Daily Sunshine

রাজশাহী সদর হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ

Share

রাজু আহমেদ : রাজশাহীতে ‘সদর হাসপাতাল’ নামে যে একটি হাসপাতাল ছিলো, তা হয়তো আমাদের অনেকেই জানেন না। আবার অনেকের জানা থাকলেও হয়তো ভুলেই গেছেন। তবে জেনে অবাক হবেন হাসপাতালটি কিন্তু বন্ধ করা হয়নি। এর কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় চাইলেও কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে পারছেন না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমন অবস্থায় স্থানীয়দের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের জন্য রাজশাহীর সদর হাসপাতালের কার্যক্রম পুনরায় চালুর দাবিতে নরেচড়ে বসেছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, সিভিল সার্জনসহ রাজশাহীর সচেতন মহল। তাদের দাবি, সদর হাসপাতাল পুনরায় চালু করে স্বাস্থ্য সেবা পাওয়াটা রাজশাহীবাসীর অধিকার।
সময়টা পাকিস্তান আমল। ১৯৫৮ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এসময় আইয়ুব খান পরিচালিত পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে রাজশাহী সদর হাসপাতালের কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়া হয়। এসময় রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের ইন্টার্ন ও গবেষণার জন্য রামেক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই থেকে বিশেষায়িত এই হাসপাতালটি মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের জন্য পরীক্ষাগার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পাশাপাশি রোগীদের সেবা দেয়া হচ্ছে।
রাজশাহী নগরীর হেতেমখাঁ জাদুঘরের মোড়ে অবস্থিত বিশাল জায়গা জুড়ে নির্মিত পুরাতন গোলাপি রংয়ের দুইতলা ভবনটিই ছিলো রাজশাহী সদর হাসপাতাল (সরকারি জেনারেল হাসপাতাল)। তবে এখন সেখানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধিনে পরিচালিত হচ্ছে ডেন্টাল ইউনিট।
রাজশাহী জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্য মতে, রাজশাহী জেলার একটি সিটি কর্পোরেশন ও ৯টি উপজেলায় মোট জনসংখ্যা ২৩ লাখ ৭৭ হাজার ৩১৪ জন। তবে বেসরকারি হিসেবে প্রকৃত সংখ্যা এর চাইতেও বেশি। নগরীতেই রয়েছে প্রায় ৯ লাখ মানুষের বসবাস। আর ৯টি উপজেলার প্রতিটিতে গড়ে ৩ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। সেই হিসেবে জেলার মোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬ লাখের বেশি। দেশের অন্য সব জেলার জন্য একটি করে পৃথক সদর হাসপাতাল থাকলেও, রাজশাহী জেলার এই বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের জন্য নেই পৃথক কোন জেনারেল হাসপাতাল (সরকারি ব্যবস্থাপনায়)।
রাজশাহীর স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাসহ স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতেই একটি করে জেনারেল বা সদর হাসপাতাল রয়েছে। যা স্থানীয় মানুষদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে আসছে। মেডিকেল কলেজ বা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত বিশেষায়িত হাসপাতাল। আর সদর হাসপাতালগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসাসহ সবধরণের চিকিৎসা সেবা নিশ্চত করা হয়। যেখানে কোনো ইন্টার্ন বা শিক্ষানবিশ চিকিৎসক থাকে না। শুধুমাত্র প্রফেশনাল চিকিৎসকদের দিয়েই হাসপাতালটিতে আসা রোগীদের কাঙ্খিত সেবা দেয়া হয়। এই হাসপাতাল প্রয়োজন মনে করলে বিশেষায়িত পর্যায়ের হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে উন্নত চিকিৎসার জন্য রোগীদের প্রেরণ করতে পারেন। এতে করে উভয় হাসপাতালের ওপরই চাপ কমবে। যার ফলে রোগীদের নিরবিচ্ছিন্ন চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে রাজশাহী সদর হাসপাতালটির কার্যক্রম স্থগিত থাকায় স্থানীয় ২৭ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে বা পিছিয়ে রয়েছে।
বিশেষায়িত রামেক হাসপাতালে রাজশাহী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষেরা সেবা নিতে আসছে। আর বাস্তবতার নিরিখে রামেক হাসপাতালের পক্ষে সবার চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস বলেন, ১ হাজার ২৫০ বেডের রামেক হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ রোগী বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হয় চিকিৎসা নিচ্ছেন। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে এই সংখ্যা কিছুটা কমেছে। রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলার বাইরের রোগীও সেবা নিতে আসে আমাদের হাসপাতালে। বেডের সীমাবদ্ধতা থাকলেও রোগী আসলে মানবিক কারণে আমরা তাদের ফিরিয়ে দিতে পারি না। এর সাথে রয়েছে জনবলের সীমাবদ্ধতা। ১ হাজার ২৫০ বেডের হাসপাতাল অনুপাতে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও সাপোটিং স্টাফের স্বল্পতা রয়েছে। এই পরিসংখ্যান থেকে যে কেউ বুঝতে পারবে আমাদের চিকিৎসক, নার্স ও সাপোটিং স্টাফদের কতোটা চাপ নিয়ে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। আমরা আমাদের শতভাগ সক্ষমতা দিয়ে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে চলেছি। রামেক হাসপাতালের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, আমরাও চাই রাজশাহীর সদর হাসপাতালের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হোক। এতে করে স্থানীয় রোগীরা উপকৃত হবে।
রাজশাহীর প্রবীণ সাংবাদিক আহমেদ শফিউল্লাহ বলেন, দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাজশাহীর ৮টি জেলার পাশাপাশি অন্য বিভাগ যেমন খুলনা, কুষ্ঠিয়ার রোগীরাও আসছে। তাছাড়া দেশে এই হাসপাতালের আলাদা সুনাম রয়েছে। এতে করে হাসপাতালে সবসময় রোগীতে ভর্তি থাকছে। এমনকি নির্ধারিত আসনের চাইতেও রোগী বেশি ভর্তি হচ্ছে। ফলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সেবা নিশ্চিত করতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় রাজশাহী নগরী ও জেলার স্থানীয়দের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় পৃথক কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। অথচ দেশের প্রতিটি জেলাতেই পৃথক ভাবে একটি করে জেলা সদর (জেনারেল) হাসপাতাল রয়েছে। অর্থাৎ রাজশাহীবাসী তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে হইচই হওয়া দরকার। আহমেদ শফিউল্লাহ আরো জানান, ১৯৫৮ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর রাজশাহী সদর হাসপাতালটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। পুরোনো আমলে সদর হাসপাতালটি ছিলো সিভিল সার্জনের অধিনে। মেডিকেল কলেজের হাসপাতাল হলো একধরণের মেডিকেলের ছাত্রদের ল্যাব। শুধু হাসপাতাল হলে সেখানে ছাত্র থাকবে না। সেখানে শুধুমাত্র প্রফেশনাল চিকিৎসক থাকবে। এতে রোগীরা আরো ভালো সেবা পাবে। তাই আমি রাজশাহীবাসীর পক্ষ থেকে দাবি জানাই রাজশাহীর ঐতিহ্য সদর হাসপাতালটির কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হোক।
রাজশাহী জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. এনামুল হক বলেন, দেশের সকল জেলাতেই একটি করে জেলা বা জেনারেল হাসপাতাল আছে। যেখানে স্থানীয়দের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় রাজশাহী জেলায় বিশাল পরিসরে এমন একটি হাসপাতাল থাকলেও তার কার্যক্রম স্থগিত করে দেয় তৎকালীন পাকিন্তান সরকার। তবে আশার কথা হাসপাতালটির কার্যক্রম পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২৮ নভেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম ও সচিব আবদুল মান্নানের উপস্থিতিতে রাজশাহী জেলার উন্নয়ন সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় সদর হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা ও এর কার্যক্রর পুনরায় চালুর দাবি নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। সেখানে সকল পক্ষই সদর হাসপাতাল চালুর বিষয়ে একমত পোষণ করেন। জনসংখ্যার নিরিখে শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দিয়ে স্থানীয়দের চিকিৎসা সেবা চিশ্চিত করা কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে।
রাজশাহীর স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. গোপেন্দ্র নাথ আচার্য্য জানান, রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলার মধ্যে ৭টি জেলাতেই একটি করে জেলা বা জেনারেল হাসপাতাল আছে। শুধু রাজশাহীতেই নাই। মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর রাজশাহী সদর হাসপাতালটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। এখন সেখানে মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল ইউনিট চালু আছে। বিভিন্ন মহল থেকে রাজশাহী শহরে অল্টারনেটিভ অব (বিকল্প) মেডিকেল কলেজ হিসেবে জেনারেল হাসপাতাল চালুর জন্য দাবি জানানো হচ্ছে। দেশের সব জেলাতেই একটি করে জেনারেল হাসপাতাল আছে, শুধু রাজশাহীতেই নেই। বিষয়টি নিয়ে সর্বমহলেই আলোচনা হচ্ছে। রাজশাহীতে একটি মেডিকেল হাসপাতাল আছে, আরো একটি জেনারেল হাসপাতাল থাকলে ভালো হয়।

ডিসেম্বর ০৫
০৫:৪০ ২০২০

আরও খবর

বিশেষ সংবাদ

পাথর কুড়িয়ে চলে সংসার

পাথর কুড়িয়ে চলে সংসার

স্টাফ রিপোর্টার, রাবি : ভোর ছয়টা। মাঘের কনকনে শীত। কুয়াশার চাদরে আবৃত চারপাশ। রোদ নেই, উল্টো মৃদু বাতাস বইছে। বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন সংলগ্ন জিরো পয়েন্ট স্থলবন্দরের পাশে মহানন্দা নদীতে নিজেদের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শত শত শ্রমিক। নদীর স্বচ্ছ জলে তারা সকলেই পাথর কুড়োচ্ছেন। হিমালয় থেকে উদ্ভূত হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

৪১ও ৪২তম বিসিএস পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা

৪১ও ৪২তম বিসিএস পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা

সানশাইন ডেস্ক : ৪১তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি এবং ৪২তম বিশেষ বিসিএসের এমসিকিউ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করেছে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। আগামী ১৯ মার্চ সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ৪১তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ কেন্দ্রে একযোগে হবে। তার আগে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টা

বিস্তারিত