Daily Sunshine

সীমাকে নিয়ে অসীম পাথারে হেমায়েত

Share

রোজিনা সুলতানা রোজি : হেমন্তের দুপুরে তীর্যক রোদে রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের গেটের পাশ দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় হ্যান্ড মাইকের শব্দ ‘সীমাকে সাহায্য করুন…সীমাকে সাহায্য করুন।’ পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখা যায় একটি ভ্যানে কোলের উপরে একটি মুরগি নিয়ে মায়াবী চেহারায় ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বসে আছেন একজন নারী। তার সাথেই এক পাশে দেখা যায় একটি নতুন গামছার বা তোয়ালের পুটলি এবং অন্য পাশে ‘সীমাকে সাহায্য করুন’ ব্যানার নিয়ে খেলা করছে এক ফুটফুটে শিশু।
কৌতুহল নিয়ে এগিয়ে ওই নারীর সাথে কথা বলার চেষ্টাও করলাম। তবে যিনি গাড়িটি চালাচ্ছিলেন তিনি তার স্বামী পরিচয় দিয়ে জানালেন, ওই নারী একজন মৃগী রোগী। দিনে কয়েক বার তার এই রোগটি শরীরে দেখা দেয়। তিনি স্বাভাবিকভাবে কোন কাজ তো দূরের কথা ঠিক মত কথাও বলতে পারেন না।
তার স্বামী হেমায়েত হোসেন (৫২) জানান, তার বাড়ি খুলনা জেলার তেরখাদা থানাধীন মধুপুর গ্রামে। তিনি একটি কাজে প্রায় তিন বছর আগে ট্রেনযোগে রাজশাহী রেলওয়ে ষ্টেশনে এসে পৌছালে দেখেন, একজন নারী ষ্টেশনের প্লাটফর্মের মেঝেতে পড়ে আছে এবং মাঝে মাঝে তার শরীর বেকিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাকে সাহায্য করার জন্য কাছে কেউই যাচ্ছেন না। এমন অবস্থা দেখে তার মায়া জন্মে এবং কাছে এগিয়ে যায়। তারপর শরীর একটু সুস্থ্য হলে জানতে পারেন যে, তার নাম সীমা (২২)। তার আগে বিয়েও হয়েছিলো কিন্তু এই রোগের কারণে সংসার নামক শব্দটা তার জীবনে বেশি দিন স্থায়ী হয় নি।
হেমায়েত আরো জানান, সীমাকে দেখাশোনার জন্য রেলওয়ে ষ্টেশনে ডিউটিরত কর্মচারীদের অনুরোধ করেন তিনি কিন্তু তারা জানান যে, এই সমাজ এটা মেনে নিবে না। তাকে নিয়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই তাকে যদি দেখাশোনার ইচ্ছে থাকে তাহলে সীমাকে বিয়ে করতে হবে।
স্থানীয়রা তাকে জানান যে, সীমার নানীর বাড়ি ভদ্রা এলাকায়। বিয়ের পর এই রোগের জন্য স্বামী তাকে ত্যাগ করলে সীমা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। তারপর থেকে এই এলাকায় অবস্থান করেন সীমা।
কোন উপায় না দেখে হেমায়েত হোসেন তার স্ত্রী ও দুই ছেলে থাকা স্বত্বেও মৃগী রোগী সীমাকে বিয়েও করেন। তারপর নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। এরপর যা ঘটার তাই ঘটলো। হেমায়েত হোসেনের পরিবার মেনে নেয় নি সীমাকে। এদিকে তিনি সীমারও দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছেন। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে সীমাকে নিয়ে আবার চলে আসেন রাজশাহী শহরে। শহরের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের শিরোইল এলাকায় একটি বাসায় উঠেন তাকে নিয়ে। তারপর রুটি-রুজি এবং সীমার চিকিৎসার জন্য নেমে পড়েন গামছা কখনো বা ফুচকা বিক্রির কাজে। সীমার সেবা এবং রান্না-বান্নাসহ বাসার সকল কাজ হেমায়েতই করেন। তাদের কোল আলো করে এক বছর আগে ভাঙ্গা ঘরে চাঁদের আলো হয়ে জন্ম নেয় ফুটফুটে শিশু মানিক।
মানিকের আগমনে খরচ আর দায়িত্ব একসাথে বাড়তে থাকে। কিছুতেই সংসারের হাল সামলাতেই পারছিলেন না হেমায়েত। সংসারের জীবিকা নামক উত্তাল ঢেউ সামাল দিতে অবশেষে স্বল্প পুঁজি থেকেই একটি ভ্যান আর হ্যান্ড মাইক কিনেন। সাথে কিছু তোয়ালে বা গামছাও কিনে রাখেন যাতে তা বিক্রি করে কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন।
স্থানীয় কোন প্রতিনিধি তাদের সাহায্য করেন কি না তা জানতে চাইলে হেমায়েত হোসেন জানান, এই তিন বছরে মাত্র তিনবার দশ টাকা কেজি দরে চাল পেয়েছিলেন। তারপর আর কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসেন নি। এরপর থেকে সকাল হলেই সারাটি দিনের জন্য শিশু মানিসহ সীমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন শহরের বিভিন্ন রাস্তায় অর্থ জোগাড়ের জন্য।
কথাগুলো বলতে বলতে কোন ফাঁকে যে হেমায়েতের চোখের কোন বেয়ে পানি উপচে পড়ছিলো। আর ভারি গলায় বলছিলেন, সীমাকে সহায়তার জন্য কেউ এগিয়ে আসেন না। কেউ না।
হয়তো এভাবেই চলতে হবে বাকি জীবনটাও। আর তখন রোগী সীমাও স্বামীর চোখের দিকে তাকিয়ে কি যেন বলতে চেয়েও বলতে পারছেন না। কথাগুলো বলেই সীমার স্বামী ভ্যান চালাতে শুরু করলেন আর ভারি গলায় অনবরত বলছেন, “সীমাকে সাহায্য করুন…সীমাকে সাহায্য করুন।”

নভেম্বর ২০
০৬:৩৬ ২০২০

আরও খবর

পত্রিকায় যেমন

বিশেষ সংবাদ

শীতের আমেজে আহা…ভাপা পিঠা

শীতের আমেজে আহা…ভাপা পিঠা

রোজিনা সুলতানা রোজি : প্রকৃতিতে এখন হালকা শীতের আমেজ। এই নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় ভাপা পিঠার স্বাদ নিচ্ছেন সবাই। আর এই উপলক্ষ্যটা কাজে লাগচ্ছেন অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। লোকসমাগম ঘটে এমন মোড়ে ভাপা পিঠার পসরা সাজিয়ে বসে পড়ছেন অনেকেই। ভাসমান এই সকল দোকানে মৃদু কুয়াশাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় ভিড় জমাচ্ছেন অনেক পিঠা প্রেমী। রাজশাহীর বিভিন্ন

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থগিত নিয়োগ পরীক্ষার সূচি প্রকাশ

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থগিত নিয়োগ পরীক্ষার সূচি প্রকাশ

সানশাইন ডেস্ক : রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গত ৩ এপ্রিলের স্থগিতকৃত নিয়োগ পরীক্ষার নতুন সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছে। আগামী ৪ ডিসেম্বর শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত সেকশন অফিসার ও পাবলিক রিলেশন অফিসার পদের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। একই দিন দুপুর ১২টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদের লিখিত

বিস্তারিত