সর্বশেষ সংবাদ :

সংকটে চলনবিল

আনোয়ার হোসেন আলীরাজ, সিংড়া: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব পড়েছে চলনবিলে। অপরিকল্পিত বাঁধ-সেতু ও কালভার্ট সড়কসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণে দখল ও দূষণে অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে বিলটি। আত্রাই নদীতে চলনবিল প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় দ্রুত মরে গেছে দেশের সর্ববৃহৎ এই বিলটি।
চলনবিলের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত ৭৭টি নদী-খাল বিল-ক্যানেল ভরাট হয়ে আবাদি জমিতে পরিণত হয়েছে। আর, খাল খননের নামে নদী দখলের সুযোগ করে দেয়া হয় দখলদারদের। ফলে ২১ হাজার হেক্টর জমির সেচ কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। বিলাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলের জমিগুলো গভীর-অগভীর নলকুপে নির্ভর করতে হচ্ছে।
জানাযায়, দেশের বৃহত্তম চলনবিলের পানি চলমান হওয়ায় বিলের নামকরণ হয় চলনবিল। বড়াল নদীর উৎসমুখে স্লুইসগেট ও শতাধিক ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ করায় চলনবিলের খাল-বিল, নদী ও ক্যানেল গুলোর অস্তিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া শতাধিক ফ্লাসিং ইনলেটে অখন্ড চলনবিল এখন বিভক্ত।
বিলের মৎস্য সম্পদ ও জলজ প্রাণী বিলুপ্তির পথে। অন্যদিকে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা ভূয়া দলিল তৈরি করে দখলে নিয়েছে বিলের কয়েক হাজার একর খাস জমি।
ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া বই থেকে জানা গেছে, চলনবিল অঞ্চলে ৩৯টি বিল, ১৬টি নদী এবং ১২০২২টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান নদী ৯টি, ২০টি খালসহ ছোট ছোট বিভিন্ন বিল ও খাল রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের রেকর্ড থেকে জানা গেছে, বর্তমানে নাটোর বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া, পাবনার চাটমোহর, ভাংগুড়া, ফরিদপুর এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলার ৬২টি ইউনিয়ন ও আটটি পৌরসভার এক হাজার ৬০০টি গ্রাম নিয়ে চলনবিলের অবস্থান। লোক সংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ। চলনবিলে জমির পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৬৬ হাজার ৫৩৫ হেক্টর। চলনবিলে মোট প্রায় এক হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, চার হাজার ২৮৬ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ১৬টি নদী এবং ১২০ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট্য ২২টি খাল রয়েছে।
চলনবিলের তিন জেলার নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জে বেশিরভাগ খাস জমি ও জলাশয় এখন এলাকার প্রভাবশালীদের দখলে। শুষ্ক মৌসুমে চলনবিলের নদী বিল শুকিয়ে জেগে ওঠা দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। স্থানীয় কৃষকরা মাঠে ধান, পাট, সরিষা, রসুন, পেঁয়াজসহ নানা রকমের ফসল আবাদ করছেন। এসব নদী-বিল শুকিয়ে যাওয়ায় এক সময়ের অতি পরিচিত দেশি ৬৫ প্রজাতির মাছ আজ বিলুপ্তির পথে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে অনেক প্রজাতির মাছ।
জানাযায়, এক সময়ের বড়াল, নন্দকুজা, ভদ্রাবতী, সরস্বতী, ইছামতি, গুমানী, আত্রাই, গুড়নদী, করতোয়া, ফুলজোর, তুলসী, চেঁচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা ও গোয়ালা নদীসহ অসংখ্য বিল চলনবিলের গর্ব ও ঐতিহ্য ছিল।
এছাড়া নবী হাজীর জোলা, হক সাহেবের খাল, নিয়ামত খাল, সাত্তার সাহেবের খাল, কিনু সরকারের ধর, পানাউলার খাল, নিমাইচরা-বেশানী,বেশানী-গুমানী ও উলিপুর-মাগুড়া, দোবিলা খাল,বেহুলার খাড়ি, বাঁকাই খাড়ি, গাড়াবাড়ি-ছারুখালী খাল, জানিগাছার জোলা ছিল চলনবিলের প্রাণ। কিন্তু ধীরে ধীরে এসব নদী-বিল ও খাড়ি ভরাট হয়ে যাওয়ায় মৎস্য ও জলজসম্পদে ভরপুর চলনবিলে মাছের আকাল দেখা দিয়েছে।
এক সময় চলনবিলের মাছ স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। মাছ বিক্রি করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের মানুষ। ১৯১৪ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে প্রথম ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেল পথ নির্মিত হলে চলনবিলের সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ স্থাপিত হয়। উত্তরাঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে চলনবিলের মাছ ট্রেনে যোগে ভারতে রফতানি করা হতো। ১৯৭৭ সালে চলনবিলের মাঝ দিয়ে বাঘাবাড়ী থেকে সিংড়া পর্যন্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি করা হয়।
২০০২ সালে চলনবিলের বুক চিরে নির্মাণ করা হয় ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক। সবশেষ সিংড়া বালুয়া-বাসুয়া থেকে তারাশ-বারুহাস সাব মার্সেবুল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রভাব খাটিয়ে এসব নদী-বিল,খাল দখল করে নিয়েছে।
ফলে নদী সংলগ্ন এলাকায় ফসলহানি, বদ্ধ পানিতে দূষণ-দুর্গন্ধ-রোগবালাই, জেলে-কৃষক, ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ভূমি দস্যুরা দখল প্রক্রিয়া অব্যহত রেখে নদী তীরবর্তী জেলে, কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বেকার বানিয়ে নদনদী ধ্বংসের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। ধীেের ধীরে অকেজো হয়ে পড়েছে স্লুইসগেটগুলো। সব জেনে-শুনে সংশ্লিষ্ট বিভাগ রয়েছে নীরব। চলনবিলের নদীগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি করেছেন নদীর তীরবর্তী মানুষগুলো।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. রেদওয়ানুর রহমানের প্রবন্ধ থেকে জানাযায়, ২৫ বছর আগেও চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী ও বিলে বছরজুড়েই ৬ থেকে ১২ ফুট পানির গভীরতা থাকতো। ফলে সারা বছরই নৌ চলাচল করতো।
কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে এসব নদী-বিল ভরাট হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণ, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে এবং ১৯৮০’র দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বড়ালের (পদ্মা) উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে চলনবিলের বিভিন্ন নদী বিল জলাশয় ও খালগুলোয় পলি জমে ক্রমে ভরাট হয়ে গেছে। তাছাড়া বিলের মাঝ দিয়ে যথেচ্ছভাবে সড়ক, ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণ, ভূমি দখল করে বসতি ও দোকানপাট স্থাপন করায় নদী ও বিলগুলো সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানাযায়, আত্রাই নদীতে বাস্তবায়ন করা চলনবিল প্রকল্প এ বিলটির দ্রুত মৃত্যু ঘটিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। অন্যদিকে বড়াল নদীর উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণের কারণে পলি জমে চলনবিল এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। বলতে গেলে অপরিকল্পিত প্রকল্পের বাঁধ, সড়কসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ, দখল ও দূষণে বিলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। সাধারণ মানুষ এখন দাবী করছে, খাল খননের নামে নদী দখলের সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।


প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৬, ২০১৯ | সময়: ৩:৩২ পূর্বাহ্ণ | সুমন শেখ