Daily Sunshine

দেউলিয়ার পথে রাজশাহীর মিলাররা

Share

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় অবস্থিত উত্তরবঙ্গের ব্যবসার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র বানেশ্বর। এখানে এক সময় প্রায় ৩০০টির মতো ডালমিল চালু ছিলো। যেখানে প্রায় ৩০ হাজার স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। দেশের চাহিদার ৭০ শতাংশ ডাল এই মিলগুলো সরবরাহ করতো। তবে মুক্তবাজার অর্থনীতি ও ব্যবসায় অসম প্রতিযোগীতার কাছে এই ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে পারেনি। এখন সেখানে মাত্র ৩০টির মতো ডালমিল চালু আছে, তাও নিয়মিত নয়। আর মিলগুলোর দুরাবস্থা দেখে কৃষকেরাও এই অঞ্চলে ডাল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি এক সময় তাদের মিলে কর্মরত শ্রমিকদের থেকেও এখন তাদের খারাপ ভাবে দিন যাচ্ছে। ব্যাংকের প্রলোভনে ঋণগ্রস্ত মিল মালিকেরা এখন দেউলিয়া। তার ওপর নতুন করে দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে অযৌক্তিক ট্যাক্সের বোঝা।
বানেশ্বরের একাধিক ডালমিলের সত্বাধিকারীর সাথে কথা হলে হারা জানান, ডালমিল করতে সেসময় প্রায় কোটি টাকা ব্যায় হয় মিলারদের। এর পর কৃষকদের কাছ থেকে টনকে টন ডাল ক্রয়। সব মিলিয়ে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা ঋণ। তবে অপরিকল্পিত ভাবে বিদেশ থেকে ডাল আমদানি ও গুটি কয়েক বৃহৎ পরিষ্ঠানের মুনাফামুখিনতার ফলে রাজশাহীর ছোট পরিসরের এই ডালমিলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। আজ থেকে প্রায় ৪ বছর আগে এই ডালমিল মালিকদের কপাল পোড়া শুরু হয়। ডালমিল মালিকেরা ৫০ কেজির ডাল দেশের বাজার থেকে ৬ হাজার টাকায় কিনে সেই ডাল দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। ডাল ব্যবসায়ীদেরকে সুকৌশলে নানা প্রলোভনে ব্যংকগুলো ঋণ ধরিয়ে দিয়েছে। যার ১০ লাখ টাকা দরকার ছিল, সেসময় তাকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরাও সামলে উঠতে পারবে সেই ভরসায় ঋণ নিয়েছে। এখন তারা দেউলিয়া। ঋণের দায়ে কারো জমি নিলামে উঠেছে, কেউবা বাড়ি থেকে পালিয়ে রয়েছে, আবার কাউকে আদালতের বারান্দায় প্রহর গুনতে হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নতুন চাপ। ঋণগ্রস্থ এ্যকাউন্টগুলোর ওপর ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা ট্যাক্সের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে।
বানেশ্বরের সালাম-কালাম ডালমিলের সত্বাধিকারী মো. সালাম বলেন, ব্যবসায় লোকসানের কারণে এখন মিল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতে হয়েছি। উন্মুক্ত বাণিজ্যে নামে দেশের ডাল ব্যবসায় ধস নেমেছে। ৫০ কেজি ডাল ৬ হাজার টাকয় কিনে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। ঋণের দায়ে ডুবে গেছি, বাঁচতে আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে। যদি সূদ মৌকুফ করে দেয়া হয়, হয়তো মূল টাকাগুলো শোধ দেয়া যেতো। একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে প্রায় ৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে, সূদ সমেত এখন সেই ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে প্রায় ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা। এর সাথে আবার নতুন করে ট্যাক্স ধার্য্য করা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা। যেখানে ঋণের টাকা দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে সেখানে এই ট্যাক্সের টাকা মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।
বিসমিল্লা ডালমিলের সত্বাধিকারী ও স্থানীয় আরোকটি ডালমিল সংগঠনের সভাপতি মো. শাজাহান বলেন, ২০১৫ সাল থেকে ধস নামে দেশিয় ডালের বাজারে। বিদেশি ডাল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি। দেশের ডালের থেকে যা ২৫ থেকে ৩০ টাকা কম। বানেশ্বরের ৩০০ মিলের মধ্যে এখন ৩০টা মিল ধুকে ধুকে চলছে। তাও নিয়মিত না। সিটি গ্রুপ, মেঘান গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপের মতো প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে জাহাজ ভর্তি করে ডাল আমদানি করে আনছে। এর পর তা কেজি হিসেবে গ্রামের ভোক্তা পর্যন্ত পৌছে দিচ্ছে। তাদের কাছে আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীরা টিকতে পাছে না। বাধ্য হয়ে ডালমিল বন্ধ করতে হয়েছে। তবে এর মাঝে নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখতে ঋণ করতে হয়েছে। ব্যবসা না থাকলেও এখনও সেই ঋণের বোঝ বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। বিসমিল্লাসহ রাকিব বাবু ডালমিল, বদি চেয়ারম্যানের ডালমিল, আদর্শ ডালমিল, আয়নাল হক ডালমিল, জাহিদ ট্রেডার্সের ডালমিল সহ বানেশ্বরের রাস্তার ধরের যতগুলো মিল ছিল সব বন্ধ। এখন মিলগুলোতে ঘাস গজিয়ে গেছে। বানেশ্বরের ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত লোন ধরিয়ে দিয়েছে। যার ১০ টাকা ঋণের দরকার ছিল তাকে ১০০ টাকা ধরিয়ে দিয়েছে। প্রণোদনাসহ সুদ মৌকুফ ও ট্যাক্স মৌকুফ না হলে ঋণের বোঝা নিয়ে আমদেরকে আত্মহত্যা করতে হবে। আমরা কার কাছে যাবো! কাকে বলবো আমাদের দু:খের কথা! কে আমাদেরকে সমাধান দিবে!
বেলপুকুরের চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বদি বলেন, আমার পরিবারের ৩টা মিল ছিল। সবগুলোই বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি। এক সময় ডালমিলগুলোতে ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতো। এখন মিলের কর্মচারীদের থেকেও খারা অবস্থা মিলের মালিকদের। বিদেশি ডাল অপরিকল্পি ভাবে আসছে। সেই সাথে রয়েছে ব্যবসায়ীদের অসম প্রতিযোগীতা। ব্যাংকআালারা ব্যবসায়ীদের প্রলোভন দেখিয়ে অতিরিক্ত ঋণ দিয়েছে। এখন সেই ঋণের বোঝায় দেউলিয়া ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে পুঁজি হারিয়ে ফেলেছে ব্যবসায়ীরা। চামড়ার ব্যবসার মতো দেশের ডাল ব্যবসাতেও ধস নেমেছে। ব্যাংকগুলো যদি ঋণগ্রস্তদের এ্যকাউন্ট ব্লক করে সুদ মাফ করে, নতুন করে স্বাল্প সূদে ঋণ দেয় তবে হয়তো ব্যবসায়ীরা মূল টাকাটা ব্যাংকগুলোকে ফিরিয়ে দিতে পারতো।
জেলা পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় একটি ডালমিলের মালিক মাসুদ জানান, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ডাল মিলের ব্যবসা করার সাহস পাওয়া যাচ্ছে না। মাসুদ নিজেও তার ডাল মিল বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। ২০১৫ সালের পর ডাল ব্যবসায় ধস নামে। ব্যাংকের দায়-দেনায় মিল গুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ডালের দাম কমে গেলে ঋণ পরিশোধতো দূরের কথা মিল চালানোই সম্ভভ হচ্ছে না।
বানেশ্বর ডাল ব্যবসায়ী এ্যসোসিয়েশনের সভাপতি ও হাওয়া গ্রুপের সত্বাধিকারী ওবায়দুর রহমান বলেন, পূজি হারা হয়ে পড়েছি আমরা। ব্যাংক ঋণে জর্জরিত। দীর্ঘ ৭০ বছর ধরে রাজশাহীতে এই ব্যবসা বিকশিত করা হয়েছে। সারা দেশের ৭০ শতাংশ ডাল এখান থেকে সরবরাহ হত। ২০ থেকে ৩০ টা ব্যবসা পতিষ্ঠান দিয়ে শুরু হয়ে এক পর্যায়ে ৩০০ তে দাঁড়ায় ডালমিলের সংখ্যা। সালাম-কালাম, যারযিশ এর মতো প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রস্ত হয়ে এখন ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান নিলামে উঠেছে। এর ওপর আবার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ইনকাম ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে।
এদিকে যেহেতু কৃষক বুঝে গেছে ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা নেই তাই তারা আর এখন বাঁকিতে মাল দেয় না। মান নয় দামের কারণে দেশে উৎপাদিন ডাল বাইরের দেশ থেকে আমদানি করা ডালের সাথে প্রতিদ্ধন্দিতা করে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। দেশীয় ডাল যেখানে ৮০ টাকা সেখানে আমদারি করা ডালের সাথে এই ডালের দামের ফারাক ২০ থেকে ৩০ টাকা। কানাডা অস্ট্রেলিয়া, ইউক্রেন, তুরস্ক, তানজেনিয়া, মুজামবিক, মায়ানমার থেকে আসছে আমদানি করা ডাল। দাম না পাওয়ায় কৃষকও ডাল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এক সময় এই ডালমিলের মাধ্যমে স্থানীয় ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই শিল্পটাকে ধরে রাখতে হলে বা ব্যবসায়ীদের প্রাণ রক্ষা করতে চাইলে প্রণোদনার পাশাপাশি ঋণ মৌকুফ ও ট্যাক্স মওকুফের প্রয়োজন।

জুন ২৩
০৮:০৮ ২০২১

আরও খবর