Daily Sunshine

সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চালের বাজার

Share

আসাদুজ্জামান নূর : রাজশাহী অঞ্চলে গত দুই সপ্তাহে দেড়’শ থেকে দুই’শ টাকা বেড়েছে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা চিকন ও মাঝারি মানের চালের দাম। দাম উঠানামা, বিক্রি, মজুদসহ এই অঞ্চলের চালের সার্বিক কার্যক্রম একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন মহলের অভিযোগসূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী অঞ্চলে অটো রাইস মিল মালিক ও শতাধিক মজুদ ব্যবসায়ীদের একটি সক্রিয় সিন্ডিকেট রয়েছে। এই সিন্ডিকেট এবছর সরকারের বোরো ধান সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হতে দেয়নি। বোরো সংগ্রহ মৌসুমে সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে ধান কিনে নেয় তারা। বোরো মৌসুমে লাখ লাখ মণ ধান মজুদ করে বাজার নিজেদের আয়ত্তে করে এই সিন্ডিকেট। এখন তারা নিজেদের ইচ্ছামতো চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের মর্জিতেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বাজার এমন অভিযোগ ক্রেতা, বিক্রেতা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের।
রাজশাহী অঞ্চলের ৮ জেলার চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে অটো রাইস মিল মালিক ও মজুদদারদের শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট। চলতি বছর সরকারি গুদামের জন্য বোরো ধান সংগ্রহের নির্ধারিত সময় ছিল ১৫ আগস্ট। কিন্তু বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয় খাদ্য অধিদপ্তর। গত ৩১ আগস্ট পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে সরকারি বোরো সংগ্রহ হয়েছিল লক্ষ্যমাত্রার এক-তৃতীয়াংশের কম।
এ অঞ্চলের ৮ জেলা রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুহাট ও পাবনা থেকে ধান সংগ্রহ করা হয়। সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়ে খোলা বাজারে কৃষকদের কাছে থেকে বেশি দামে ধান কিনে নেয় অটো রাইস মিল মালিক ও শতাধিক মজুদ ব্যবসায়ীরা। মৌসুমে লাখ লাখ মণ ধান মজুদ করে পরবর্তীতে বাজার নিয়ন্ত্রণ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ায় তাদের কাজ।
পাইকারী চাল বিক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলার প্রায় ২০০ অটো রাইস মিল মালিক ও শতাধিক মজুদ ব্যবসায়ী বাজার রেখেছে নিজের দখলে। নিয়মিত বাজার মনিটরিং না থাকায় এই চক্রটি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য, রাজশাহী ও রংপুর কৃষি অধিদপ্তর সূত্র অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগে মোট আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমাণ ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯০ হেক্টর। প্রতিবছর চালের চাহিদা ২৯ লাখ ২৬ হাজার ৬০০ টন। রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ। এসব মানুষের প্রতি বছর খাদ্যের চাহিদা হচ্ছে ৫৮ লাখ দুই হাজার ১১ টন। গত মৌসুমে আমন, আউশ, গম ও বোরো ফসলের উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৭২ লাখ ৪৫ হাজার ২৫৪ টন।
কৃষি দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এ অঞ্চলের চাহিদার চেয়ে ১ কোটি ৫ লাখ ৮০ হাজার ৭১০ টন বেশি খাদ্যপণ্য উৎপাদন হয়েছে। একজন মানুষ গড়ে প্রতিদিন ৫৫৩ দশমিক ৬ গ্রাম খাদ্য গ্রহণ করতে পারে। এদের মধ্যে রয়েছে ১১ শতাংশ শিশু, বৃদ্ধ ও খাদ্য গ্রহণে অনুপযোগী জনগোষ্ঠী। ফলে খাদ্য গ্রহণকারীর সংখ্যা ৩ কোটির সামান্য বেশি হয়। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনা সিন্ডিকেটের কবলে থাকায় চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি হলেও দাম বাড়ছে হু হু করে।
রাজশাহীর নওগাঁ, নাটোর, তানোর, চাঁপাইনবাগঞ্জসহ জেলার অন্যান্য বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সপ্তাহখানে আগে মানভেদে স্বর্ণা ৫০ কেজির প্রতি বস্তা বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। কিন্তু বর্তমানে বস্তা প্রতি ২০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। এছাড়া কাটারিভোগ সিদ্ধ ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় ও কালিজিরা চাল ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা, আঠাশ ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, মিনিকেট ২ হাজার ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকায়, বাসমতি ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের বলছেন, সরকারের শিথীলতা নীতি ও তড়িত ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে জনগণকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে। ধান-চাল মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠবে। হুট করেই সিন্ডিকেটটি চালের বাজার অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
রাজশাহীর পাইকারি এক চাল বিক্রেতা দাম বাড়ার কারণ হিসেবে আড়ৎ ধানের দাম বাড়াকে দায়ী করছেন। বাজারে প্রতি মন (৪০ কেজি) আটাশ ধান ১ হাজার ৩০০ টাকা, জিরা ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ধানের দাম বাড়লে চালের দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। তবে, পরিস্থিতি বুঝে মিল মালিকরা ধান এবং চাল মজুদ করেছেন বলে জানান ঐ ব্যবসায়ী।
এ বিষয়ে চাতাল মালিক ও অপেক্ষকৃত ছোট পরিসরে চাল উৎপাদনকারীরা বলছেন, চালের দাম বাড়লে যাদের লাখ লাখ টন ধান-চাল মজুদ করার ক্ষমতা আছে তাদের লাভ হবে। চাতালের তেমন কোন লাভ নেই। বরং অটো রাইস মিলের দাপটে তারা কুলিয়ে উঠতে পারছেন না বলে মন্তব্য করেন তারা।
নওগাঁর কয়েকজন মিল ও চাতাল মালিক এবং আড়তদার জানান, মৌসুমের শুরু থেকেই ধানের দাম বেশি। প্রথম থেকেই অটো রাইস মিলগুলো উল্লেখযোগ্য ধান সংগ্রহ করেছে। অটো রাইস মিল মালিকরা অনেক বেশি ধান সংগ্রহ করে নিজেদের ইচ্ছেমতো চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ছোট ব্যবসায়ীরা বড় ব্যবসায়ীদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে।
রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রান্তিক কৃষকের কাছে ধানের কোন মজুদ নেই। মৌসুমের শুরুতেই মজুদদাররা ধান-চাল মজুদ করে রাখে। তারাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। এসব সিন্ডিকেট ও মজুদদাররা সুযোগ পেলেই দাম বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে ধান-চালের দাম বাড়লেও সেই টাকা চলে যায় তাদের পকেটে। কৃষকরা এই টাকার কোন সুফল ভোগ করতে পারেন না।
তবে এসকল অভিযোগ পুরোপুরি ঠিক নয় বলছেন মিল মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের এক কর্মকর্তা বলেন, অটো রাইস মিল মালিকরা ধানের মজুদ গড়ে তুলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। সারাদেশে কয়েক হাজার চাল কল আছে। নওগাঁতে আছে ১২০০ চালকল, তার মধ্যে ৫৩টি অটো রাইস মিল। আমরা ইচ্ছা করলেই তো আর দাম বাড়াতে পারিনা। সরকার ২৬ টাকা দরে ধানের দাম বেঁধে দেওয়ায় কৃষকরা কম দামে সরকারি গুদামে ধান দেয়নি। শুরু থেকেই ধানের বাজার বেশি। তাই কৃষকের কাছে থেকে আমরা বেশি দামেই কিনেছি। ধান বেশি দামে কেনা থাকলে চাল কম দামে বিক্রি হবে এটা তো হয়না।
ধান-চাল মজুদ ও অটো রাইস মিলগুলোর দৌরাত্ম্যে ছোট ছোট মিল চাতাল মালিকরা ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নওগাঁ জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমরা ব্যবসা করি সরকারের বেঁধে দেওয়া নীতিমালা অনুযায়ী। আমরা যদি নীতিমালার বাইরে গিয়ে মজুদ করে থাকি তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। অহেতুক গালিগালাজ করা হয় আমাদের। মুনাফাখোর, মজুদদার বলা হয়।
তিনি আরও বলেন, নওগাঁতে ১২০০ চালকল আছে। ৫৩টি অটো রাইস মিল। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যদি তাদের ক্যাপাসিটি অনুযায়ী ব্যবসা করতে না পারেন; তাহলে আমাদের কিছুই করার নেই। দু-একজনের সমস্যা হতে পারে।
অটো রাইস মিল মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, কোথাও বেশি ধান-চাল মজুদ করা থাকলে সরকারিভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হোক এটা আমরাও চাই। তবে, সবসময় সবার গুদামে গিয়ে খোঁজ নেওয়া সম্ভব হয় না। মজুদদার থাকতে পারে হাতেগোনা দু-একজন ।
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, সিন্ডিকেটের দখলে রাজশাহীর চালের বাজার। এ অবস্থা বেশ কয়েক বছর ধরে চললেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।

অক্টোবর ১২
০৬:৪১ ২০২০

আরও খবর

পত্রিকায় যেমন

বিশেষ সংবাদ

নগরীর পুরাতন বইয়ের বাজার, কেমন আছেন দোকানীরা?

নগরীর পুরাতন বইয়ের বাজার, কেমন আছেন দোকানীরা?

আবু সাঈদ রনি: সোনাদীঘি মসজিদের কোল ঘেষে গড়ে উঠেছে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী পুরাতন বইয়ের দোকান। নিম্নবিত্ত ও অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের একমাত্র আশ্রয়স্থল এই পুরাতন লাইব্রেরী। মধ্যবিত্তরা যে যায় না ঠিক তেমনটিও না। কি নেই এই লাইব্রেরীতে? একাডেমিক, এডমিশন, জব প্রিপারেশনসহ সব ধরনের বই রাখা আছে সারি সারি সাজানো। নতুন বইয়ের দোকানের সন্নিকটে

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

চাকুরির নিয়োগ দিচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

চাকুরির নিয়োগ দিচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

সানশাইন ডেস্ক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে জনবল নিয়োগ দেয়া হবে। রাবির নিজস্ব ওয়েবসাইটে এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। পদের নাম: কম্পিউটার অপারেটর পদ সংখ্যা: ০১ টি। বেতন: ১২৫০০-৩০২৩০ টাকা। পদের নাম: মেডিক্যাল টেকনােলজিস্ট (ফিজিওখেরাপি) পদ সংখ্যা: ০২ টি। বেতন: ১২৫০০-৩০২৩০ টাকা। পদের নাম: মেডিক্যাল টেকনােলজিস্ট (ডেন্টাল) পদ সংখ্যা:

বিস্তারিত