফেরার আহ্বান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান বলেন, নাট্যশিল্পের মাধ্যমটি আসলে সরাসরি দর্শক এবং অভিনয় শিল্পীদের যোগসূত্র। এটা মূলত দৃশ্যকাব্য। সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাজ কখনো অনলাইনে হওয়ার কথা না। তবে বর্তমানে বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতিতে সেটা অনলাইনে পরিচালিত হচ্ছে। যেটা অন্তর্র্বতীকালীন একটা ভাবনা মাত্র। এটাকে চিরন্তন ভাবনা মনে করার দরকার নেই। যতদ্রুত সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরাসরি এই মাধমটি আবারও চালু হওয়া উচিত। নাট্যকর্মীদের সচেতন হয়ে মঞ্চে ফেরা উচিত।
বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ম্যানেজমেন্ট স্ট্যাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক বলেন, যারা নাট্য সংগঠনে কাজ করে তারা বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইনে যেসব কার্যক্রম করছে সেটা আসলে খাপ খাচ্ছে না। একেকজন একেক জায়গা থেকে যুক্ত হওয়ায় বাদ্যযন্ত্রের সুর এবং তালের সাথে অভিনয়ের টাইমিং মিলছে না। তবে নিজেদের মধ্যে একটা যোগাযোগ রক্ষার্থে নাট্যকর্মীরা এটা করছে। তবে এক্ষেত্রে শিল্পের মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যেটা মঞ্চে করা যায় সেটা অনলাইনে করা সম্ভব না। সরাসরি অভিনয়ের বিকল্প মাধ্যম অনলাইন হতে পারে না। শুধুমাত্র কর্মীদের উজ্জীবিত রাখার জন্য অনলাইনে কার্যক্রম করা যেতে পারে।
নাট্য সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরষ্কার পাওয়া এই অধ্যাপক আরও বলেন, করোনাকালে আমরা অনুশীলন নাট্যদল ‘বুদেরামের কূপে পড়া’ শ্রুতি নাটকের দুটি পর্ব লাইভ প্রচার করেছি। তাতে দেখা গেছে নেটওয়ার্কের সমস্যাসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে কোয়ালিটি ইনসিউর করা যায় নি। শিল্পের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার ফলে নাটকটির শেষ পর্বটি আমরা বন্ধ করে দিয়েছি।

জানুয়ারি ০৯
০৫:০৮ ২০২১

আরও খবর