Daily Sunshine

নিরাময় কেন্দ্রই ‘আসক্ত’

Share

রাজু আহমেদ : শিক্ষিত পরিবারের সন্তান হামিম আল ফজলে নুর শুভ্র (২৮)। দুই ভাইবোনের সংসারে বড় ছেলে শুভ্র। বাবা সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। নগরীতে ভদ্রা হজোরমোড়ে রয়েছে তিনতলা ভবন। তবে ১৮ বছর না পেরুতেই শুভ্র মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন। জানাজানির পর সংশোধনের জন্য পরিবার থেকে তাকে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়। মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে কয়েকবার রাখার পরো শুভ্রর মাদকে আসক্তি কমেনি। বরং সে জড়িয়েছে নানা অপরাধে। এখন সে রাজশাহীতে অপহরণকারী চক্রের চিহ্নিত সদস্য। নগরীর বিভিন্ন থানায় এখন তার বিরুদ্ধে অপহরণের একাধিক মামলা রয়েছে। এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে রাজশাহীর মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো আসলে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখছে মাদকে আসক্ত রেগাীদের চিকিৎসায়।
এদিকে রাজশাহীর মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ পরিচালনা নীতিমালার সরকারি গেজেট ভঙ্গ করে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হচ্ছে। প্রকাশ্যে এমন অনিয়ম জানা সত্ত্বেও কোন পদক্ষেপ নেয়নি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের রাজশাহীর কর্তৃপক্ষ। উল্টো কর্তৃপক্ষের দাবি বিয়গুলো সবার জানা!
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্র অধিদপ্তর থেকে মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের লাইসেন্স পেতে সরকারি গেজেট অনুসারে, মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালককে মাদকাসক্ত নিরাময় সম্পর্কে অভিজ্ঞতাসহ নুন্যতম স্নাতক ডিগ্রীধারি হতে হবে। পুনর্বাসন কেন্দ্রে একজন সার্বক্ষণিক এমবিবিএস ডাক্তার থাকতে হবে। একই সাথে একজন করে খণ্ডকালীন মনোবিজ্ঞানি ও মানসিক রোগ বিশেজ্ঞ চিকিৎসক থাকতে হবে। দুইজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সার্বক্ষণিক নার্স বা বয় থাকতে হবে। এছাড়া নিরাময় কেন্দ্রে থাকা রোগীদের পুষ্টি চাহিদার কথা বিবেচনা করে সপ্তাহব্যাপি খাবারের তালিকাও ঠিক করে দেয়া আছে। রোগীদের মানসিক বিনোদনের জন্য আভ্যন্তরীন খেলাধুলা ও গণমাধ্যমের ব্যবস্থাসহ কাউন্সিলিয়ের জন্য ১০ বা ২০ জনের বসার উপযোগী একটি ক্লাসরুম থাকতে হবে। এছাড়া নিরাময় কেন্দ্রে মাদকদ্রব্য ব্যবহার করা হলে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দেয়া লাইসেন্স থাকতে হবে। মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগলোকে লাইসেন্স দেয়া হয়ে থাকে আসনের ভিত্তিতে। এর মধ্যে ১০ জনের আসন, ১১ থেকে ২০ জনের আসন এবং ২০ এর অধিক আসন। এর ওপর ভিত্তি করে লাইসেন্স ফি নির্ধারণ হয়ে থাকে।
তবে রাজশাহী জেলার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলো ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশেই কোন চিকিৎসকের দেখা মেলেনি। নির্ধারিত দৈনিক খাবারের তালাকাতেও গড়মিল থাকে। নার্স বা বয় থাকলেও তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোন সার্টিফিকেট নেই। রোগীদের মানসিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত পরিবেশ নেই অধিকাংশ নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে। যে কয়টি আসনের (১০ বা ২০) জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো লাইসেন্স নিয়ে রেখেছে অকেকে তার চাইতে বেশি রোগী ভর্তি করাচ্ছে। কয়েকটি নিরাময় কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তারা ব্যবসার আড়ালে মাদক সরবরাহও করছেন।
নগরীর উপকণ্ঠ খড়খড়ি এলাকায় অবস্থিত উজ্জীবন নামের একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের কেন্দ্রে থাকা মাদকাশক্তদের সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়। অর্থের বিনিময়ে মাদক সরবরাহ করা হয়। নেই মানসম্মত পরিবেশ। এবিষয়ে উজ্জীবনের পরিচালক ইসমাইলের সাথে মোবাইল ফোনে কথা হলে, তিনি তার মাদকাশক্ত নিরাময় কেন্দ্রের কোন তথ্য দিতে রাজি হননি। কতোজন মাদকাশক্ত তাদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি রয়েছে সেই তথ্যও দেননি। উল্টো তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্র অধিদপ্তরকে দায়ী করে বলেন, কর্তৃপক্ষ কাউকেই এসংক্রান্ত তথ্য দিতে মানা করেছেন। তিনি তার প্রতিষ্ঠানে মদক বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেন।
বাঁচতে চাই সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক শামসুল কাওনাইন শান্ত রাজশাহীর মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলো সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, একজন মাদকাশক্তকে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে নিরাময়কেন্দ্রে থেকে ২বছরের কোর্স সম্পন্ন করাটা জরুরী। তবে এর জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা অনেকের পক্ষেই জোগাড় করা সম্ভব হয় না। ফলে তারা সম্পূর্ণ কোর্স শেষ না করেই নিরাময় কেন্দ্র ছেড়ে যাচ্ছেন। আর এরজন্য বদনামের ভাগিদার হতে হচ্ছে নিরাময় কেন্দ্রগুলোকে। তিনি আরো জানান, রাজশাহীর মাদকাশক্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা পেতে নিরাময় কেন্দ্র ভেদে মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা খচর হয়। অন্যান্য দেশে মাদকাশক্তদের চিকিৎসা ব্যায়ের ৭০ শতাংশ সরকার ব্যায় করে। বাকি ২০ শতাংশ পরিবার ও ১০ শতাংশ রোগী নিজে ব্যায় করে। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। রোগী বা তার পরিবারকেই চিকিৎসার পুরো ব্যয়ভার বহন করতে হচ্ছে।
রাজশাহী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্র অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার দেয়া তথ্য মতে, শুরুতে মানুষের ধারণাই ছিলো না মাদকে আসক্তদের চিকিৎসা রয়েছে। গত ৫ বছরের তুলনায় রাজশাহীতে মাদকাসস্ত নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। সামাজিক সচেতনতা ও অধিদপ্তরের প্রচারের কারণে এটা সম্ভভ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্র অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক জাফরুল্ল্যাহ কাজল জানান, মাদকসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর অনিয়মের চিত্র মন্ত্রী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষেরই জানা। তারপরো এর মান উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। এবিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে তিনি সাংবাদিককে তার অফিসে দেখা করতে বলেন।
রাজশাহী বিভাগের ৮টি জেলায় মোট ৪৭টি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী জেলায় রয়েছে ৮টি। এই ৮টি কেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে, সূর্যোদয়, অপান ভূবন, চলো বদলাই, নতুন ভূবন, আসক্তি নিরাময় কেন্দ্র (আপস), উজ্জীবন, বাঁচতে চাই সোসাইটি এবং ক্রিয়া। এগুলোর মধ্যে আপন ভূবন ও ক্রিয়া ২০ বেডের, বাকি ৬টি ১০ বেডের মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র। আর ‘চলো বদলাই’ পুনর্বাসন কেন্দ্রে এই মুহুর্তে কোন রোগী নেই। এই কেন্দ্রগুলোতে ১০০ জনের বেশি মাদকাসক্ত চিকিৎসাধীন আছে। এসব কেন্দ্রে থেকে চিকিৎসা নিতে রোগীদের মাসে ১২ থেকে ১৫ হাজাট টাকা খরচ পড়ে। তবে অধিকাংশ মাদকাশক্তই তাদের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পারায় ২ বছরের সম্পূর্ণ কোর্স শেষ না করেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছে।
এদিকে রাজশাহীতে ৫ একর জায়গার ওপর সরকারি ভাবে ২৫০ বেডের একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্তমানে শহীদ কামারুজ্জামান স্মৃতি স্টেডেয়ামের উত্তরে তেরখাদিয়া এলাকায় অবস্থিত ২৫ বেডের সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রটিকেই আগামীতে ২৫০ বেডে উন্নিত কর হবে। এজন্য নগরীর উপকণ্ঠ মোল্লাপাড়া গ্রামের ঠাকুরমারা এলাকায় জায়গা দেখা হচ্ছে।

নভেম্বর ২৫
০৬:৩৩ ২০২০

আরও খবর

বিশেষ সংবাদ

পাথর কুড়িয়ে চলে সংসার

পাথর কুড়িয়ে চলে সংসার

স্টাফ রিপোর্টার, রাবি : ভোর ছয়টা। মাঘের কনকনে শীত। কুয়াশার চাদরে আবৃত চারপাশ। রোদ নেই, উল্টো মৃদু বাতাস বইছে। বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন সংলগ্ন জিরো পয়েন্ট স্থলবন্দরের পাশে মহানন্দা নদীতে নিজেদের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শত শত শ্রমিক। নদীর স্বচ্ছ জলে তারা সকলেই পাথর কুড়োচ্ছেন। হিমালয় থেকে উদ্ভূত হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

৪১ও ৪২তম বিসিএস পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা

৪১ও ৪২তম বিসিএস পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা

সানশাইন ডেস্ক : ৪১তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি এবং ৪২তম বিশেষ বিসিএসের এমসিকিউ পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করেছে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)। আগামী ১৯ মার্চ সকাল ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ৪১তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ কেন্দ্রে একযোগে হবে। তার আগে আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টা

বিস্তারিত