Daily Sunshine

রাজশাহীতে ফের পুকুর খননের হিড়িক

স্টাফ রিপোর্টার: বর্তমানে জেলার তৃণমূল কৃষক ও কৃষি শ্রমিকের কাছে একটা আতঙ্ক পুকুর খনন। তৃণমূলের অভিযোগ এখনো অবাধে পুকুর খননযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালীরা। বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন ও অভিযোগ জানিয়েও উপকার পাচ্ছে না ভুক্তভোগিরা। অনেকে ক্ষোভে-দুঃখে গ্রাম ছেড়ে শহরে দৈনিক শ্রমিকের কাতারে শরিক হচ্ছেন। আবারো নতুনভাবে পুকুর খননে মেতে উঠেছে প্রভাবশালীরা। কোনভাবেই থামছে না অপরিকল্পিত এই পুকুর খনন।
এদিকে পুকুর খননের ফলে চলাচলের অনুপোযোগি হয়ে পড়ছে গ্রামীণ পাকা রাস্তাগুলো। ধারণ ক্ষমতার বেশী মাটি বহনের কারণে ফাটল ধরছে পাকা রাস্তায়। এরপর আস্তে আস্তে উঠে পড়ছে কার্পেটিং। প্রতিনিয়তই গ্রামীণ রাস্তা ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে পুকুরের মাটি বোঝায় এসব ট্রাক্টরের কারণে।
বিশ্লেষকদের মতে একদিকে প্রশাসনের নীরব ভূমিকা ও রাজনৈতিক ছত্রছায়া; অন্যদিকে সামাজিক আন্দোলন না থাকায় থামছে না পুকুর খনন। দেদারসে পুকুর খননের কারণে প্রতিবছরই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ক্ষেত-খামার। নতুনভাবে কৃত্রিম দুর্যোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অপরিকল্পিত পুকুর খনন। প্রশাসনকে বুড়ো আঙগুল দেখিয়ে জেলার প্রতিটি উপজেলায় চলছে পুকুর খননের হিড়িক। সরকারি নিয়ননীতি উপেক্ষা করে প্রশাসনের নাকের ডোগায় পুকুর খননের কাজ এগিয়ে চলছে।
অভিযোগ উঠেছে সরকারি আইন অমান্য করলেও ভূমির আকার পরিবর্তন করে পুকুর খননে রসদ ও সাহস যোগাচ্ছেন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পুকুরখননে সাবাড় হচ্ছে কৃষিজমি। একশ্রেণির মুনাফালোভীরা রাজনৈতিক নেতার লেবাসে ও স্থানীয় থানা পুলিশকে ম্যানেজ করে ফসলি ধানি জমিকে পুকুরে রূপান্তর করছে। এমনিতেই বর্ষা মৌসুমে জেলার প্রায় ক্ষেতের মাঠে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। পুকুর সংলগ্ন প্রান্তিক ও বর্গা চাষিসহ দরিদ্র জনগণ হুমকির মুখে পড়েছে। প্রেক্ষিতে সরকারি নিরাপত্তা বেষ্ঠনী ভেঙ্গে পড়ার আশংকা করছেন সচেতনমহল ও পরিবেশবাদিরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজশাহী জেলায় কৃষি জমি এখন পুকুর খনন ও সরকারি খাল অবৈধ দখলে মেতেছে এক শ্রেণির দখলদারেরা। এরমধ্যে পবার পারিলা ইউনিয়নে চলেছে খাল দখলের মহোৎসব। যে কারণে একটু বৃষ্টি হলেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয় ওই এলাকায়। এরআগে পুকুর খননবন্ধ ও সরকারি খাল অবৈধ দখলমুক্ত করে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেছেন ওই এলাকাবাসী। বর্তমানে ওই ইউনিয়নের ভবানীপুর, কাপাসমুল, শিরুলিয়া ও ঘোলহাড়িয়া গ্রামের ফসলের মাঠে বেদম চলছে পুকুরখনন।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা আজ এই উপজেলায় তো কাল অন্য জেলায়। তাই কোন কোন কর্মকর্তার বিষয়টির প্রতি আন্তরিকতা থাকলেও বদলির কারণেও অনেক সময় তাঁরা পারেন না। পুকুর খনন বন্ধে পদক্ষেপ নিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। রাজশাহী জেলায় একটি পুকুর বন্ধ হয়েছে এমন নজির নেই। তবে কিছুদিন খননকার্য থেকে আটকানো হয়েছে মাত্র। কাজের কাজ না হওয়ায় প্রভাবশালীরা একদিকে পুকুর খনন করে এবং অন্যদিকে অভিযোগকারিদের আইনি জটিলতায় ফেলে হয়রানি করে চলেছে।
অপরিকল্পিত পুকুরখননে এবং পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় পুকুর এখন গোদের ওপর বিষফোড়া। মালিকানা জমিতো বটেই সরকারি খাল ও খাস জমিও এখন পুকুরখননকারি প্রভাবশালীদের দখলে। বিগত কয়েক বছরে উপজেলার পারিলার ফলিয়ার বিলের প্রায় অর্ধেক এবং হুজুরীপাড়া কর্ণহার বড়বিলের সরকারি খাস জমি এখন প্রভাবশালীদের দখলে।
জেলার পবা উপজেলার ফলিয়ার বিল, হুজুরীপাড়ার কর্ণহার বড়বিল পুকুর খননে ক্ষত-বিক্ষত। সরকারি খাল দখলে নিয়ে আবারো শুরু হয়েছে পুকুর খনন। হুজুরীপাড়ার কর্ণহার বড়বিলের মধ্যে দিয়ে জুকার ডারা স্লুইস গেট হতে বাগধানী স্লুইস গেট পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটারের খাল রয়েছে। এরআগেই কর্ণহার বড়বিলের পানি নিস্কাশনের খাল দখলে নিয়ে তেতুলিয়া গ্রামের মৃত নাজিম উদ্দিনের ছেলে লিটন আলী বিশাল পুকুর খনন করেন। তার দেখাদেখি প্রভাবশালীরা আরো দু’টি পুকুর খনন করেন। কিছুদিন আগে আবারো পুকুর খনন করতে থাকলে কর্ণহার বড়বিল পানি ব্যবস্থাপনা এসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল আমিন সিদ্দিকী অভিযোগ দিলে পবা উপজেলা প্রশাসন বন্ধ করে দেন। এলাকাবাসি অভিযোগ করেন কর্ণহার পুলিশের সাথে ওই প্রভাবশালীদের অবৈধ যোগাযোগ থাকায় উপজেলা প্রশাসন থেকে অভিযানে আসার আগেই ওরা খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। উপজেলা প্রশাসন চলে যাওয়ার সাথে সাথে আবারো চলে খননযজ্ঞ।
ফসলি জমি পুকুর হওয়ার কারণে প্রান্তিক কৃষক ও কৃষি শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দলপুর গ্রামের এক ব্যক্তি বলেন পাশের গ্রাম শীলপুর-জুড়ানপুর। ওই গ্রামের প্রায় কৃষি জমিতে এখন শুধুই পুকুর। প্রথমে লোভেপড়ে পুকুরখনন করতে দিলেও এখন তারা কাজ পাচ্ছে না। সকাল হলে তারা ডালি-কোদাল নিয়ে শহরে যাচ্ছে শ্রমিকের কাজ করতে। এই বিলে যেভাবে পুকুরখনন বাড়ছে-তাতে সুন্দলপুর গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষকেও শহরে দৌড়াতে হবে।
তেতুলিয়া গ্রামের নেকজান বেওয়া বলেন, আমরা গরীব মানুষ। আগে তার স্বামী ও ছেলেরা কৃষিকাজ করেই চলতো। এখন পুকুর হওয়ার জন্য কৃষিকাজ পাচ্ছে না। ওই গ্রামের কুড়ানের স্ত্রী পারভীন বলেন, ‘আগে বিলে বিলে ছাগল ও গরু পালন করে চলতো। এখন পুকুর হওয়ায় সেটাও করতে পারছি না। ঘরের মানুষ এখন কখনো ভ্যান চালিয়ে বা চা-বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছে’।
বর্তমানে ওই বিলে সুন্দলপুর ঘোষপুকুরে পুকুরখনন করছেন রাহিদুল ইসলাম, তেতুলিয়া জোড়গাছার মাঠে তেঘর গ্রামের শাহজাহান আলী পুকুর খনন করছেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও আলোকচ্ছত্রে খড়িয়াকান্দি এলাকার মজিবুরের ছেলে রবিউল ও দূর্গাপুরের মৃত জেসারতের ছেলে আব্দুর রহিদ যৌথভাবে এই পুকুর খনন করছেন। অত্র এলাকার ষোলজন কৃষকের নিকট থেকে বাৎসরিক বিঘাপ্রতি চৌদ্দ হাজার টাকা করে মোট ২০একর জমি লিজ নিয়ে এই পুকুর খনন করছেন। জেলার বাগমারা ও দুর্গাপুরেও চলছে পুকুরখননযজ্ঞ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বলেন যেভাবে পুকুর খনন হচ্ছে-এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে কবরস্থানেও থাকবে না। আবার পুকুরগুলো চিহিৃত না করার কারণে সরকার বড় অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে।
পবার পারিলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল বারী ভুলু জানান, কয়েক বছর থেকে তার ইউনিয়নের অর্ধেক জমি পুকুরে চলে গেছে। বাকী কৃষি জমিতেই নতুনভাবে পুকুর খননে মেতে উঠেছে প্রভাবশালীরা। পুকুরখননের কারণে গ্রামে গ্রামে একদিকে জলাবদ্ধতা এবং অন্যদিকে ওভার লোডিং-এর জন্য গ্রামীণ রাস্তা অকারনে নষ্ট হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
জেলায় কত হাজার বিঘা কৃষি জমি পুকুরে গেছে বা যাচ্ছে এ হিসেব না পাওয়া গেলেও শুধুমাত্র পবা উপজেলাতেই ছয় হাজার বিঘা কৃষি জমি পুকুরে চলে গেছে। আরো দু’হাজার বিঘা কৃষি জমি পুকুরে চলে যাওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে। অপরিকল্পিত পুকুরখনন বিষয়ে প্রশাসনের কাছে জানতে চাওয়া হলে বরাবরের মতই উত্তর এসেছে খননবন্ধে পদক্ষেপ অব্যাহত আছে।

জানুয়ারি ১৭
০৪:০৪ ২০১৯

আরও খবর

পত্রিকায় যেমন

বিশেষ সংবাদ

রাজশাহীতে হেরোইনসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

রাজশাহীতে হেরোইনসহ  দুই মাদক ব্যবসায়ী  গ্রেপ্তার

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী মহানগরীতে ৭০ গ্রাম হেরোইনসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, ঢাকা জেলার কেরানিগঞ্জ থানার ধালেশ্বর পশ্চিমপাড়া এলাকার মানিক মিয়ার ছেলে মিজান মিয়া (২৫) ও একই এলাকার রেজোয়ানের ছেলে রবিউল ইসলাম রিফাত (২৫)। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার সদর গোলাম রুহুল কুদ্দুস জানান,

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

সরকারি চাকরি প্রার্থীর বয়সে ছাড়

সরকারি চাকরি প্রার্থীর বয়সে ছাড়

সানশাইন ডেস্ক : করোনা মহামারিতে সাধারণ ছুটিতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে স্থগিত ছিল সরকারি-বেসরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া। এ কয়েক মাসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পায়নি দেশের শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী। অংশ নিতে পারেনি কোনো নিয়োগ পরীক্ষাতেও। অনেকেরই বয়স পেরিয়ে গেছে ৩০ বছর। স্বাভাবিকভাবেই সরকারি চাকরির আবেদনে সুযোগ শেষ হয়ে যায় তাদের। তবে এ দুর্যোগকালীন

বিস্তারিত