Daily Sunshine

রাজশাহীর পুকুরে পুকুরে মাছের মড়ক

Share

স্টাফ রিপোর্টার : গুমোট আবহাওয়া, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও অক্সিজেনের স্বল্পতায় গ্যাস হয়ে লাখ লাখ মাছ মরেছে জেলার শত শত পুকুরে। এতে মাছ চাষিদের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গ্যাসকৃত পুকুরের মৎস্য চাষিরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। আর আতঙ্ক দেখা দিয়েছে খামারিদের মাঝে।

সারা বিশ্বে মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ স্থানে বাংলাদেশ। আর বিভিন্ন জেলায় তাজা মাছ সরবরাহ করার মধ্যে রাজশাহী জেলা রয়েছে প্রথম স্থানে। রাজশাহীতে কয়েক বছর থেকে মাছ চাষে বিপ্লব চলছে। আর নতুন করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাজা মাছ সরবরাহে প্রথম স্থানেও এখন রাজশাহী বিভাগ। প্রতিনিয়ত বাড়ছে মাছ চাষের পরিধি। আবার প্রতিদিন রাজশাহী জেলা থেকে প্রায় ২শ’ ট্রাকে রাজধাণিতে তাজামাছ সরবরাহ হচ্ছে।

এতে প্রায় দুই কোটি টাকার তাজা মাছ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে। নতুন করে তৈরি হচ্ছে বেকারদের কর্মসংস্থান। রাজশাহী জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, তাজা মাছ বাইরে পাঠানোর উদ্যোগটি প্রথমে রাজশাহী জেলা থেকে শুরু হয়। জেলার পুঠিয়া, পবা, মোহনপুর, দুর্গাপুর, বাগমারা, তানোর উপজেলায় ব্যাপক মাছের চাষ হয়ে থাকে।

জেলায় বর্তমানে ১৩ হাজার ৫০ হেক্টর জমির কয়েক হাজার পুকুরে প্রতিবছর ৮৪ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। এরবাদেও গত কয়েক বছরে জেলায় নতুন করে আরও কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে পুকুর খনন হয়েছে। রাজধানীতে উত্তরাঞ্চলের তাজা মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকায় এখানে প্রতিনিয়ত নতুন পুকুরের পাশাপাশি বাড়ছে চাষিদের সংখ্যা।

মঙ্গলবার থেকে মাছ চাষের বৈরী আবহাওয়া থাকায় জেলার বিভিন্ন উপজেলার প্রায় পুকুরে গ্যাস করায় (অক্সিজেন স্বল্পতা) ব্যাপক মাছ মারা গেছে ও যাচ্ছে। যে সমস্ত পুকুরে এ্যারেটর মেশিনের ব্যবস্থা নাই (অক্সিজেন সরবরাহ) সেই পুকুরগুলোতে আক্রান্ত হার বেশী। বুধবার বড় বড় এসব মরা মাছ খুবই স্বল্পদামে বিক্রি হয়েছে। নওহাটা, নওদাপাড়া, আমচত্তর বাজারে কেজি কাতলা মাছের দাম ছিল ৪শ’ টাকা। ক্রেতা শাহিন শেখ নওদাপাড়া বাজার থেকে তিনকেজি ওজনের রুই কেনেন মাত্র ২৫০ টাকায়।

এদিকে দৈনিক সানশাইন পত্রিকার বাগমারা প্রতিনিধি মাহফুজুর রহমান প্রিন্স জানান, গত কয়েকদনি ধরে আবহাওয়া প্রচন্ড গরম হয়ে ওঠে। ব্যাপক তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এভাবে তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে গত বুধবার সকালে মুষলধারায় বৃষ্টি নামে। আর এই বৃষ্টিই কাল হয়ে দাঁড়ায় বাগমারার শত শত পুকুর ও দিঘীর মালিকদের। এভাবে প্রচন্ড গরম তার পর বৃষ্টিপাত নামায় পুকুর দিঘীর পানিতে অক্্িরজেন স্বল্পতা দেখা দিয়ে গ্যাস ফোম করায় শতশত পুকুর দিঘীর মাছ ব্যাপক হারে মরতে শুরু করে।

উপজেলা মৎস দপ্তর ও স্থানীয় মৎসচাষীদের সুত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন ছোট বড় আকার মিলে বাগমারায় মোট পুকুর দিঘীর সংখ্যা ৭ হাজার ৩শ ৮৮ টি। এসব পুকুর দিঘীর মোট আয়তন প্রায় ২৪ হাজার ৮শত ৬৩ হেক্টর। গত মঙ্গলবার দিনব্যাপি মুষলধারায় বৃষ্টিপাত নামায় এসব পুকুর দিঘীতে অক্্িরজেন স্বল্পতা দেখা দেয় এবং পানিতে গ্যাস ফোম করে। ফলে এসব পুকুর দিঘীতে ব্যাপক হারে মাছ মরতে শুরু করে। মাছ গুলোর মধ্যে রয়েছে রুই, কাতলা, সিলভার কার্প, গ্লাস কার্প, ব্লাড কার্প, মিনার কার্প, চিতল সহ প্রায় ১০/১২ প্রজাতির মাছ। চাষীরা এসব আধামরা মাছ নিয়ে দিগবিদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। তারা আড়তে মাছ নিয়ে গেলেও সেখানে মূল্য পায় না। নিয়ে আসে বাজারে। এখানেও মাছের মূল্য নেই। গতকাল বুধবার ভবানীগঞ্জ বাজার সহ আশেপাশের হাটবাজার গুলোতে মাছ চাষী ও ব্যবসায়ী মাছ নিয়ে এমনি ভাবে ছুটাছুটি করতে দেখা গেছে। কাচারীকোয়ালীপাড়া গ্রামের মৎসচাষী আব্দুল মজিদ ও ছাবের আলী সহ ১০/১২ জন মৎস চাষীরা জানান, রাতেই তারা খবর পান তাদের পুকুরে ব্যপক হারে মাছ মরতে শুরু করেছে। খবর পেয়ে রাতেই তারা পুকুরে গিয়ে দেখতে পান মাছগুলো পানির উপরে ভাসছে এবং পানি খেয়ে বেড়াচ্ছে।

এভাবে কিছুক্ষন ভেসে ভেসে পানি খাওয়ার পর মাছগুলো আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে। চোখের সামনে এভাবে লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ মরে ভাসতে থাকায় অনেক পুকুর মালিক পুকুর পাড়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। অনেকে চড়া সুদের উপর টাকা কেউবা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এভাবে মাছ চাষ শুরু করেছে। এখন তারা ভয়ানক লোকসানের মুখে পড়ে গেছে। ভবানীগঞ্জ দানগাছি মহল্লার মাছ চাষী আব্দুল কুদ্দুস ও তার ভাই ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল মজিদ জানান, কাচারীকোয়ালীপাড়া এলাকায় তাদের মাছ চাষের পুকুর রয়েছে। মঙ্গলবার রাতে পাহারাদারের মাধ্যমে তারা খবর পেয়ে পুকুরে গিয়ে দেখতে পান ভেসে ওঠার দৃশ্য। তাদরে চারটি পুকুর থেকে প্রায় বিশ লক্ষ টাকার মাছ এক রাতেই মরে গেছে বলে তারা জানান। এভাবে বাগামারার মাড়িয়া ঝিকরা গোয়ালকান্দি সহ বিভিন্ন ইউনিয়নের খোজ নিয়ে একই স্টাইলে মাছ মরার খবর পাওয়া যায়। গতকাল ভবানীগঞ্জ বাজারে গিয়ে দেখা যায় এলাকাররর পুকুরে গ্যাস ফোর্ম হয়ে মারা যাওয়া এসব মাছ ৫০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এসব প্রতিটি মাছের ওজন প্রায় এক থেকে তিন কেজির মধ্যে। এত সস্তা দামে মাছ পেয়ে ক্রেতারাও হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাছ কিনতে।

মোহনপুর উপজেলা প্রতিনিধি সাদিকুল ইসলাম স্বপন জানান, এক দিকে লকডাউনের জেরে জীবিকা, কাজকর্ম, রোজগার সবই বন্ধছিল। পুকুরের মাছ ধরে বিক্রি করে মোহনপুর উপজেলার বহু মাছচাষী টাকা রোজগার করছিলেন। যা দিয়ে তাঁদের কোনও রকমে সংসার চলছিল। কিন্তু এই মড়কের ধাক্কায় তা-ও শেষ হয়ে গেল বলে জানাচ্ছেন অনেকে। বন্যার করণে বহু জায়গায় নদীবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে গ্রাম। নদীর নোনা জল ঢুকে একদিকে যেমন গ্রামের পর গ্রাম চাষের জমি প্লাবিত হয়েছে তেমনই বিঘের পর বিঘে মিষ্টি জলের পুকুরে নোনা জল ঢুকে পড়েছে। আর সেই কারণে মাছের মড়ক শুরু হয়েছে এলাকায়। মরা মাছের গন্ধে এখন এলাকায় টেকাই দায়। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার চাষকৃত পুকুরে মাছে হঠাৎ মড়কে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে মৎস্য ব্যবসায়ীদের দাবী। আর সেই মরা মাছের গন্ধে প্রাণ ওষ্ঠাগত মানুষজনের।

বুধবার ছিল কেশরহাট বার প্রতিদিনের মতো বাজারে স্বাভাবিক মাছ আসার কথা থাকলেও এক ঘন্টার মধ্যেই ট্রাক, ভুটভুটিযোগে হাটে শত শত মন মাছ আমদানি হতে থাকে। অতিরিক্ত মাছ আমদানির কারণে আড়ৎদাররা মাছ বেচা-কেনা বন্ধ করে দেয়। অতিরিক্ত মাছ আমদানির কারণ হিসেবে জানা গেছে, গত কাল মঙ্গলবার ভ্যাপসা গরমের পর হাল্কা বৃষ্টির কারণে অক্সিজেন শুন্যতায় বেশিরভাগ পুকুরের মাছ মরতে থাকে। অতিরিক্ত মাছ আমদানির কারণে রাজশাহী-নওগাঁ মহসড়কের কেশরহাটের বড়ব্রীজ হতে কেশরহাট ডিগ্রী কলেজ এলাকার রাস্তা পর্যন্ত ঘন্টার পর ঘন্টা তীব্র যানজটের সৃস্টি হয়। পরে বিশাল মাছ বাজারে মাছ ধারণের ক্ষমতা উপচে গেলে বাজারের বাইরেও খুবই কমদামে এসব মাছ বিক্রি হয়।

বাজার ঘুরে দেখা গেছে ৪ থেকে ৫ কেজি ওজনের কাতলা, রুই মাছ ঠিকা দামে বিক্রি হয় ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকায়। প্রতি কেজি সিলভার কার্প বিক্রি হয় ১০ টাকা থকে ২০ টাকা কেজি দরে। সর্বোপরি দুপুর ১ টার দিকে অনেক মাছ পচে নষ্ট হওয়ার কারণে ফেলে পালিয়ে যায় মৎস্য ব্যাবসায়ীরা। এখানে আসা মোহনপুর উপজেলার ভাতুড়িয়া গ্রামের বিপ্লব নামে এক মাছ ব্যবসায়ী বলেন হঠাৎ অক্সিজেন ঘাটতির কারণে মাছ মরে কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়েছে। শুধু আমার পুকুরের মাছের এসমস্যা না, অনেকের পুকুরের মাছ মরে গেছে। কেশরহাটের মৎসচাষি মহব্বত আলী বলেন, অক্সিজেন ফেল করে এসমস্যায় আমার পুকুরের মাছ মরে গেছে। কেশরহাট মাছ বাজারের আড়ৎ মালিক সমিতির সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন বলেন হঠাৎ অতিরিক্ত মাছের আমদানী হয়। প্রায় মাছ পচে নষ্ট। ঢাকায় পাঠানোর উপযোগী ছিল না। এজন্য ডাকের মাধ্যমে মালিকরা নিজে ঠিকা দরে মাছ বিক্রি করে। এখানে শুধু মোহনপুরের মাছ আসেনি, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, পবা, বাগমারা এবং বাগমারা উপজেলা হতে মাছ এসেছে। সব মিলে কয়েক কোটি টাকার মাছ আমদানি হলেও পুকুর মালিকদের দুর্দশা দেখে আড়ৎদারি ছাড়াই মাছ বিক্রির সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

পুঠিয়া, পবা, মোহনপুর, দুর্গাপুর, বাগমারা, তানোর উপজেলার মৎস কর্মকর্তারা বলেন, আমরা বেশকিছু পুকুর দিঘী পরিদর্শন করেছি। মাছ চাষীদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এ থেকে পরিত্রানের জন্য বাজারে বেশ কিছু কোম্পানীর অক্সিজেন পাউডার রয়েছে সেগুলো পুকুরের আয়তন অনুযায়ী প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়াও এ্যারেটর (অক্সিজেন সৃষ্টিকারী) মেশিন দিয়েও পানিতে কাম্যমাত্রায় অক্সিজেনের পরিমান ঠিক রাখা যায়। প্রতিটি এ্যারেটর মেশিনের দাম ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।

রাজশাহী বিভাগীয় মৎস্য অধিদফতরের উপ-পরিচালক অলোক কুমার জানান, অতি তাপমাত্রার মধ্যে হঠাৎ বৃষ্টির কারণে হঠাৎ অক্সিজেন ঘাটতি ও পানি দুষণের কারণে হতে পারে। প্রতিটি উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তারা চেষ্টা চাষিদের নিয়ে কার্যকরি পদক্ষেপের মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মাছ রক্ষায়। পুকুরে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের ব্যবস্থা থাকলে পুকুরে গ্যাস ফর্মে আশঙ্কা অনেকটাই থাকে না।

সানশাইন/০৩ সেপ্টেম্বর/এমওআর

সেপ্টেম্বর ০৩
১৩:১১ ২০২০

আরও খবর

পত্রিকায় যেমন

বিশেষ সংবাদ

রাজশাহীতে হেরোইনসহ দুই মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার

রাজশাহীতে হেরোইনসহ  দুই মাদক ব্যবসায়ী  গ্রেপ্তার

স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহী মহানগরীতে ৭০ গ্রাম হেরোইনসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, ঢাকা জেলার কেরানিগঞ্জ থানার ধালেশ্বর পশ্চিমপাড়া এলাকার মানিক মিয়ার ছেলে মিজান মিয়া (২৫) ও একই এলাকার রেজোয়ানের ছেলে রবিউল ইসলাম রিফাত (২৫)। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার সদর গোলাম রুহুল কুদ্দুস জানান,

বিস্তারিত




এক নজরে

আমাদের সাথেই থাকুন

চাকরি

সরকারি চাকরি প্রার্থীর বয়সে ছাড়

সরকারি চাকরি প্রার্থীর বয়সে ছাড়

সানশাইন ডেস্ক : করোনা মহামারিতে সাধারণ ছুটিতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে স্থগিত ছিল সরকারি-বেসরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া। এ কয়েক মাসে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পায়নি দেশের শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠী। অংশ নিতে পারেনি কোনো নিয়োগ পরীক্ষাতেও। অনেকেরই বয়স পেরিয়ে গেছে ৩০ বছর। স্বাভাবিকভাবেই সরকারি চাকরির আবেদনে সুযোগ শেষ হয়ে যায় তাদের। তবে এ দুর্যোগকালীন

বিস্তারিত